মন্দির ঘিরে নানা রোমাঞ্চকর কাহিনী

তাদের আশীর্বাদ করছেন, প্রেরণা দিচ্ছেন, কখনও রক্ষাকবচ হয়ে রক্ষা করছেন মা-তান্নোত মা

বিস্তীর্ণ মরুর মাঝে এক মন্দির। তান্নোত মায়ের। মা দুর্গার মতো দশ হাতে তিনি আগলে রেখেছেন ভারতকে। জয়সলমীরে লাঙ্গোয়াল বর্ডারের কাছে এই মন্দির ঘিরে নানা রোমাঞ্চকর কাহিনী।

বিকানিরে একটা দিন কাটিয়ে সকালে বাস ধরেছি জয়শলমীর যাব বলে। জয়শলমীর পৌঁছতেই আমাদের রীতিমতো হাইজ্যাক করে নিয়ে গেল দীর্ঘদিনের পরিচিত অনিল ভাই। অনিল ভাই ওরফে অনিল ভাটিয়া প্রিন্স হোটেলের কর্ণধার। রাতটা ওর হোটেলেই থাকবে, কাল সকালে উঠেই যাব তান্নোত মায়ের মন্দির।

কী করে যাবেন
কলকাতা থেকে ট্রেনে যোধপুর বা বিকানির এসে সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে ৬-৭ ঘণ্টার পথ জয়শলমীর। জয়শলমীর থেকে তান্নোত ১২৫ কিমি। যেতে হবে গাড়িতে। সময় লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা। তান্নোত মন্দির দেখে একেবারেই দেখে নেওয়া যায় লাঙ্গোয়াল বর্ডারও। গাড়ি ভাড়া পড়ে প্রায় ২৫০০-৩০০০ টাকা।
কোথায় থাকবেন
থাকার জন্য জয়শলমীরে আছে রাজস্থান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হোটেল স্যাম ধানী (ফোন-২৫২৩৯২) এবং হোটেল মুনাল (২৫২৩৯২) এদের কলকাতা, অফিস ২, গণেশচন্দ্র অ্যাভেনিউ, কমার্স হাউস, কলকাতা। ফোন- ০৩৩-২২১৩২০৮০। এছাড়া আছে হোটেল প্রিন্স। ফোন- ০৯৪১৪১৪৯১০৫, ০৯৯২৮২৭৩০৩০। হোটেল অশোক(২৫৬০২১), হোটেল কিলা ভবন(২৫১২০৮) প্রভৃতি। গাড়ির যোগাযোগ- ০৯৪১৪১৪৯১০৫ অথবা ০৮০০৩২৮২৯০৩০। জয়শলমীরের এস.টি.ডি কোড-০২৯৯২।

জয়শলমীর এর আগেও এসেছি। কিন্তু এবারের আসা তান্নোত মায়ের আকর্ষণে। এই তান্নোত মায়ের মন্দির সম্পর্কে বহুবার বহু কথা শুনেছি। আগ্রহর সঞ্চার হয়েছিল এক চন্দ্রার ‘বর্ডার’ ফিল্মটি দেখার পরই। ‘বর্ডার’-এ এই মন্দিরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছিল। খুব সকালে উঠেই তৈরি হলাম তান্নোত মায়ের মন্দির দর্শন করব বলে।

বিস্তীর্ণ মরুভূমিরে মাঝে এক মন্দির। মা হিংলাজেরই এক রূপ এই মা তান্নোত, বলা চলে মা দুর্গার এক রূপ। ৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভাটি রাজপুত রাজারা এই মন্দিরে তান্নোত মায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় মানুষজন আর ভাটি রাজবংশের উত্তরাধিকারীরাই মন্দিরের দেখভাল পূজাপাঠের দায়িত্বে ছিলেন। পটবদল হয় ১৯৬৫ সাল থেকে। সেও এক রোমহর্ষক কাহিনী। অক্টোবর ১৯৬৫। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হঠাৎ-ই রাজস্থান সীমা দিয়ে ভারত আক্রমণ করেছে। কিষানগড় আর সাদেওয়ালা- এই দুই স্থান থেকে মুহুর্মুহু আক্রমণ শানাচ্ছে হানাদারবাহিনি। বৃষ্টির মতো শেল নিক্ষেপ করে চলেছে তারা। একের পর এক শেল এসে পড়ছে তান্নোত মায়ের মন্দিরের চারপাশে ভারতীয় সেনার ছাউনি লক্ষ্য করে।

