
জামদানি : চলমান ইতিহাসের আখ্যান
সে শাড়ি শরতের মেঘের মতো মিহি, শীতের কুয়াশার মতো সূক্ষ। কলমিলতা, শাপলা ফুলের ছন্দ ভেসে ওঠে তার বুকে। যেন হাওয়ার বুকে কে ছড়িয়ে দিয়েছে এক রাশ রক্তকরবীর পাপড়ি! তাই এ শাড়ির আদরের নাম ‘Woven Air’ মানে বোনা বাতাস। এসব নেহাৎ কথার কথা মনে হবে না, যদি নামটি হয় জামদানি শাড়ি (Jamdani Saree)। কলকাতায় যা ঢাকাই শাড়ি, বাংলাদেশে সেই শাড়ি জামদানি। আর শাড়িপ্রেমীদের মুখে এপার-ওপার মিলে হয়েছে ঢাকাই জামদানি।
জামদানি শাড়ি আসলে দুই বাংলার বহমান ইতিহাস। বুনন শিল্পের ঐতিহ্যর স্মারক। যুগ যুগ ধরে যাতে মিশেছে বাঙালি তাঁতশিল্পীদের মেধা, শিল্পবোধ ও চূড়ান্ত পরিশ্রম। জামদানি শব্দটি এসেছে ফার্সি থেকে। ‘জাম’ শব্দের অর্থ ‘কাপড়’ আর ‘দানা’ শব্দের অর্থ ‘বুটি’। সেই অর্থে জামদানি আসলে বুটিদানার কাপড়। একসময় বাংলার মিহি বস্ত্রের চাহিদা ছিল পৃথিবী জুড়ে। মসলিন আর জামদানির চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে সোনার গাঁ ছিল জামদানি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। লাগোয়া রূপগঞ্জ, বাজিতপুর, তিতাবাড়ি গমগম করত জামদানির কেন্দ্র হিসাবে। বলা হয় শীতলক্ষ্যার হাওয়ায় জাদু আছে। সেই জাদুতেই এমন অপরূপা হয়ে ওঠে জামদানি। জলবায়ুর কারণেই ঢাকা হয়ে উঠেছিল জামদানি শিল্পের কেন্দ্রস্থল। তাই শাড়ির নাম লোকমুখে আজও ‘ঢাকাই জামদানি’। গ্রিক, রোমান থেকে শুরু করে মুঘল বা ইংরেজ সকলের নজর পড়েছিল বাংলার এই সম্পদের উপর। জাহাঙ্গীর এই শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কিন্তু জামদানির সুদিনে ধাক্কা দেয় ইংরেজরা।
শাপলাফুল, বেলফুল, আঙুরলতা, পান্না, ময়ূর পাড়, চন্দ্রপাড়-এইসব নাম ঘোরাফেরা করে শিল্পীদের অন্দরমহলে। সুতো চিকন হোক বা মোটা এক সুতোর টানেই হবে পুরো শাড়ি। তাঁদের মতে একটা ভালো জামদানি হবে স্পর্শে নরম, ১২ হাত লম্বা এবং ৫৬ ইঞ্চি চওড়া।

১৮৫০-এ নীলবিদ্রোহের প্রতিশোধ নিতে তারা মসলিন শিল্পীদের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে ফেলে। ইংল্যান্ডের মেশিনে তৈরি কাপড়কে জনপ্রিয় করতে চরম ক্ষতি করে তারা বাংলার বয়ন শিল্পের। হারিয়ে যায় বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য মসলিন। আর জামদানি হয়ে ওঠে বাংলার প্রধান বস্ত্রশিল্প। তারপর থেকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, বদল আর বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েও আজও অম্লান জামদানির ঐতিহ্য। বয়নের সূক্ষতা এ শাড়ির প্রাণ। জামদানি শিল্পীরা ছোটোবেলা থেকেই এই শাড়ির কাজ শিখতে শুরু করেন। যত নরম হাত, যত প্রখর দৃষ্টি-তত সূক্ষ বুটি ফুটে উঠবে শাড়ির জমিতে। একটা নিখুঁত জামদানি বুনতে ছয় মাস ধরেও লেগে আছেন শিল্পী এমন ঘটনা দুর্লভ নয়। আবার ৩০ দিনের মধ্যে শাড়ি বোনা সম্পূর্ণ হয়ে যায়। জামদানির রহস্য নির্ভর করে বয়নশিল্পীর মেধা, মৌলিকতা, ধৈর্য্য ও পরিশ্রমের উপর। আসল জামদানি তৈরি হয় হাতে বুনে।
