
পুজো, দুর্গাপুজো। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জাতীয় উৎসব হিসেবে চিহ্নিত করা যায় দুর্গাপুজোকে। আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে আবেগ প্রবাহিত হয়, তার এক অন্যতম উৎস দুর্গাপুজো। খ্রিস্টাব্দ এবং বঙ্গাব্দ ক্যালেন্ডার ছাড়াও আমাদের মনের মধ্যে আর একটা ক্যালেন্ডার তৈরি হয়ে আছে, যে ক্যালেন্ডার শুরু হয় দশমীর পরের দিন থেকে এবং শেষ হয় ষষ্ঠীর আগের দিন। কিন্তু পুজো আমাদের কাছে কি শুধুই উৎসব? শুধুই আবেগ? না আরও কিছু কথা থেকে যায় এরপরেও? দুর্গাপুজোর প্রভাব সমাজে কতটা? সে কি সমাজে আদৌ কোনো পরিবর্তন আনতে পারে বা পেরেছে? এই প্রশ্নের অভিমুখ বহুমুখী, উত্তরের গতিপথ নানাবিধ। (সমাজ পরিবর্তনে দুর্গাপুজোর ভূমিকা)
কলকাতায় দুর্গাপুজো একটি সাম্প্রদায়িক সংহতির জায়গা ধরে রেখেছে, যদিও এখন এক ধরনের ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু হয়েছে অনেকদিন ধরেই, কিন্তু সব ধর্মের সব ধরনের সব মানুষের জন্য এই উৎসব করা হয়।
বাংলার দুর্গাপুজো-কে ইউনেস্কোর দেওয়া স্বীকৃতির পিছনে ইতিহাসবিদ-গবেষক তপতী গুহ-ঠাকুরতার অবদান অনস্বীকার্য। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানান বাংলার দুর্গাপুজো আসলে একটা সেক্যুলার ফোরাম। তিনি বলেন, “কলকাতায় দুর্গাপুজো একটি সাম্প্রদায়িক সংহতির জায়গা ধরে রেখেছে, যদিও এখন এক ধরনের ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু হয়েছে অনেকদিন ধরেই, কিন্তু সব ধর্মের সব ধরনের সব মানুষের জন্য এই উৎসব করা হয়। দুর্গাপুজো তো এক অর্থে একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কিন্তু তা হলেও এর অনেক বড়ো পরিচিতি হল এটা একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা বহু মানুষকে একসঙ্গে আনে।” (সমাজ পরিবর্তনে দুর্গাপুজোর ভূমিকা)
অর্থনৈতিকভাবে দেখতে গেলে, তিনি যে সময় কাজ শুরু করেছিলেন, অর্থাৎ প্রায় বাইশ-তেইশ বছর আগে থেকে গত বারো বছর আগে পর্যন্ত, তখনও অপচয়ের কথা বলা হত, কোথা থেকে এত টাকা, কোথা থেকে এত স্পন্সরশিপ – সবই উঠত কিন্তু টাকার অঙ্কটা একটু অন্যরকম ছিল। তুলনায় কম বাজেটেও অনেক ভালো কাজ হয়েছে তখন। তখনও তুলনায় কম হলেও প্রচার, প্রতিযোগিতা সবই ছিল। তখন থেকেই নান্দনিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজ সচেতনতার ধারা, যাকে পুজো-শিল্প হিসাবে ধরা হচ্ছে, যা মানুষকে ভাবাবে। সে ভাবনা ছিল ছোটো কিন্তু সুন্দর, এই ধারায় মানুষকে ভাবাতে শুরু করে, রুচি পরিবর্তন করতে শুরু করে। (সমাজ পরিবর্তনে দুর্গাপুজোর ভূমিকা)
দুর্গাপুজো-শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী দেবতোষ কর কিছু বছর আগে চোরবাগান বা বাদামতলায় অসামান্য শিল্প সৃষ্টি করেছিলেন। এ-বছর তিনি ভবানীপুর এবং বেলগাছিয়ার দুটি পুজো মণ্ডপের দায়িত্বে রয়েছেন। দেবতোষ মনে করেন, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত সরিয়ে রেখে যদি দেখা হয়, অর্থনৈতিকভাবে পুজোর পরিকাঠামোতে একটি ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পুজোর বাজেটের নিরিখে আগে যেখানে একটি মণ্ডপে মূল শিল্পীর সঙ্গে পাঁচজন সহশিল্পী কাজ করতে পারতেন, সেখানে আজকে কিছু পুজোয় পঞ্চাশ জন পর্যন্ত সহশিল্পী কাজ করছেন। এই পরিবর্তন আশার আলো জাগায় বলেই মনে করেন তিনি।
