দুর্গাপুজোর ইতিহাসে উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে প্রতিবাদ, সমাজবিপ্লবের আখ্যান!

“নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়”

ন্নদামঙ্গল কাব্যে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগসন্ধিক্ষণের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। অর্থাৎ, নগরে কোনও কারণে অস্থিরতার সৃষ্টি হলে দেবালয়েও তার আঁচ লাগে। তেমনই সাহিত্য, সংস্কৃতি, উৎসবও কখনো সমাজ বিমুখ হতে পারে না। সমাজে যা ঘটছে তার প্রতিফলন দেখা যায় সাহিত্যের পাতায়, সংস্কৃতির ধারায়। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় সমাজের ভাঙাগড়া, বিপ্লব, প্রতিবাদ ইত্যাদি বারবার বিম্বিত হয়েছে সমকালীন দুর্গোৎসবে। তাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দুর্গাপুজো নিছকই বাঙালির আনন্দ অনুষ্ঠানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং কখনো তা হয়ে উঠেছে সমাজবিপ্লবের আখ্যান আবার কখনো দুর্গাপুজোর ঢাকের আওয়াজের সঙ্গে মিশে গেছে প্রতিবাদের দামামা।

বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় সমাজের ভাঙাগড়া, বিপ্লব, প্রতিবাদ ইত্যাদি বারবার বিম্বিত হয়েছে সমকালীন দুর্গোৎসবে।

মহিষাসুরমর্দিনী পুজোর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় আনুমানিক অষ্টম শতকে রচিত ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে। এছাড়াও মার্কন্ডেয় পুরাণে দুর্গাপুজোর কথা আছে। তবে বাংলায় দুর্গাপুজো কবে শুরু হয়েছিল তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে। কেউ কেউ বলেন ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে অবিভক্ত বাংলার উত্তরবঙ্গের রাজশাহি জেলার তাহেরপুর অঞ্চলের জমিদার কংসনারায়ণ তাঁর গড়ে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। আবার কারো কারো মতে নদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর তৎকালীন রাজধানী বাগোয়ান গ্রামে প্রথম দুর্গাপুজো করেন। কলকাতায় দুর্গাপুজোর সূচনা হয় ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারে। এরপরে বিত্তবান অনেক পরিবারে শুরু হয় দুর্গাপুজো। ইংরেজ শাসিত ভারতে কিছু কিছু পরিবারে দুর্গাপুজো কখনো হয়ে উঠেছে ব্রিটিশ তোষণের উৎসব আবার কোনও কোনও পরিবার দুর্গাপুজোকে ঘিরেই ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। সময় বদলেছে, ধনী পরিবারের আঙিনা ছেড়ে দুর্গা এসেছেন নির্দিষ্ট কিছুজনের উদ্যোগে, শুরু হয়েছে বারোয়ারি পুজো, ধীরে ধীরে কিছু নির্দিষ্ট মানুষের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেবী এসেছেন সর্বজনের মাঝে; পুজো হয়েছে সর্বজনীন। সময়ের দাবিতে সেখানেও পুজোর সঙ্গে মিশেছে প্রতিবাদের সুর।

বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে সমাজ বিপ্লবের যোগসূত্র কোথায়? এই প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ গৌতম বসুমল্লিক বঙ্গদর্শন.কমকে জানালেন, “বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে সমাজ বিপ্লবের যোগসূত্রকে অস্বীকার করা যায় না। এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলি দুর্গামূর্তির কথা। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভারতের অন্যান্য স্থানের দুর্গাপূজার সঙ্গে বাংলার দুর্গাপূজার পার্থক্য আছে। বাংলা বাদ দিয়ে সারা ভারতের অনেক জায়গায় এইসময় নবদুর্গার পুজো করা হয়, এবং একটা ব্রত হিসাবে সেটা উদযাপিত হয়। এই পুজো নবরাত্রি বলে খ্যাত। এই পুজোয় নয় দিনে দেবীর নয়টি রূপের আরাধনা করা হয়। সেখানে বাঙালি দুর্গার যে আকৃতিগত চেহারা সেটা কিন্তু আমরা দেখতে পাই না। বাংলায় মূলত পূজিত হন দশভূজা সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গামূর্তি, সেখানে দুর্গা ছাড়াও লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ এই চার দেবদেবীর উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। এই দুর্গামূর্তিই বহুল প্রচলিত। এছাড়াও বাংলায় আরও দুই ধরনের দুর্গামূর্তি দেখা যায়, তার মধ্যে একটি অভয়া দুর্গা, যেখানে দেবী দ্বিভূজা এবং তার হাতে কোন অস্ত্র নেই, এখানেও দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী,কার্তিক, গণেশ- এর উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। অপর একটি মূর্তি হলো শিবদুর্গা মূর্তি অর্থাৎ শিব এবং দুর্গার যুগল মূর্তি।” 

