
আমার সঙ্গে তাঁতশিল্পীর পরিচয় ঘটিয়েছেন মানিক বন্দ্যাপাধ্যায়, ‘শিল্পী’ গল্পের নায়ক মদন তাঁতির মাধ্যমে। ‘মদন যেদিন গামছা বুনবে…’ এ কথার ভেতর লুকিয়ে আছে এক শিল্পীর অস্তিত্ব, জীবন সংগ্রামের দলিল খণ্ড। সেই কারণেই একজন প্রকৃত তাঁতশিল্পী অনায়াসে মহাজনি প্রথার সামনে মাথা নত না করে সে তার অস্তিত্ব জানান দিতে পারেন দৃঢ় ভাবে। একটা সময় ছিল যখন একজন তাঁতিকে সবাই চিনতেন তাঁর কাপড় দেখে। আর সেই পরিচয় পৌঁছে যেত গ্রাম, শহর ছাড়িয়ে অনেক দূর। ‘এই ডিজাইন অমুক তাঁতির, ওঁর হাতের পাড় ঠিক এমন হয়’ – তাঁতিদের এরকম নিজস্বতা এখন আর চোখে পড়ে না তেমন। যন্ত্রে বোনা কাপড় চেহারায় সুন্দর, কিন্তু তার মধ্যে তাঁতির নিজস্ব আত্মপরিচয় হারিয়ে গেছে। আজ একজন হাতে বোনা তাঁত শিল্পীর আত্মপরিচয় সংকটের মুখেই শুধু নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্যান্য আরও বিষয়, যেগুলির দিকে তাকাতে গেলে আমাদের একটু পিছন ফিরে দেখতে হবে।
২০১০-২০১৫ সালে পাওয়ার লুমের আধিপত্য সাংঘাতিক ভাবে বেড়ে যাবার ফলে হাতের তাঁত ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। ৭৫% অঞ্চলের তাঁতকর্মীরা এখন যন্ত্র চালিত লুমে কাজ করছেন। এই হ্যান্ডলুম থেকে পাওয়ার লুমের রূপান্তর আর তার ফলে নকশা, সুতো, মূল্যবোধ আর স্থানীয় ঐতিহ্যের অবক্ষয় – এই সব কিছু মিলিয়ে একটা নীরব সাংস্কৃতিক বদল ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত।
মূল নকশা- গৌরাঙ্গ বসাক | শাড়ি সৌজন্যে- শ্যামসূত্র
১৯৪৭ থেকে ১৯৭০-এর দশকের দিকে বাংলাদেশের টাঙ্গাইল অঞ্চল থেকে বহু তাঁতি পরিবার পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ করে শান্তিপুর, ফুলিয়ায় চলে আসেন। এঁরাই মূলত টাঙ্গাইল-জামদানি নকশার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সব সূক্ষ্ম নকশার ঘরানা নিয়ে এসেছিলেন এই সব অঞ্চলে। তাঁদের হাতেই বাংলার টাঙ্গাইল শাড়ির নতুন পরিচয় গড়ে ওঠা। একটা সময়ের পর মেশিন চালিত তাঁত ছড়িয়ে পড়ে। কাজের দ্রুততা বাড়ে, যার ফলে পাওয়ার লুমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হস্তচালিত তাঁতিদের জন্য বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। ২০১০-২০১৫ সালে পাওয়ার লুমের আধিপত্য সাংঘাতিক ভাবে বেড়ে যাবার ফলে হাতের তাঁত ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। ৭৫% অঞ্চলের তাঁতকর্মীরা এখন যন্ত্র চালিত লুমে কাজ করছেন। এই হ্যান্ডলুম থেকে পাওয়ার লুমের রূপান্তর আর তার ফলে নকশা, সুতো, মূল্যবোধ আর স্থানীয় ঐতিহ্যের অবক্ষয় – এই সব কিছু মিলিয়ে একটা নীরব সাংস্কৃতিক বদল ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত।

শাড়ি সৌজন্যে- শ্যামসূত্র
সেখানে পাওয়ার লুমের ক্ষেত্রে ‘আজ আমি এই নকশা একটু অন্যরকম করব’ – এই স্বাধীনতা নেই। সেই সুতো আবেগ বোঝে না, সে শুধু ডেটা ফলো করে; এটাই পাওয়ার লুম আর হ্যান্ডলুমের পার্থক্য।
হাতে বোনা তাঁত-এর নান্দনিক ও বৈচিত্রময় নকশা পাওয়ার লুমে পুরোপুরি ধরে রাখা সম্ভব নয়। ফলে টাঙ্গাইল শাড়ির যে ঐতিহ্যগত নকশা তা অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র এই অবক্ষয় নকশার ক্ষেত্রে নয়, শাড়ির গুণগত মানও আজ সংকটের মুখে। হাতে বোনা তাঁতের শাড়িতে সাধারণত খাঁটি সুতোয় নকশা তোলা হতো যা ছিল পরিবেশ বান্ধব। সেই জায়গায় এসেছে ‘বাম্পার’ নামে পলিয়েস্টার মেশানো সুতো এবং এই সুতোয় যে রং ব্যবহার হয় সেটা পুরোপুরি ক্যামিকেল রং, যার ফলে এই সুতোয় তৈরি শাড়ি ব্যবহার করলে তার থেকে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। একজন টেক্সটাইল ডিজাইনের ছাত্র হিসাবে যখন এই সব অবক্ষয় দেখি, সেটা আমার কাছেও এক উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। একটা সময় টাঙ্গাইল শাড়িতে চাটাই পাড়, আমবুটি, ভেলভেট পাড় দেখা যেত, আবার ওপার বাংলার তাঁতিরা ফুলিয়াতে যখন কাজ শুরু করলেন তখন তাঁরা শান্তিপুরি