সুতোর রঙের উপর নির্ভর করে জামদানির নামেও এসেছে নানা বাহার। শাপলাফুল, বেলফুল, আঙুরলতা, পান্না, ময়ূর পাড়, চন্দ্রপাড়-এইসব নাম ঘোরাফেরা করে শিল্পীদের অন্দরমহলে। নামের ভিত্তিতেই তাঁরা বোনেন পাড়ের ডিজাইন। সুতো চিকন হোক বা মোটা এক সুতোর টানেই হবে পুরো শাড়ি। তাঁদের মতে একটা ভালো জামদানি হবে স্পর্শে নরম, ১২ হাত লম্বা এবং ৫৬ ইঞ্চি চওড়া। এখন দুই বাংলার বাজারেই যে সব জামদানি দেখা যায় তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা ছিল আগেকার জামদানি। তখন কাজ হত ডিটেইল মোটিফে। মুঘল আমলে দক্ষ শিল্পীদের যেমন জটিল নকশা সৃষ্টিতে উৎসাহ দেওয়া হত। তেমনি আবার ফুল, ফল, গাছ, পাতার বুটির সরলতা ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। এমনকি ২-৩ জন শিল্পী মিলে একটা শাড়িতে কাজ করতেন। নকশার জটিলতার উপর নির্ভর করত সময়। বাতাসের মতো সূক্ষ জামদানির কাউন্ট থাকত ৪০০-১০০০ বা তারও বেশি। বয়নের পদ্ধতি ছিল পুরোপুরি পরিবেশ বান্ধব।
ঢাকাই মসলিনের উত্তরাধিকার বহন করছে ঢাকাই জামদানি। মসলিনের মতো সূক্ষ না হলেও এই শাড়ি তার নিজের গুণে মৌলিক। একসময় মসলিনের উপর নকশা করে জামদানি বোনা হত। মুঘল দরবার, নেপাল রাজদরবারে রাজপুরুষরা জামদানি দিয়ে তৈরি শেরওয়ানি পরতেন। জামদানি সময়ের দলিল। দেশভাগের পর বহু জামদানি শিল্পী পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। এই বঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন নিজেদের জীবন এবং শিল্পকে। শান্তিপুর, ফুলিয়া, কালনা, কাটোয়া, করিমপুর, বেথুয়াডহরি অঞ্চলে এখন জামদানির কাজ হয়। এই সমস্ত অঞ্চলে মসলিন জামদানিও করছেন কেউ কেউ। তবে সংখ্যায় অল্প। এ বঙ্গে জনপ্রিয় টাঙ্গাইল জামদানি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নকশা আর কালার প্যালেটে পরিবর্তন হয়েছে। জামদানি এখন আর তার রাজ দরবারি মেজাজে আটকে নেই, হয়ে উঠেছে রানওয়ে স্টাইলের স্টেটমেন্ট। অফিস থেকে প্রতিদিনের ব্যস্ততায় থাকছে সফট কটন জামদানি। সেখানে তেরচা, কলকা, ফুলওয়ার, আশরাফি এই সব মোটিফের চল বেশি। এপারের জামদানির মোটিফে এখন ফিগারের কাজ চলছে। ট্রাডিশনাল ছক ভেঙে হাতি, হরিণ, পাখি কিংবা বাঘের মতো ফিগার দেখা যাচ্ছে।

দেশভাগের পর বহু জামদানি শিল্পী পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। এই বঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন নিজেদের জীবন এবং শিল্পকে। শান্তিপুর, ফুলিয়া, কালনা, কাটোয়া, করিমপুর, বেথুয়াডহরি অঞ্চলে এখন জামদানির কাজ হয়। এ বঙ্গে জনপ্রিয় টাঙ্গাইল জামদানি।
