
শীতকালীন ভ্রমণে ৬টি সেরা ডেস্টিনেশনের তালিকা
বাঙালির কাছে শীতকালের সমার্থক শব্দই হল বেড়াতে যাওয়া। অল্প কয়েকদিনের ছুটি হোক কিংবা সামান্য সপ্তাহের শেষ, বেড়াতে যাবার সুযোগ কখনও হাতছাড়া করে না বাঙালি। সমগ্র বাংলা জুড়ে মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ছোটোখাটো ডেস্টিনেশন, যার নাম সচরাচর কানে আসে না আমাদের। এই তালিকায় রইল এমনই কয়েকটা ‘অফবিট’ বেড়ানোর জায়গার কথা, আপনার শীতের সেরা ডেস্টিনেশন। যেখানে অল্প সময় হাতে নিয়েই দিব্যি ঘুরে আসা যাবে।

চুপি (পূর্ব বর্ধমান)
সারাদিন নৌকায় চড়ে হ্রদের জলে ঘুরে বেড়ানো আর পাখি দেখা। নানারকমের দেশি-বিদেশি পাখির ভিড়। তবে এখানে ঘুরতে হবে নিঃশব্দে, যাতে পাখিদের অসুবিধা না হয়। বর্ধমানের এই অংশে গঙ্গা নদীর অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ তৈরি হয়েছে। দুই থেকে তিন কিমি জুড়ে। হ্রদের জল ঘন নীল। নির্জনের স্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে যায় পাখির কলকাকলিতে। চুপিতে থাকার ব্যবস্থা নেই। ঘোরার শেষে নতুনগুড়ের মিষ্টি খেয়ে দেখুন। রাতে চলে যেতে পারেন কৃষ্ণনগর অথবা মায়াপুর ও নবদ্বীপ।
কীভাবে যাবেন: বর্ধমান যাওয়ার মেইন লাইনের ট্রেন ধরে পূর্বস্থলী স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে রিকশা করে যেতে হবে চুপি।

গারুচিরা (উত্তরবঙ্গ)
গারুচিরা যাওয়ার জন্য হাতে রাখুন চার-থেকে পাঁচদিন। এখানে পাহাড় এবং জঙ্গল দুটিই উপভোগ করতে পারবেন। একপাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভুটান পাহাড়। আর অন্য পাড়ে শাল, সেগুনে মোড়া বান্দপানি জঙ্গল। তবে গারুচিরা বেড়াতে আসার আসল মজা হাতির দেখা পাওয়া। এই পথেই নেপাল থেকে হাতির দল তরাইয়ের জঙ্গলে প্রবেশ করে। তাই গারুচিরাকে এলিফ্যান্ট করিডোরও বলা হয়। রাতে ওয়াচারটাওয়ার থেকে হাতির পাল দেখতে বসলে ঘড়ির কাটা যেন ওখানেই থমকে দাঁড়ায়। জঙ্গলের ভিতরে ঘোরার ইচ্ছে থাকলে ট্যুর গাইডের সঙ্গে বেরিয়ে শখ মিটিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা সুপ্তি ও রেতি নদী পরিবেশকে আরও মোহময় করে তুলেছে। গারুচিরা থেকে মাত্র ৮০ কিমি দূরে আলিপুরদুয়ার। তাই এখানে একদিন কাটিয়ে পরদিন আলিপুরদুয়ার থেকেও ঘুরে আসা যেতে পারে।
কীভাবে যাবেন: কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে দলগাঁও নামতে হবে। এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে গারুচিরা। আলিপুরদুয়ার থেকেও গারুচিরা যাওয়া যেতে পারে। অথবা ট্রেনে বা বাসে করে নিউ জলপাইগুড়ি নেমে যেতে হবে বীরপাড়া। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গন্তব্যে।
কোথায় থাকবেন: এখানে রাজ্য বনবিভাগের দুটি বাংলো রয়েছে। তাদেরই উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছে ইকো ভিলেজ। জঙ্গলের মধ্যে বাংলোতে দুটো দিন কাটাতে মন্দ লাগবে না। জমিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। বর্ষাকালে বাদ দিয়ে বছরের যে কোনও সময়েই গারুচিরায় ঘুরতে যেতে পারেন।

