
বাংলার লক্ষ্মীমন্ত মেয়েরা
“লক্ষ্মী অংশে নারীজাতি করিয়া সৃজন/ পাঠায়েছি মর্ত্যধামে সুখের কারণ।।”
কোজাগরী পূর্ণিমা-র সন্ধ্যাতেই হোক বা প্রতি বৃহস্পতিবার, ঘরে ঘরে উচ্চারিত লক্ষ্মীর পাঁচালির এই সুরের অনুরণন শোনা যায় বাংলার ঘরে ঘরে। কিন্তু কে এই দেবী লক্ষ্মী? তিনি কি শুধুই মূর্তি বা পটে আঁকা সুখের দেবী নাকি তিনি আজকের সেই মেয়েরা যারা তথাকথিত ‘লক্ষ্মী মেয়ে’-র ছক ভেঙে কোনো না কোনো ভাবে ভালো রাখছেন নিজেকে, নিজের চারপাশকে। এঁদের মধ্যে কেউ দু-চাকায় বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখেন, কেউ আবার ভালোবাসাকে সম্বল করে নিজের পরিবারের পাশাপাশি থিয়েটারকে করে তুলেছেন তাঁর দ্বিতীয় ঘর, কেউ পরিবার এবং সমাজের উপেক্ষাকে পাল্টা উপেক্ষা করে এক বিশেষভাবে সক্ষম শিশুর মা থেকে হয়ে উঠেছেন এই ধরনের অনেক শিশুর মা যার কোলে নিশ্চিন্ত আশ্রয় পায় সমাজের চোখে উপেক্ষিত ছোটো ছোটো কুঁড়িরা, আবার কেউ ভাগ্যের বিড়ম্বনাকে জয় করে তৈরি করেছেন নিজস্ব গয়নার ব্র্যান্ড ‘মেরাকি’ পাশাপাশি তিনি এক শিশুর মা আবার পরিবারের ভরসাও বটে। তাঁরা সকলেই ছকভাঙা লক্ষ্মী।

লিপিকা বিশ্বাস
লক্ষ্মী নাকি বেশ চঞ্চলা। সেইরকমই চঞ্চলা লিপিকা বিশ্বাস। পেশায় রেলকর্মী লিপিকার নেশা দুঃসাহসিক অভিযান। সেই নেশাই একসময় তাঁকে টেনে নিয়ে যেত পর্বত অভিযানে। আর এখন দু-চাকায় ভর করে বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর তিনি। বঙ্গদর্শন.কম-কে লিপিকা জানান, “পর্বত আরোহী হিসাবেই আমার অ্যাডভেঞ্চারের জগতে আসা। তাই সাইক্লিস্ট হওয়ার আগে আমি পর্বত আরোহী, যদিও ছোটোবেলা থেকেই সাইকেল চালাতাম। ২০০৩ সালে আমি সাইকেল চালিয়ে অযোধ্যা পাহাড়ে যাই, সেটাই আমার প্রথম সাইকেল নিয়ে লং ডিসট্যান্সে পাড়ি। বিভিন্ন সময়ে হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে অভিযানে গেছি, তবে ২০১৪ এবং ২০১৫ পরপর দু-বছর আমি এভারেস্ট অভিযানে যাই। ২০১৪ সালে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং ২০১৫ সালে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে এভারেস্ট অভিযান সফল হয়নি। এরপর আমার মনে হয় একটু অন্যভাবে ভাবি। অবশ্য ইতিমধ্যেই সাইকেল নিয়ে দূরদূরান্তরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল, ২০১৪ সালেই বাংলাদেশের কক্সবাজার পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে গেছি। তবে এতদিন গ্রুপে গেছি, তাই এবার ভাবলাম একা পথ চলে দেখি। কারণ একা পথ চলা আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এই সময়ই আমার বন্ধু ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে যাওয়ার কথা বলে। সেখানেই ভাবনা শুরু, এরপর ২০১৮ সালে জার্মানির ফ্র্যাঙ্কফুট থেকে আমার চলা শুরু হয়। প্রথমবারেই জার্মানি, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও আইসল্যান্ড এই ছয়টি দেশ আমি ভ্রমণ করি। এরপরেও আমি আবার সাইকেল নিয়ে একা পাড়ি দিয়েছি বিদেশে এবং অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, বলতে পারি পথই আমার পাঠশালা। এরপরেও আবার এইভাবে বেরিয়ে পড়ব”। এইভাবে বিশ্বের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন গড়ছেন লিপিকা বিশ্বাস।