কিন্তু কী আশ্চর্য! যে হারে শেল নিক্ষেপ করছে পাকবাহিনী তাতে তো এই বর্ডার অঞ্চল বটেই, গোটা জয়শলমীর উড়ে যাওয়ার কথা…। প্রায় ৩০০০ শেল নিক্ষেপ করেছিল পাকবাহিনী। কিন্তু তার অধিকাংশ শেলই বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি। তার আগেই অকেজো হয়ে গেছে। এ যে অসম্ভব! এ যে অলৌকিক! তবে কি তান্নোত মা-ই রক্ষা করেছেন এই ভারত ভূখণ্ড আর তার  সেনাদের? ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় মানুষ তাই বিশ্বাস করেন। শোনা যায়, এই যুদ্ধের আগেই নাকি বেশ কিছু ভারতীয় সেনা আর স্থানীয় গ্রামবাসীদের স্বপ্নে দেখা দিয়ে তান্নোত মাতা আশ্বাস দেন তাঁদের রক্ষা করবেন তিনি স্বয়ং। সেবার কোনও রকমে পালিয়ে গিয়ে বাঁচে হানাদার বাহিনী। ১৯৬৫ থেকেই মন্দিরের দায়িত্ব নেয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা বি.এস.এফ। অলৌকিক কাহিনী কি শুধু এটুকুই? না, এখানেই শেষ নয়। এর পরও ঘটে এরকমই আর এক ঘটনার পুনরাবৃত্তি, সেও এক রোমহর্ষক যুদ্ধজয়ের গল্প।

৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, তান্নোত মায়ের মন্দিরের অদূরেই লাঙ্গোয়াল বর্ডার। পাকিস্তানের প্রেসিন্ডেন্ট তখন ইয়াহিয়া খান। ৪ ডিসেম্বর মাঝ রাত হঠাৎ পাক সেনা এই বর্ডার দিয়ে ভারত আক্রমণ করে। বিশাল পাকবাহিনী মুহুমুর্হু গোলা বর্ষণ করতে থাকে ভারত ভূখণ্ডে। তাদের বিরাট ট্যাঙ্কবাহিনী এগতে থাকে জয়সলমীরের দিকে। তখন ভারতীয় সীমান্ত প্রহরায় রয়েছে মাত্র পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সেনা আর বি.সি.এফের এক কোম্পানি জওয়ান। ব্রিগেডিয়ার ই.এন.রামদাস, কর্নেল খুরশিদ হোসেন, মেজর আত্মা সিং, উইং কম্যান্ডার আর এ কাওয়াসজি প্রমুখের নেতৃত্বে সেদিন পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ২৩ ব্যাটেলিয়নের এই কোম্পানির যোদ্ধারা এবং বি.এস.এফের একটি কোম্পানির অকুতোভয় যোদ্ধারা ৩০ ইনফ্যান্ট্রির অধীনে যে মরণপণ লড়াই করেছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেদিনের যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর কম্যান্ডিং অফিসার ছিলেন মেজর কুলদীপ সিং চাঁদপুরী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৬ ঘন্টা পরে ভোরের আলো ফুটলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ভারতীয় বিমান বাহিনী। ভারতীয় সেনার মরণপণ লড়াই আর বিমান বাহিনীর হানায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে হানাদাররা। আজও লাঙ্গোয়ালকে বলা হয় ‘পাক ট্যাঙ্ক বাহিনীর কবরস্থান।

ধূ ধূ মরুভূমির মাঝ দিয়ে পথ চলেছি। মাঝে মাঝে ক্যাকটাসের ঝোপ। থর মরুভূমির বুকে সূর্যের আলো পড়ে সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব জলছবি। বালির বুকে বাতাস এসে এঁকে দিচ্ছে আলপনা। বড়া বাগ ছেড়ে এসে পৌঁছেছি রামগড়। জয়শালমীর থেকে ৬৫ কিমি পথ এই রামগড়। এখান থেকে দুটি পথ গেছে তান্নোত মন্দিরের দিকে। একটি পথ লাঙ্গোয়াল বর্ডার হয়ে মন্দিরের দিকে গেছে। এই পথে গেলে একটু বেশ ঘোরা হয়ে যায়। আমরা যাব অন্য পথ দিয়ে। এই পথে রনউ হয়ে ৬০ কিমি পথ তান্নোত মন্দির। মন্দির থেকে আরও ৩০ কিমি গেলে লাঙ্গোয়াল। লাঙ্গোয়াল থেকে সামান্য দূরে ভারত-পাক সীমান্ত। আপাতত কাশ্মীর সহ বিভিন্ন সীমান্তে উত্তেজনা থাকার কারণে সীমান্ত সিজ করে দেওয়া হয়েছে। লাঙ্গোয়ালের পরে আর যাওয়ার অনুমতি নেই।