আজকের দিনে জামদানির অবস্থান ঠিক কোন জায়গায়? দেবলীনা মুখোপাধ্যায় হাওড়ার এক কলেজে পড়ান। তাঁর কথায়, রোজকার ব্যস্ততা থাকলেও মাঝে মাঝেই কলেজের সাজে বেছে নেন জামদানি। আবার বিয়েবাড়ির সাজেও থাকে জামদানি। তাই হালকা আর ভারি দুই কাজের জামদানিই তাঁর পছন্দ। বাংলাদেশের বেশ কিছু ঢাকাই রয়েছে সংগ্রহে। তবে পছন্দ নরম কটন ঢাকাই। কারণ সহজে পরা যায়। এ বঙ্গে জামদানি শিল্পের ছবি এই মুহূর্তে ঠিক কেমন? টেক্সটাইল ডিজাইনার শ্যাম বিশ্বাস জানিয়েছেন, এপার বাংলায় মূলত দুই ধরনের জামদানি হয়। কটন জামদানি এবং রেশম জামদানি। কটন জামদানির চল বেশি। মসলিন জামদানি সময় সাপেক্ষ এবং ধৈর্য্যর ব্যাপার হওয়ায় বহু কারিগর তুলনামূলকভাবে সহজ শাড়ির কাজ করছেন। সেক্ষেত্রে তাঁদের আর্থিক লাভও বেশি থাকে। তাঁর কথায়, জামদানি বয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় দক্ষ তাঁতির অভাব এবং খরচ। ভালো মসলিন জামদানির দাম শুরুই হয় ৫০-৬০ হাজার টাকা থেকে।
তবে এই বহুমূল্য জামদানি আপনি চাইলেই যে কোনও শোরুমে গিয়ে কিনে ফেলতে পারবেন না। যাঁরা এ ধরনের ‘অথেন্টিক’ শাড়ির ক্রেতা তাঁরা খবর রাখেন কোন শিল্পী এমন জামদানির কাজ করেন। তাঁরা সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকেই অনেক ক্ষেত্রে শাড়ি কেনেন। তৃতীয় মাধ্যমের কাছে যান না। কিন্তু কীভাবে সঠিকদামে সঠিক জামদানির কাছে পৌঁছাবে মানুষ? শীত পড়লেই নানারকম মেলার আসর বসে, সেখানে শাড়ির স্টল, জামদানি প্যাভেলিয়ন থাকে। অনেক জায়গায় আবার বাংলাদেশ শাড়ির আলাদা স্টলও দেখা যায়। এই সব স্টল ঘিরে শাড়িপ্রেমী মানুষের উৎসাহ থাকে তুঙ্গে। দারুণ দেখতে এই সব শাড়ির দামও মন্দ নয়, কিন্তু মান? ডিজাইনার শ্যাম বিশ্বাসের মতও এমনটাই। তিনি বলেন, “এই সব শাড়ি দেখতে খুব সুন্দর, কিন্তু মসলিন জামদানি বলে যা দাবি করা হয় তা সবসময় আদৌ আসল মসলিন নয়।”
তাহলে কীভাবে চিনে নেবেন ‘আসল জামদানি’? বাংলার প্রায় গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা একযোগেই বলেন, জামদানি কেনার ক্ষেত্রে ‘থ্রেড কাউন্ট’ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম থেকেই পরিষ্কার থাকতে হবে কী ধরনের জামদানি আপনি কিনতে চান। কটন, রেশম নাকি মসলিন? দেড়শো কাউন্টের উপর খাদি চলে এলে এখন তাকে মসলিন হিসাবে ধরা হয়। আগে যেটা ছিল ৪০০-৫০০। খাদি ভীষণ সফট ফ্যাব্রিক। তার বিভিন্ন কাউন্ট হয়। তাই মসলিন ঢাকাই কেনার ক্ষেত্রে তার সঠিক কাউন্ট জেনে তবেই কিনবেন। সিল্ক বা রেশম জামদানি হলে জেনে নিতে হবে কী ধরনের সিল্ক ব্যবহার করা হয়েছে। কটন জামদানির ক্ষেত্রে একশো শতাংশ কটন পাবেন কিনা তাতে একটি বেশি চোখ কান খোলা রাখতে হবে। কারণ এখন এত রকম আর্টিফিশিয়াল থ্রেড বেরিয়েছে যে ধরা মুশকিল। পিওর কটন জামদানির আঁচলের শেষ প্রান্তে বাঁধা সুতোর ঝালর থাকে তা একটু কুঁকড়ে থাকার কথা। যা আপনি হাত দিয়ে মুড়লে কুঁচকে থাকবে। কিন্তু মেশানো সুতো হলে, তা হবে একদম সোজা, মুচড়ে দিলেও বদলাবে না। কটন জামদানি চেনার এটাই সবচেয়ে সহজ উপায়।

