বোলপুরের সুপুর জনপদ ও প্রত্নক্ষেত্র দেউলির অজানা কাহিনি

এশিয়ার প্রাচীনতম দুর্গামূর্তি বোলপুরের কাছে দেউলি গ্রামেই আছে

দেউলিতে দালানের ভগ্নাবশেষ

নীরবে নিভৃতে এক ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত সভ্যতা মাটিতে মিশেছে। বৈদেশিক শক্তি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আবার ধ্বংস হয়েছে। তবু তিলে তিলে থেকে গিয়েছে বাংলার কিছু অজানা কাহিনি। যেন পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে।

অতীশ দীপঙ্কর (৯৮২-১০৫৪) মহাযান শাখার বৌদ্ধ পণ্ডিত। বোলপুরের কাছে এক প্রাচীন ভাঙা শিলালিপি (সিয়ান লেখ) থেকে জানা যায়, শৈব পালসম্রাট নয় পালদেবের (১০২৬-১০৪১) সঙ্গে চেদি-রাজ কর্ণদেবের যুদ্ধে শান্তি চুক্তির কথা। অতীশ পণ্ডিতের জন্য এই শান্তি চুক্তি সম্ভব হয়েছিল। এই সময়, অতীশ দীপঙ্কর বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধক্ষ্য পদে নিযুক্ত ছিলেন।

দেউলিতে পাওয়া গেছে প্রাচীন বিষ্ণু মূর্তি

কড়িধ্যা, সুপুর, দেউলি ও বোলপুরের একাধিক স্থান বর্গী হানার শিকার হয়। এই সকল জায়গার উপর দিয়ে বয়ে গেছে অন্যায় অত্যাচার, জমিদারদের কর্তৃত্ব, নীল কুঠির সাহেবদের কর আদায়। অতীতের বজ্রভূমিই বীরভূম, তারপর বলিপুর থেকে বোলপুর। স্বপুর থেকে সুপুর নৌবন্দর। এমন কত অজানা অতীত।

বৌদ্ধ পণ্ডিতের শিষ্য হন রাজা নয় পাল। রাজা নয় পাল ছিলেন সুশাসক। তিনি প্রথম মহিপালের পুত্র। বৌদ্ধ পণ্ডিত দেখেছিলেন বোলপুরের আশেপাশে শৈব ক্ষেত্র, পার্বতী মন্দির, অজয়ের নৌবন্দর। এই বন্দর দিয়ে কার্পাস, রেশম, তসর, নীল, লাক্ষা রপ্তানি হত দেশে-বিদেশে এমনকি তিব্বতে। অজয় ভাসিয়ে নিয়েছে বহু নিদর্শন।

গৌড়ের সন্ধ্যাকর নন্দীর লেখা থেকে জানা যায় ওই শাসনামলের ভিজ্যুয়াল আর্ট উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেসব আমলের নিদর্শন দেউলির মাটির নিচ থেকে পাওয়া যায়। নয় পাল পার্বতীর মন্দির অজয়ের পাড় ঘেঁষে নির্মাণ করেন। আবার প্রাচীন বঙ্গে, বোলপুরের স্বপুর (সুপুর) সুরথের রাজ্য ছিল। সুরথ প্রতিষ্ঠিত করেন শিবিক্ষা দেবী।

খ্যাঁদা পার্বতী

বাংলার পুরাতত্ত্ব চর্চায় কড়িধ্যা নামের এক প্রাচীন জনপদ পাওয়া যায়। যেটি বোলপুরের কাছেই ছিল। বর্গি এল দেশে! কড়িধ্যার জমিদার বর্গি মারাঠাদের অভিযান আটকাতে শিব মন্দির নির্মাণ করলেন। বর্গিরা শিবের প্রবল ভক্ত। তাই গ্রামের পর গ্রামে প্রত্যেক স্থানে শিব মন্দির নির্মাণ হয়। রক্ষা পেল সে জনপদ। আরেকবার বর্গি সৈন্য লুঠ চালাতে এলো। রুখে দাঁড়ালেন এক বৈষ্ণব পদকর্তা। সুপুরের আনন্দচাঁদ গোঁসাই বর্গীদের প্রতিহত করতে অস্ত্র তুলে নেন। গ্রামের লোকদের এক করলেন। এরপর গ্রামের চারদিকে খাল কেটে পরিখা গড়েছিলেন। কড়িধ্যা, সুপুর, দেউলি ও বোলপুরের একাধিক স্থান বর্গী হানার শিকার হয়। এই সকল জায়গার উপর দিয়ে বয়ে গেছে অন্যায় অত্যাচার, জমিদারদের কর্তৃত্ব, নীল কুঠির সাহেবদের কর আদায়। অতীতের বজ্রভূমিই বীরভূম, তারপর বলিপুর থেকে বোলপুর। স্বপুর থেকে সুপুর নৌবন্দর। এমন কত অজানা অতীত।

সমগ্র এশিয়ার প্রাচীনতম দুর্গামূর্তি বোলপুরের কাছে দেউলি গ্রামে আছে। অজয় নদীর পাড়ে। স্থানীয় পুকুর থেকে জল নিষ্কাশন ও খননের ফলে বহু প্রাচীণ মূল্যবান মূর্তি উদ্ধার হয়। দেউলেশ্বর মহাদেবের দেউল থেকে জায়গার নাম দেউলি হয়েছে। এই দেউলিতে মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব কবি লোচন দাসের সিদ্ধাসন।

অজয় নদ

গবেষকরা মনে করেন দেউলিতে দুর্গার প্রস্তরমূর্তিটি পাল যুগের সময়কার। গোটা দেউলি গ্রামে কোথাও দুর্গোৎসব হয় না। শরৎকালে এই দুর্গামূর্তি শাস্ত্র মতে পুজো করা হয়। মনে করা হয় যে, পাল রাজা নয় পালের আমলে নির্মিত। পাদপীঠের ওপর দুর্গামূর্তিটি এখানে মহিষাসুর বধ। মূর্তির পিছনের অংশে দুইদিকে আছেন অপ্সরা। মাথায় কীর্তিমুখ। ডান দিকে মহিষের মাথা থেকে বেরিয়ে আসছে মহিষাসুর। অসুরকে দুর্গা ত্রিশূলে বিদ্ধ করেছেন। বামদিকে আছে শার্দুল। এমন মূর্তি আরও আটটি ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে এই একটিই আছে। কালাপাহাড়ের হাত থেকেও রেহাই পায়নি এই ভাস্কর্য। কালাপাহাড়ের তরবারির কোপে দেবীর নাকের অংশটি কাটা যায়। গ্রামীণ মানুষ সেই থেকে দেবীকে খ্যাদা পার্বতী নামে ডাকেন। এছাড়াও, মাটি খুঁড়ে একাধিক পালযুগের বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া গেছে।

দেউল ঢেকেছে ঝুরিতে, সুপুর

নতুন সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হলেও পথে প্রান্তরে সেকালের নিদর্শন আজও এই সকল স্থানে উদ্ধার হয়। কত কাহিনি এভাবে চাপা পড়ে আছে। মানব জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে অতীতের কত নিদর্শন। এগুলো আমাদের সংস্কৃতির উপাদান। আর সাধারণ মানুষের উচিত এই নিদর্শনগুলি লালন করা।

__________________ 
তথ্যসূত্র: দেবকুমার চক্রবর্তী, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, স্থানীয় গ্রামীণ মানুষ। ছবি: লেখক।

 

Developed by DXDasia