পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করল কালজয়ী রোম্যান্টিক ক্লাসিক ‘বসন্ত বিলাপ’

সময়ের নিরিখে দীনেন গুপ্তের এ ছবি প্রগতিশীলও বটে

প্রকৃতিই নিয়ন্তা। তারই অমোঘ নিয়মে ঘটে চলে ঋতুচক্র। ঋতুভেদে বদলে যায় উৎসবের রং। সেই রঙের ছোঁয়াচ লাগে জীবনের পরতে। কোন রং কতখানি লাগলে নারী এবং পুরুষের মনে প্রেম অঙ্কুরিত হয়, তা বোধহয় একমাত্র প্রকৃতিই বলতে পারে। তাই বসন্ত এলে আমরা শুনতে পাই কোকিলের কুহতান, নইলে শুধুই বসন্তের বিলাপ। ব্যাটেল অফ্ সেক্সেস! এ যেন চিরন্তন এক প্রাকৃতিক ঘটনা। যেমন ধরা যাক সরস্বতী পুজোয় মেয়েপাড়া আর ছেলেপাড়ার মধ্যে খুনসুটি থেকে চুলোচুলি। কিংবা হোলিতে রং মাখানোর প্রতিযোগিতা থেকে ধুন্ধুমার সব ঘটনা। হয়তো এ পক্ষের কেউ ওই পক্ষের কারও প্রতি দুর্বল এবং সেই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে ওই প্রিয় মানুষটিই যদি আত্মসম্মানের অজুহাতে খেলার ছলেও তীব্র আঘাত হানে, তাহলে তার চেয়ে মিষ্টি নিষ্ঠুরতা আর কীই বা হতে পারে! প্রেমে বা অপ্রেমে, প্রকৃতির এই প্রচ্ছন্ন রাজনীতিই কখনও সখনও হাস্যরসাত্মক হয়ে উঠে জন্ম দেয় রোমান্টিক কমেডির। আর এরকম খুব চেনা কিছু সাধারণ ঘটনা নিয়েই তো তৈরি হয়েছে ‘বসন্ত বিলাপ’ (১৯৭৩) ছবির প্লট। নিওট্রাডিশনাল রোমান্টিক বাংলা কমেডি ছবি বসন্ত বিলাপের ৫০ বছর পূর্ণ হল।

সাহিত্যিক বিমল করের কাহিনি অবলম্বনে দীনেন গুপ্তের পরিচালনায় এক কালজয়ী ক্লাসিক ‘বসন্ত বিলাপ’। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন প্রখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা শেখর চ্যাটার্জী এবং চিত্রগ্রহণে ছিলেন পরিচালক দীনেন গুপ্ত নিজেই, যিনি ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮), ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৯) এবং রাজেন তরফদারের ‘গঙ্গা’ (১৯৬০)-র মতো মাস্টারপিসে ইতিমধ্যে হাত পাকিয়েছিলেন। শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেছেন স্বনামধন্য দুই তারকা অভিনেতা- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপর্ণা সেন। সহ-অভিনেতারাও কেউ কম যান না। রবি ঘোষ, চিন্ময় রায়, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, কাজল গুপ্ত, গীতা দে, অনুপকুমার, তরুণকুমার প্রমুখ সকলেই দুঁদে অভিনেতা, যাদের স্বকীয় অভিনয় শৈলী মন ছুঁয়ে যায়। ‘বসন্ত বিলাপ’-এর গানগুলিও হিট ক্লাসিক। সুধীন দাশগুপ্তের কম্পোজিশনে মান্না দে’র কণ্ঠে ‘আগুন লেগেছে লেগেছে আগুন’ এবং  আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমি মিস ক্যালকাটা’, ‘এক চড়েতেই ঠান্ডা’ এবং ‘ও শ্যাম যখন তখন’ এখনও সংগীত প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত ভালোলাগার জায়গা। ছবির সময়োপযোগী সংলাপও দাগ কেটে যায়। যেমন ছবিতে সিধু (চিন্ময়) যখন তার প্রেমিকাকে বলে, “তুমি আমাকে একবার বলো, উত্তমকুমার”, তখন সিনেমাহলের দর্শক যে হাততালি দিয়ে উঠবে শুধু নয়, এ যেন একটি সম্পূর্ণ প্রজন্মকে ধরা।