এখন প্রশ্ন হলো, দুর্গার সঙ্গে আরও চারজন দেব-দেবীর (যাদের দেবীর সন্তান হিসাবে কল্পনা করে নেওয়া হয়) পুজো বাংলায় প্রচলিত হলো কেন? গৌতমবাবুর মতে, “স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেও আধুনিক পন্ডিতরা মনে করেন, এর পিছনে সমাজতাত্ত্বিক কারণ আছে। সারা ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান হলেও বাংলায় বৌদ্ধ শাসন চলেছিল সেন পূর্ববর্তী যুগ অবধি। সেন রাজবংশ ছিল কট্টর শৈব এবং তারা এই বৌদ্ধ অধ্যুষিত বাংলায় প্রজাদের ওপর নিজেদের ধর্ম আরোপ করতে চেয়েছিল। সেখানেই শুরু হয় সংঘাত। এই বংশের আমলেই শুরু হয়েছিল জাতিভেদ প্রথা। জাতিভেদ হলো পেশা ভিত্তিক। এরপর শুরু হলো ইসলামী শাসন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব পড়লো সমাজের ক্ষেত্রে। এর কিছু পরেই রচিত হয় কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণ, সেখানেই প্রথম অকাল বোধনের দুর্গাপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইসলাম শাসন শুরু হলে সমাজে আবার ধর্মান্তরকরণ শুরু হয়। তবে, সেটা অংশত, কারণ সমাজপতিরা ছিলেন মূলত হিন্দু ব্রাহ্মণ্য শ্রেণীর। তারা সেসময় সেন রাজাদের অপূর্ণ কাজ অর্থাৎ জাতিভেদ প্রথা বজায় রাখার একটা উপায় খুঁজছিল, যেখানে বর্ণাশ্রমটা মানুষের চোখে স্পষ্ট করে বোঝানো যাবে। সেখান থেকেই দুর্গামূর্তির সঙ্গে বাকী চার দেব দেবীর আবির্ভাব। খেয়াল করলে দেখা যাবে, দুর্গার একদিকে আছেন সরস্বতী যিনি বিদ্যা ও সংস্কৃতির দেবী, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ শ্রেণীর প্রতিভূ, কার্তিক যুদ্ধবিদ্যার দেবতা, তিনি ক্ষত্রিয় শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, ধনের দেবী লক্ষ্মী বৈশ্য সমাজের প্রতীক এবং গণেশ বা গণপতি অর্থাৎ গণের পতি বাকি  তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর প্রতিভু”। এইভাবে বাংলার দুর্গাপুজোয় মূর্তির ক্ষেত্রে সমাজের ছাপ দেখা যায়।

বাঙালিরা দেবীকে ঘরের মেয়ে হিসাবে যেমন বরণ করেছে, তেমনই অন্যায় অসাম্য দেখলে দেবীর শক্তিরূপকে স্মরণ করে এই আনন্দ অনুষ্ঠানের সময়কেই বেছে নিয়েছে প্রতিবাদের সময় হিসাবে।