অর্থনৈতিকভাবে পুজোর পরিকাঠামোতে একটি ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পুজোর বাজেটের নিরিখে আগে যেখানে একটি মণ্ডপে মূল শিল্পীর সঙ্গে পাঁচজন সহশিল্পী কাজ করতে পারতেন, সেখানে আজকে কিছু পুজোয় পঞ্চাশ জন পর্যন্ত সহশিল্পী কাজ করছেন।
এ-লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে, দুর্গাপুজো আদৌ সমাজ পরিবর্তন আনতে পারলো কি না, এই প্রশ্নের অভিমুখ বহুমুখী ও উত্তরের গতিপথ নানাবিধ। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বহু পূর্বে। আমরা প্রায় সকলেই জানি স্বাধীনতার পূর্বে মূলত কলকাতার এবং সারা বাংলার দুর্গাপুজোর কেন্দ্রগুলি হয়ে উঠেছিল গুপ্তসমিতির আঁতুড়ঘর। সিমলা ব্যায়াম সমিতি থেকে শুরু করে বাগবাজার সর্বজনীন, সবকটা পুজোতেই জড়িয়ে আছে একদিকে দেশাত্মবোধ, অন্যদিকে জনগণতান্ত্রিক পুজোর কাঠামো। আপাত হিন্দু জাতীয়তাবাদ মনে হলেও, এই পুজোগুলি তথা তার আড়ালে থাকা সংগঠনগুলি কি শুধুই হিন্দু জাতীয়তাবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত ছিল? নাকি এর বীজ লুকিয়ে ছিল আরও গভীরে এবং সেই গাছ বেড়ে উঠেছিল আরও ব্যাপকভাবে? এটা কি সমাজ পরিবর্তন নয়?
সমসাময়িককালের থিমপুজো অথবা ভাবনাধর্মী পুজোয় এমন বহু বিষয় ও প্রসঙ্গ উঠে আসে, যেগুলি প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সমাজকে বিভিন্ন সমস্যা, অসুবিধা ও কুপ্রথাকে নির্দেশ করে। দুর্গাপুজোর বিষয় হয়ে ওঠে পরিযায়ী শ্রমিক, কখনও নারী সুরক্ষা। হ্যাঁ, এই পুজো প্যান্ডেলগুলি হয়তো এক ধাক্কায় সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না, কিন্তু মানুষকে ভাবাতে পারে, মানুষকে সচেতন করতে পারে। যেকোনো শিল্প মাধ্যমের কাজ তো সেটাই। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ‘সাইট স্পেসিফিক ইনস্টলেশন আর্ট ফেস্টিভ্যাল’ হিসেবে যখন দুর্গাপুজোকে দেখা হচ্ছে, তখন খুব স্বভাবতই ধরে নেওয়া যায় সেটি সমাজকে নিয়ে ভাববে, ভাবাবে।
ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তর্ক আর গপ্প’-তে, এই যে চাষির সঞ্চিত বাসনা ও ক্রোধের প্রকাশ, যেখানে ছৌ নাচের মধ্যে শিল্পী জ্ঞানেশ মুখার্জি এবং ব্রাহ্মণ বিজন ভট্টাচার্যের মধ্যে তর্ক চলছিল, সেখানে লৌকিক মা ও সংস্কৃত মায়ের দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে, যার মধ্যে লৌকিক মাকে ঋত্বিক ঘটক পছন্দ করছেন। যে মা ছৌ নাচেন, যে মা দরিদ্রের শস্যে লিপ্ত হয়ে আছেন।
দুর্গাপুজো আদৌ কি সমাজ পরিবর্তন আনতে পারলো? খানিক ভিন্ন সুরেই কথা বলেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। তিনি এককথায় উত্তর দেন – না, দুর্গাপুজো সমাজ পরিবর্তন করতে পেরেছে বলে তিনি মনে করেন না। অন্যদিকে অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন, “এই দুর্গা প্রতিমাকে যদি ব্যবহারের প্রসঙ্গ আসে, আমি নিজে এই প্রতিমাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারি না। যেমন ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তর্ক