আশির দশকের শুরুর দিকে তৈরি ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির সঙ্গে মিশে রয়েছে বাঙালির নস্টালজিয়া। সরস্বতীপুজো এবং দোল-এর মতো একেবারে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ঘটে চলা অত্যন্ত ছোটো ছোটো ঘটনাকে নিয়ে তৈরি হওয়া এরকম সিরিয়াস কমেডি মেস, হস্টেলে থেকে আসা বা ক্লাব ঘেঁষা তরুণ-যুবদের জীবনের বিশেষ কিছু স্মৃতিকে উস্কে দেয় নিশ্চয়ই। যদিও ‘বসন্ত বিলাপ’-এ বয়সের ছাপ স্পষ্ট। ডিজিটাল পৃথিবী যেমন দিয়েছে অনেক, তেমনি কেড়েও নিয়েছে অনেককিছু। নিভৃত দুপুরে নির্জন পুকুরঘাটে বসে সিধু আর আলোর মতো প্রেম এ সময়ে কজন করতে পারে? কিংবা নীতাকে পাঠানো লালুর সাংকেতিক প্রেমপত্র আজকাল কে-ই বা আর কাকে লেখে? অনলাইন ডেটিং সাইট আর বার-রেস্তোঁরায় সময়ের উচ্চ গতিবেগে থমকে গেছে পুরোনো দিনের মিষ্টি অপেক্ষারা। এমনি করে কতো কৈশোর-স্মৃতি মিউজিয়াম হয়ে গেছে সময়ের দলিলে।

সময়ের কষাটে দাগ নিয়েও ‘বসন্ত বিলাপ’ এই সময়ের কথাও বলে। মেস কালচার এখনও শেষ হয়ে যায়নি। দূরদূরান্ত থেকে বড়ো শহরে আসা পড়ুয়া কিংবা চাকুরেদের ঠাঁই আজও সেই মেস।

তবুও অস্বীকার করা যায় না যে, সময়ের কষাটে দাগ নিয়েও ‘বসন্ত বিলাপ’ এই সময়ের কথাও বলে। মেস কালচার এখনও শেষ হয়ে যায়নি। দূরদূরান্ত থেকে বড়ো শহরে আসা পড়ুয়া কিংবা চাকুরেদের ঠাঁই আজও সেই মেস, যেগুলো এখন নাম বদলে হয়ে উঠেছে পিজি অর্থাৎ পেয়িং গেস্ট। সরস্বতী পুজোর প্রেম তো সেই বহু পুরোনো এক প্রথা। নব্য বাঙালির কাছে এখন এটাই আরেক ভ্যালেন্টাইন্স ডে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিও একটু একটু করে বদলে যায় মূল আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ওপরেই। তাকে স্বীকার না করলে তো সময়কেই অস্বীকার করা হয়। তাই মেনে নিতেই হয় যে ‘বসন্ত বিলাপ’ পুরোনো, তবু ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন নয়। পুরোনো মদের মতো এ ছবির মাদকতা আজও আগুন জ্বালাতে পারে একালের দর্শকের মনে।

 