রামগড় থেকে জলখাবার-চা খেয়ে রওনা দিয়েছি যখন, তখন প্রায় সাড়ে ন’টা। বাকি রাস্তা যে কখন পেরিয়েছি তার হিসেব নেই। দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমির অনন্ত বালুরাশির স্বর্ণময় সৌন্দর্য যেন মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল এতক্ষণ। সংবিৎ ফিরল অনিল ভাই-এর ডাকে। ‘দাদা, মন্দির পহোঁছ গয়ে। ও সামনে হ্যায় মন্দির। যাইয়ে, মা কি দর্শন কিজিয়ে।’ গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম মন্দিরের দিকে।

থর মরুভূমির মাঝে ছোট এই মন্দির আয়তনে ছোট, কিন্তু ব্যাপ্তিতে বিশাল, রাজস্থানি শৈলীতে তৈরি মন্দির, বিরাট কোনও জৌলুস বা বৈভব নেই, কিন্তু পবিত্রতা আছে। একদম সীমান্ত অঞ্চলে মরুভূমির মাঝে অবস্থিত মন্দিরটি সোনালি রঙের পাথরে তৈরি। মন্দিরের মেঝে সাদা পাথরের। মূল মন্দিরকে প্রদক্ষিণ করার জন্য চারপাশে বেশ অনেকটা জায়গা রয়েছে। মন্দিরের পাশেই রয়েছে পবিত্র কুয়ো, রয়েছে মুসলিমদের মাজার, এগুলি অবশ্য পরবর্তীকালে বি.এস.এফ তৈরি করেছে।

তান্নোত মা দুর্গা মায়ের এক রূপ হলেও তিনি দশভূজা নন, চতুর্ভুজা। দেবীর মুখটুকু খোলা। শরীর লাল কাপড়ে ঢাকা। সাদা পাথরে নির্মিত মায়ের মুখে বরাভয় হাসি লেগে আছে। মূর্তির উলটো দিকে শিব লিঙ্গ। এখানে পূজা হয়। শুধু বি.এস.এফ বা সেনাবাহিনীর জওয়ানরাই নন, আশপাশের গ্রামগুলির মানুষজনও এই মন্দিরকে অত্যন্ত পবিত্র, অত্যন্ত জাগ্রত মনে করে পুজো করেন। মন্দিরের অভ্যন্তরে রয়েছে মা হিংলাজ প্রকারান্তরে মা দুর্গা-র এক রূপ, মা তান্নোতের মূর্তি। আছে মা দুর্গা ও মা কালীর ছবি। দু’বেলা এখানে পুজো হয় ভক্তিভরে। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে এবং নবরাত্রিতে এখানে ধুমধাম করে উৎসব হয়। হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন মাতৃ দর্শনের জন্য। বি.এস.এফের তরফ থেকে তখন বিনামূল্যে খাওয়া (লঙ্গরখানা) এবং ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়। তান্নোত মন্দিরের কাছেই বি.এস.এফ-র চৌহদ্দিতে এক ছোট সংগ্রহশালা। এখানে সংরক্ষিত আছে লাঙ্গোয়াল যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা যে শেলগুলি নিক্ষেপ করেছিল, অথচ সেগুলি বিস্ফোরণ ঘটায়নি, সেইসব শেলের খোল। বারুদ বার করে খোলগুলিকে সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছে সকলের দেখার জন্য, আর বিমানবাহিনীর যে বিমানটি প্রথম উড়েছিল বোমা বর্ষণ করে পাক ট্যাঙ্ক বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য সেই বিমানটি এখনও রাখা আছে জয়শলমীরেই।

এখন সন্ধ্যা। বসে আছি হোটেলের ছাদে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সোনার কেল্লাকে দেখাচ্ছে যেন রূপকথার ছবির মতো। আকাশে তারা ফুটে উঠছে এক এক করে। তান্নোত মন্দির থেকে ফিরেছি কিছুক্ষণ আগে, এখনও মনে রেশ রয়ে গেছে। বসে বসে ভাবছি, তাহলে এমনও ঘটে! চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছি- ধূসর সীমান্তে চারদিকে থর মরুর বালুরাশির দুরন্ত দাপাদাপি, মাঝখানে মায়ের মন্দির। আর অকুতোভয় কিছু জওয়ান। তারা লড়ছে, দেশ বাঁচানোর লড়াই। আর তাদের দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করছেন, প্রেরণা দিচ্ছেন, কখনও রক্ষাকবচ হয়ে রক্ষা করছেন আর এক মা-তান্নোত মা!

Developed by DXDasia