ভবানীপুরের দে বাড়িতে কোট-বুট পরা ইংরেজ অসুর

দুর্গাপূজাকে ঘিরে বিপ্লবের সুর বারবার ধ্বনিত হয়েছে বাংলায়। পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতা ভারতের রাজধানী হয়। নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে তখন প্রচুর বিত্তশালী মানুষের ঠিকানা হয় কলকাতা। বাড়ে দুর্গাপুজোর সংখ্যাও। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কালে দেখা যায় কিছু পরিবার দুর্গাপূজার মাধ্যমে সরাসরি ব্রিটিশ বিরোধীতার বার্তা দেয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তর কলকাতার হাটখোলার দত্ত পরিবার। পরিবার সূত্রে জানা যায়, স্বদেশি আন্দোলনে দেশ যখন আন্দোলিত তখন এই পরিবারের কোন এক পূর্বপুরুষ বিসর্জনের পর বাড়ি ফেরার পথে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “বঙ্গ আমার জননী আমার” গানটি গাইতে শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে গলা মেলান অন্যান্য সদস্যরাও। সেই থেকে এই রীতি আজও বহমান। আবার জোড়াসাঁকোর দীর্ঘাঙ্গীবাড়িতে বাড়ির কর্তারা মহাত্মা গান্ধির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতিমাকে খদ্দরের পোষাক পরালেন। পুজো নির্বিঘ্নে কাটলেও বিসর্জনের সময় খদ্দরের পোষাক পরিহিত ঠাকুর পুলিশ আটকে রাখলো। পরে পুলিশের বড়ো  কর্তাদের হস্তক্ষেপে ব্যাপারটি মিটমাট হয়ে যায়। আবার ভবানীপুরের দে বাড়িতে অসুরকে কোট-প্যান্ট পরানোর রীতি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও বদলায়নি।

বিশ শতকের প্রথম দশক, বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশি আন্দোলনকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে বাঙালি। সেই একতার বলেই দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলের কিছু যুবক ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা প্রতিষ্ঠা করে বলরাম বসু ঘাট রোডে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে শুরু করেন কলকাতার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজা। যদিও তার আগে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় এক গৃহস্বামীর আর্থিক সংকটে জগদ্ধাত্রী পুজো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে আঞ্চলিক বারো জন বন্ধু চাঁদা তুলে অর্থ সংস্থান করে পুজোটিকে রক্ষা করেন। সেই বারো জন বন্ধু বা ইয়ারের জন্যই নাম হলো বারো ইয়ারি বা বারোয়ারি পুজো। তবে বারোয়ারি পুজোও শুধু উদ্যোক্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সর্বজনের অধিকার সেখানেও থাকে না। কলকাতায় দুর্গাকে সর্বজনের মাঝে প্রথম নিয়ে আসেন বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসু। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিমলা ব্যায়াম সমিতি ছিল বিপ্লবীদের আস্তানা। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এই সমিতির উদ্যোগেই কলকাতায় প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম।

সিমলা ব্যায়াম সমিতির সর্বজনীন পুজোর কিছু আগে শুরু হয় ‘নেবুবাগান বারোয়ারি’ পুজো। এই পুজোই বর্তমানের বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপুজো। এই পুজো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৯৩৮-৩৯ খ্রিস্টাব্দে এই পুজোয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এছাড়াও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত প্রমুখ দিকপালদের নাম জড়িয়ে আছে এই পুজোর সঙ্গে। বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বীরাষ্টমী ব্রত। অষ্টমীর দিন সকালে লাঠিখেলা, ছুরিখেলা, কুস্তি প্রভৃতি দেশজ খেলার মাধ্যমে শক্তির আরাধনা হয় এই মন্ডপে। শোনা যায়, অনুশীলন সমিতির সদস্যরা এই সময় ভিড়ে মিশে গিয়ে জনসংযোগ করতেন।

কমলাকান্তের দপ্তরে আফিঙখোর কমলাকান্তের মুখ দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেশমাতৃকার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন  দুর্গাকে। বাঙালিরা দেবীকে ঘরের মেয়ে হিসাবে যেমন বরণ করেছে, তেমনই অন্যায় অসাম্য দেখলে দেবীর শক্তিরূপকে স্মরণ করে এই আনন্দ অনুষ্ঠানের সময়কেই বেছে নিয়েছে প্রতিবাদের সময় হিসাবে। তখন মহানবমীর যজ্ঞ হয়ে ওঠে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পোড়ানোর হোমাগ্নি।

______________________

তথ্যসূত্র:
১.  গ্রন্থ; কলকাতার পারিবারিক দুর্গাপুজো, লেখক – গৌতম বসু মল্লিক, প্রকাশক: কারিগর
২. ইন্টারনেট: www.bsde.org এবং www.anandabazar.com

Written by