সময়ের নিরিখে ছবিটি প্রগতিশীলও বটে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে একদল স্বনির্ভর মেয়ে নিজেরাই একটা মফস্সল শহরে একটা ভাড়াবাড়িকে মেস বানিয়ে একসঙ্গে থাকছে, আনন্দ করছে, জীবনকে উদযাপন করছে কাউকে কোনো পরোয়া না করেই, এ তো সাহসিকতার বটেই। ছবিটি তাই ‘ব্যাটেল অফ্ সেক্সেস’-এর পাশাপাশি নারী-স্বাধীনতা এবং লিঙ্গ-সাম্যের কথাও বলে। বিশেষ করে শ্যামেরা যখন প্রতিশোধ নিতে গিয়ে মেয়েদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আক্রমণ করে অর্থাৎ কলকাতার খবরের কাগজের অফিসে বসন্ত বিলাপের ঠিকানায় ‘পাত্র চাই’ বিজ্ঞাপন দেয় এবং সকাল থেকেই পাত্র, ঘটক ও পাত্রের অবিভাবকরা একে একে বসন্ত বিলাপের দরজায় ভিড় করতে থাকে, এমনকি পুলিশে সাহায্য চেয়েও হতাশ হতে হয়, সেই অসহায় মুহূর্তেও মেয়েরা কিন্তু হার মানে না। বরং সেই দুর্বলতাকেই অস্ত্র বানিয়ে তারা মজাদার ফন্দি এঁটে ছেলেদের জব্দ করে। “আমি মিস্ ক্যালকাটা” গান এবং গানের দৃশ্যটি বাংলা ছবিতে আইকনিক। অভিনেত্রী অপর্ণা সেনও নিজেকে ধরা দেন আধুনিকা বাঙালির ফ্যাশন আইকন হিসেবে।

মূলধারার বাংলা ছবির ইতিহাসে সার্থক কমেডির (হাস্যরসাত্মক) সংখ্যা তুলনায় কম হলেও একেবারে নগন্য  নয়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩), ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ (১৯৫৮), ‘গল্প হলেও সত্যি’ (১৯৬৬), ‘আশিতে আসিও না’ (১৯৬৭), ‘বাক্স বদল’ (১৯৭০), ‘মৌচাক’ (১৯৭৪), ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ (১৯৮১)-এসব ছবি দেখে হাসবে না এরকম দর্শক বোধহয় নেই। ছবিগুলি অত্যন্ত সহজ সরল ঘটনা অবলম্বনে হলেও বুদ্ধিদীপ্ত এবং পরিস্থিতিগত হাস্যরসে টইটুম্বুর। বর্তমান সময়ে বাংলা ছবিতে এরকম সহজ অথচ সার্থক কমেডি হয় বলে জানা নেই। কেন হয় না, তার উত্তরও হয়তো নেই। বুদ্ধিদীপ্ত কমেডি তৈরির জন্য যে পরিমাণ রসবোধ, মেধা, শিল্পচেতনা এবং অভিনয় দক্ষতার প্রয়োজন তার সহাবস্থান হয়তো হয়ে উঠছে না। ‘বসন্ত বিলাপ’-এর স্মৃতিকে উস্কে দিতে ২০১৮ সালে ‘আবার বসন্ত বিলাপ’ নামে একটি ছবি তৈরি হয় (যা সমালোচিত বা প্রশংসিত কোনোটিই নয়)। অনীক দত্তের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ (২০১২) এবং অপর্ণা সেনের ‘গয়নার বাক্স’ (২০১৩)-কে বাদ দিলে এই সময়ে বাংলা ভাষায় উল্লেখযোগ্য কোনো কমেডি ছবির নাম মনে করা যায় না। আমাদের বাংলা ছবির বর্তমান পরিস্থিতি হতাশার হলেও, অতীত সমৃদ্ধ। তাই সদিচ্ছা এবং মুক্তমন নিয়ে এগোলে ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘মৌচাক’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর মতো সুপারহিট ক্লাসিক ছবিগুলি থেকেই অনুপ্রেরণা পাওয়া সম্ভব। কারণ আজও বাংলা ছবির দর্শকদের কাছে হাসির ছবি বলতে মূলত এগুলিই রয়েছে।

Developed by DXDasia