গড়চুমুক (হাওড়া)
হাওড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হুগলি ও দামোদরের সংযোগ স্থলে দাঁড়িয়ে রয়েছে গড়চুমুক নামের এই ছোট্ট শহর। উঁচুনিচু পাহাড়ি অঞ্চলের বুকের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলি যেন কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি। নদীর দুই পাড় ছেয়ে রয়েছে পান্নারঙা সবুজ ঘাসে। তারই মাঝে রয়েছে কিছু লম্বা গাছ। চাইলে আপনি নৌকা নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে পড়তে পারেন নদীতে। তবে এই মনোরম পরিবেশে, চুপচাপ নদীর পাড়ে বসে থাকলেও কোথা দিয়ে যে সময় পেরিয়ে যাবে, বুঝতেই পারবেন না। ভাগ্য সহায় থাকলে, নদীর পাড়ে বসেই আপনি দেখতে পাবেন বক কিংবা মাছরাঙা পাখির দল কীভাবে তৎপরতার সঙ্গে জলে নেমে, ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে আসে মাছ। দেখতে পাবেন আটান্না গেট, গড়চুমুক ডিয়ার পার্ক, গড়চুমুক চিড়িয়াখানা, চিলড্রেন্স পার্ক প্রভৃতি নানাবিধ আকর্ষণ। পক্ষীবিশারদদের কাছেও গড়চুমুক আকর্ষণের জায়গা, কারণ প্রতি বছর শীতে এখানে ভিড় করে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে গড়চুমুকের দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে আড়াই ঘণ্টার কাছাকাছি সময় লাগে গড়চুমুক পৌঁছাতে।
কোথায় থাকবেন: গড়চুমুক একদিনেই ঘুরে আসতে পারেন। কিংবা নিকটবর্তী বনবিভাগের অধিকৃত গড়চুমুক রিসোর্টে রাত্রিযাপন করতে পারেন।

ভালকিমাচান (পূর্ব বর্ধমান)
ভালকির জঙ্গল। নীল আকাশের নিচে শাল, পিয়ালের রাজ্য। শীতে সোনাঝুরি ফুল। জঙ্গলের পেট চিরে এঁকে বেঁকে চলে গেছে ছোট্ট ছোট্ট গ্রামে। নামেই গ্রাম। মানুষ হাতে গোনা। কয়েকটি ঘর নিয়ে গ্রাম। ভীষণ শান্ত। পর্যটক ছাড়া কিন্তু এখানকার সৌন্দর্য দেখার নেই কেউ। সারাদিনে দু-একটা ইঞ্জিন ভ্যানের শব্দ ছাড়া কোলাহলহীন, মনুষ্যবিহীন সম্পূর্ণ অন্য জগৎ।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে বোলপুরগামী প্রায় সব ট্রেনই গুসকরা স্টেশন ছুঁয়ে যায়। গুসকরা থেকে ভালকি মাত্র ২২ কিমি রাস্তা। স্টেশন থেকে ভাড়া গাড়ি। সড়কপথে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমানের পারাজ থেকে ডানদিকে অভিরামপুর হয়ে সোজা ভালকি মাচান। পারাজ থেকে মাত্র ১৬ কিমি।
কোথায় থাকবেন: ভালকির জঙ্গলে থাকার জন্য মাত্র একটিই হোটেল। নাম ‘অরণ্যসুন্দরী’। পাকা রাস্তার কাছাকাছি। এ অরণ্যে আর কোনও বাড়িও নেই। জঙ্গলের মধ্যে ১০-১৫টি বাড়ি নিয়ে দূরে দূরে একেকটি গ্রাম। হোটেল থেকে দেখাও যায় না। সূর্য ডুবে গেলে যে যার মতো। ধামসার আওয়াজ ভেসে আসে বহুদূর থেকে। আগে থেকে বলে রাখলে নাচের দলও পাওয়া যায়। হোটেলে বসেই দেখা যায় ভল্লু রাজার দুর্গ। দুর্গের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া রাত। হোটেল থেকে বেরিয়ে দু-পা এগিয়ে ডানদিকে বড়ো জলাশয়। বোটিং করা যায়। জলাশয়কে ঘিরে গড়ে উঠেছে সুন্দর উদ্যান।