শৈলী ও ঢাকাই জামদানি শৈলীর সংমিশ্রণ ঘটালেন। সুতরাং এই জটিল নকশা ও ডিজাইনের সূক্ষ্মতা টাঙ্গাইল শাড়িকে অনন্য করে তুললো। ফুলিয়ার প্রবীণ তাঁতশিল্পী গৌরাঙ্গ বসাকের বয়ানে, “আমি ৩৫-৪০ বছর আগে ইঞ্চি পাড়ের একটা শাড়ি করেছিলাম। সেই শাড়ি এতটা সুন্দর হয়েছিলো যে যার কাছেই নিয়ে গিয়েছি, সকলেই কিনে নিয়েছেন।” এই যে একজন তাঁতশিল্পীর একটা ‘সামান্য’ ইঞ্চি পাড়ের শাড়ির সৌন্দর্যের আখ্যান তিনি বর্ণনা করলেন, তা থেকে বোঝা যায় একজন তাঁতি নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা-মনের রং সবটাই বুনে দেন সুতোয় সুতোয়।
শাড়ি সৌজন্যে- দ্য বেঙ্গল স্টোর
সেখানে পাওয়ার লুমের ক্ষেত্রে ‘আজ আমি এই নকশা একটু অন্যরকম করব’ – এই স্বাধীনতা নেই। সেই সুতো আবেগ বোঝে না, সে শুধু ডেটা ফলো করে; এটাই পাওয়ার লুম আর হ্যান্ডলুমের পার্থক্য। হ্যান্ডলুম থেকে পাওয়ার লুমের প্রবর্তন শুধুই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে সংস্কৃতি ও মানুষের নিজস্ব পরিচয় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তাঁতে বোনা মানে সেটা শুধু কাপড় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটা গ্রামীন সমাজ ব্যাবস্থা, একটা অঞ্চল ভিত্তিক শিল্প-জীবনের ছন্দ, একটা সংস্কৃতি। সুতরাং এই পরিবর্তনের ফলে আমরা একটা সাংস্কৃতিক বিছিন্নতার দিকে এগিয়ে চলেছি। এখন অনেকেই জানেনই না একটি জামদানি বা টাঙ্গাইল শাড়ির নকশার পেছনে কত ইতিহাস জড়িয়ে থাকত। পাওয়ার লুম আসার পর অনেকেই নিজেদের পেশা বদল করছেন। তাঁদের সন্তানদের আর এই কাজ শেখাতে উদ্যোগ নিচ্ছেন না। ফলে শত শত বছরের অভিজ্ঞতা সঠিক ডক্যুমেন্টশনের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।
আবার ফিরে আসি ফুলিয়ার প্রবীণ তাঁতশিল্পী গৌরাঙ্গ বসাকের কথায়, যিনি বিগত ৩০-৩২ বছর আগে থেকে একই ধরনের ভেলভেট পাড় বুনে চলেছেন। এই ভেলভেট পাড়ের মসৃণতা ও সূক্ষ্মতা আর হয়তো তিনি বেশিদিন তৈরি করতে পারবেন না। ফলে এটা এখন বিলুপ্তির পথে চলে গেল। পাওয়ার লুমে বোনা, হ্যান্ডলুমের নকশা কপি করে দ্রুত ও সস্তায় তৈরি করছে কাপড়। এতে আসল নকশার পেছনের গল্প, ঐতিহ্য ও আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের তাঁতিরা অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত হবার ফলে হ্যান্ডলুমের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। শহরের একটি ব্র্যান্ড ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ (The Bengal Store) বিগত কয়েক বছর ধরে নতুনভাবে চেষ্টা করে চলেছে হাতে বোনা কাপড়ের ঐতিহ্য বজায় রাখতে।
পাওয়ার লুমে বোনা, হ্যান্ডলুমের নকশা কপি করে দ্রুত ও সস্তায় তৈরি করছে কাপড়। এতে আসল নকশার পেছনের গল্প, ঐতিহ্য ও আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের তাঁতিরা অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত হবার ফলে হ্যান্ডলুমের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
শাড়ি সৌজন্যে- দ্য বেঙ্গল স্টোর
আমি আজ থেকে চার বছর আগে যখন কাজ শুরু করি, তখন আমাকেও নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ বর্তমান সময়ে ভালো হ্যান্ডলুমের শাড়ি বোনা তাঁতির সংখ্যা কমে আসছে, ফলে একটু ভারি নকশা বা ভালো কাপড় দুর্মূল্য হয়ে উঠছে। একজন ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে পুরোনো দিনের নকশা ও শাড়ির কোয়ালিটি আবার ফিরিয়ে আনা দরকার, যার ফলে পুরোনোর সঙ্গে নতুনের এক যোগসূত্র তৈরি হবে। এর পাশাপাশি আমরা যদি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হ্যান্ডলুম শিক্ষা চালু করতে পারি যাতে হ্যান্ডলুমের ইতিহাস, নকশা ও কারিগরি বিষয়ে শিক্ষাপাঠের পর তরুণ প্রজন্ম নতুন কিছু করতে আগ্রহী হতে পারে। একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে, সংরক্ষণ মানে শুধু অতীতকে আঁকড়ে ধরা নয় বরং নতুন প্রজন্মের কাছে সেটাকে সমানভাবে উপযোগী করে তোলা।