জামদানি বহুদিন ভালো রাখার কতগুলো পদ্ধতি রয়েছে। আগে একটা জামদানি বোনার কাজ শেষ হলে তাতে এমনভাবে তাঁত পালিশ করা হত যাতে সেই শাড়ি ৫০ বছর পরও হালকা মাড় দিলেই নতুনের মতো হয়ে যেত। এখন এই পদ্ধতি বদলেছে। শাড়ি ওয়াশ করলেই মাড় উঠে যায়। সুতো ছেঁড়ার আশঙ্কা দেখা যায়। তাই নিরাপদ সমাধান ড্রাই ওয়াশ। রেশম জামদানি পুরোনো হলে ভাঁজে ভাঁজে কেটে যায়। সিল্ক ন্যাচরাল ফ্যাব্রিক। দীর্ঘদিন থাকলে, পুরোনো হলে উড়ে যায়। তাই শাড়ি ভাঁজে ভাঁজে ফেঁসে যায়। দীর্ঘ দিন নাড়াচাড়া না হলে সুতো ভেঙে বা বেঁকে যায়। খাঁটি মসলিন জামদানি সঠিক যত্ন করলে ১৫০-১৬০ বছর বাদেও ব্যবহার করা যায়। তবে নিয়মিত নাড়াচাড়া ও দেখভাল করতে হবে শাড়ির।
পুরোনো জামদানি ছিঁড়ে বা কেটে গেলে সেই শাড়ি একেবারে বাতিল না করে রিক্রিয়েট করতে পারেন। তবে তা নির্ভর করছে কোন জায়গা কতখানি ছিঁড়েছে তার উপর। প্রাথমিকভাবে রিফু বা এমব্রয়ডারি করতে পারেন। এছাড়া ড্রেস, স্টোল বানাতে পারেন। ধরুন আপনার প্ৰিয় কোনও জামদানির আঁচল নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সেই অংশ বাদ দিয়ে জুড়ে নিতে পারেন নতুন আঁচল, জমিতেও করে নিতে পারেন একই মেটিরিয়ালের এপ্লিক। তবে ফ্যাব্রিকের ধরন হতে হবে একই। এখন জামদানির বেডশিট, কুশন কভার, পর্দা, হোম ডেকর সামগ্রীও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
কীভাবে চিনে নেবেন ‘আসল জামদানি’? বাংলার প্রায় গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা একযোগেই বলেন, জামদানি কেনার ক্ষেত্রে ‘থ্রেড কাউন্ট’ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম থেকেই পরিষ্কার থাকতে হবে কী ধরনের জামদানি আপনি কিনতে চান। কটন, রেশম নাকি মসলিন?

একশো বছরের প্রাচীন বাংলার জামদানি ঐতিহ্য এভাবেই বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। যেভাবে সময় আর সমাজের বাঁক বদল ঘটছে সেভাবেই সে বদলে নিচ্ছে নিজেকে। হয়ে উঠেছে ইতিহাসের আখ্যান। একটা বিষয়ে নিশ্চিত যে, বাঙালির জামদানি বদলাবে কিন্তু হারিয়ে যাবে না।
দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত দ্য বেঙ্গল স্টোর-এর টেক্সটাইল বিভাগে পাওয়া যায় হাতে বোনা জামদানি শাড়ি। অনলাইন সংগ্রহের জন্য লিংক: https://thebengalstore.com/search?type=product&q=jamdani&options%5Bprefix%5D=last