জয়পুর জঙ্গল (বাঁকুড়া)
কলকাতার কাছে বসেই যদি জঙ্গলের স্বাদ পেতে চান, তাহলে সপ্তাহান্তে ঘুরে আসতে পারেন বাঁকুড়ার জয়পুর জঙ্গল থেকে। শাল, পলাশ, মহুয়া, নিম গাছে ভর্তি এই জঙ্গলে একটু কান পাতলেই শুনতে পাবেন নাম না জানা পাখিদের কিচিরমিচির। জঙ্গলের পথে চলতে চলতে প্রায়ই চোখে পড়ে যাবে হাতি, শিয়াল কিংবা হরিণের দল। এখানেই দেখতে পাবেন সমুদ্র বাঁধ নামের একটি জলাশয়; যার গা লাগোয়া ওয়াচটাওয়ারে উঠলে পেয়ে যাবেন সমস্ত জঙ্গলটার একটা প্যানোরামিক ভিউ। এছাড়াও নিকটবর্তী জয়পুর গ্রামে গেলে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে ১৯ শতকের কিছু ঐতিহাসিক মন্দির।
কীভাবে যাবেন: বিষ্ণুপুর অবধি ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরের জয়পুর জঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেন। অথবা কলকাতা থেকে আরামবাগের পথ হয়ে, গাড়িতে এসে পৌঁছাতে পারেন এই জঙ্গলে। কলকাতা থেকে গাড়িতে মাত্র চার ঘণ্টা লাগবে বাঁকুড়া পৌঁছতে। যদি প্রত্নতত্ব ও ইতিহাসের প্রতি গভীর ঝোঁক থাকে, তাহলে আসার পথে খানিকটা সময় কাটিয়ে আসতে পারেন কোতুলপুরে। বাংলার হারিয়ে যাওয়া জমিদারির বেশ কিছুটা অংশ আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোতুলপুরের মাটিতে।
কোথায় থাকবেন: এই ছোট্ট ট্যুরে যদি বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলিও দেখে যেতে চান, তাহলে রাত্রিযাপনের জন্য বেছে নিতে পারেন রাজ্য পর্যটন দপ্তরের বিষ্ণুপুর প্রপার্টিকে। এছাড়াও খোটোখাটো হোটেল পেয়ে যেতে পারেন একটু খুঁজলেই।

রায়চক (দক্ষিণ ২৪ পরগনা)
রায়চক ভ্রমণের আদর্শ সময়ই হল শীতকাল। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত রায়চকে রয়েছে ১৮ শতকে নির্মিত ডাচদের তৈরি একটি প্রাচীন কেল্লা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আপনি সহজেই সাক্ষী হতে পারেন একটা অসাধারণ সূর্যাস্তের। অথবা রায়চক বা নূরপুর জেটি থেকে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন গাদিয়াড়ার উদ্দেশে। রায়চক থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটারের দূরত্বে রয়েছে ডায়মন্ড হারবার। এখানে এসে সারাদিনের জন্য একটা ক্রুইজশিপ-ও ভাড়া করতে পারেন চাইলে। দেখতে পাবেন চিংড়িখালি নামের এক সুপ্রাচীন কেল্লা, একসময় যার অধিকার ছিল পর্তুগিজদের হাতে। হাতে সময় থাকলে রায়চক ভ্রমণ সেরে ডায়মন্ড হারবার হয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন গঙ্গাসাগর, কাকদ্বীপ, নামখানা এবং বকখালির পথে।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত রায়চক। কলকাতা থেকে গাড়ি ভাড়া করে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই রায়চক পৌঁছে যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন: ডায়মন্ড হারবারে রয়েছে WBTDC অধিকৃত সাগরিকা ট্যুরিজম প্রপার্টি।