আর গপ্প’-তে, এই যে চাষির সঞ্চিত বাসনা ও ক্রোধের প্রকাশ, যেখানে ছৌ নাচের মধ্যে শিল্পী জ্ঞানেশ মুখার্জি এবং ব্রাহ্মণ বিজন ভট্টাচার্যের মধ্যে তর্ক চলছিল, সেখানে লৌকিক মা ও সংস্কৃত মায়ের দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে, যার মধ্যে লৌকিক মাকে ঋত্বিক ঘটক পছন্দ করছেন। যে মা ছৌ নাচেন, যে মা দরিদ্রের শস্যে লিপ্ত হয়ে আছেন, সেই মা এক ধরনের জাতীয় রূপক হিসেবে দেখা দিতে পারেন। বা ধরা যাক, বিজন ভট্টাচার্যে ‘দেবীগর্জন’ নাটক প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলে জনসাধারণ বিদ্রোহ করতে বাধ্য হবে এবং তাদের সেই হিংস্রতা আমি দেবীর গর্জনের সঙ্গে তুলনা করি। আমাদের সংস্কৃতিতে যতক্ষণ পর্যন্ত ঈশ্বর এবং ঈশ্বরীদের নিত্য মহাদানা, শিবের এই প্রলয়নৃত্য এবং দুর্গার এই রণবাসনা থাকবে ততক্ষণ জনসাধারণের বিশ্বাসকে আমি সম্মান দিয়ে যাব। কিন্তু সেই বিশ্বাসকে সম্মান দেওয়ার সঙ্গে কলকাতা শহরে আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে যে উন্মাদ প্রবাহ দেখা দেবে তার সঙ্গে আমার কোনো সংযোগ নেই।”
যেকোনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য আরও বেশি সংখ্যক অর্থ উপার্জন। কিন্তু তারপরেও একটা কথা থেকে যায়। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী হাজার হাজার নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে, যারা নামি ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পরেন না, শহরের দামি রেস্তোরাঁয় ডিনার করেন না, তাদের কাছেও কিন্তু পুজোর একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গুরুত্ব আছে। গড়িয়াহাট অথবা হাতিবাগানের সস্তা জামা-কাপড়ে কিংবা রাস্তার ধারের স্টলের অত্যন্ত কমদামি চাউমিন খেয়ে যাদের পুজো কাটে, সামগ্রিক পুজোর পরিকাঠামো কিন্তু ওই মানুষগুলোর উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। যে মানুষগুলোর সারা বছরে আনন্দ বলতে তেমন কিছু নেই, যাদের জীবন কাটে একটি অসম্ভব অনিশ্চয়তার মধ্যে, পুজো তাদের কাছে হয়তো একমাত্র এস্কেপ রুট বা পালাবার পথ।
পুজো সমাজ পরিবর্তন করতে পারে কি না, এই লেখার শেষে এই প্রশ্নের দুটি উত্তর পাওয়া যেতে পারে, ফাঁকা চোখে সোজাসুজি দেখলে সরাসরিভাবে পুজো কোনোরকম সমাজ পরিবর্তন করে না। যে পরিবর্তনটা আসে সেটি কিছুটা আর্থিক, কিছুটা সামাজিক, কিছুটা রাজনৈতিক। তবে শুধুমাত্র পুজোর বেড়াজাল টপকে সামগ্রিক উৎসব অবশ্যই সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিতে পারে। সারা বাংলায় বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে যখন থিমের কাজ হয়, সেখান থেকে উঠে আসে সমাজ সচেতনতার কথা, উঠে আসে সমাজের বিভিন্ন অন্ধকার দিক নিয়ে আলোচনা, তখন সেই কাজ প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর দৃশ্য যখন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তা আমাদের ভাবাবে এটাই স্বাভাবিক। যদি কোনো শিশু বা কিশোর সমাজ সচেতনতামূলক থিমের কোনো কাজ দেখে নিজে ভাবে অথবা তার সঙ্গে থাকা অভিভাবকদের প্রশ্ন করতে শুরু করে, সেটাই তো সমাজ পরিবর্তনের প্রাথমিক পদক্ষেপ, নয় কি?