সীমা মুখোপাধ্যায়
আসলে ঘর ভালোবাসার আস্তানা। আর ভালোবাসাতেই লক্ষ্মীর বাস। ভালোবেসেই লোকশিক্ষার মাধ্যম থিয়েটারকে আপন করে নিয়েছেন রংরূপ নাট্যদল-এর কর্ণধার সীমা মুখোপাধ্যায়। পেশাগতভাবে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কর্মী সীমা মুখোপাধ্যায় নেশার টানে ছেড়েছিলেন পেশা। বঙ্গদর্শন.কম-কে সীমা জানান, “থিয়েটারের প্রতি আমার ভালোবাসাটা ছোটো থেকেই, চাকরি করে থিয়েটার করার জন্য ততটাও সময় পাচ্ছিলাম না বলে চাকরি ছেড়ে দিই। এবং সেজন্য রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশোনাও করি। কিন্তু থিয়েটারে আর্থিক লাভ ততটাও হয় না, বরং থিয়েটারের জন্য আমাদের টাকা-পয়সা খরচ করতে হয়েছে। তবু থিয়েটার আমাদের চলতে শেখায় তাই নিজের পরিবারের পাশাপাশি থিয়েটারও আমার এক পরিবার”। তিনি আরও জানালেন সরকারি তরফে এখন কিছুটা সাহায্য পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। তিনি আরও বলেন অন্তরের ভালোবাসা থাকলে, ভালোবেসে কিছু করলে ঘরে এবং বাইরে একসঙ্গে সামলানো অবশ্যই সম্ভব। আর ভালোবাসার টানেই তিনি আজীবন থিয়েটারের সঙ্গী।

অমৃতা মুখোপাধ্যায়
শুধুমাত্র ঘরকন্নার ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে যেকোনো মেয়েই হয়ে উঠতে পারে আর্থিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও এক সার্থক মা তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন গোবরডাঙার অমৃতা মুখোপাধ্যায়। ২০১২ সালে অমৃতার কোলে আসে তার সন্তান বুরুন। কিন্তু বিশেষভাবে সক্ষম এক শিশুর জন্ম দেওয়ার পরে অমৃতা বুঝতে পারেন পরিবার ও সমাজ কতটা কঠিন তাঁর জন্য। তবু হার না মানা এক লড়াকু মায়ের জীবন শুরু হয় তার। সংসার ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের ছেলে এবং এরকম আরও ডাউন সিনড্রোম শিশুদের জন্য তৈরি করেছেন ‘জাগরী’। যেখানে এই শিশুরা পর্যাপ্ত শিক্ষা পায়, আর তাদের বাবা মায়েদেরও উপেক্ষার শিকার না হতে হয়। বঙ্গদর্শন.কম-কে টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে অমৃতা জানান, “একটা সময় সত্যিই কঠিন ছিল, এখন ওই সময় থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছি। এখন আমরা নতুন করে ভাবছি, নতুন করে সাজাচ্ছি জাগরীকে। অনেক নতুন পরিকল্পনা আছে, জাগরীর অভিভাবকরা এখন এগিয়ে আসছেন। তাই এখন আর পিছন ফিরে তাকাতে চাই না। জাগরী একসময় আমার কবিতার স্কুল ছিল, আজ বুরুনের জন্যই আজ জাগরী ডাউন সিনড্রোম শিশুদের স্কুল, আর বর্তমানে আমার ধ্যানজ্ঞান এই জাগরী। পাশাপাশি আনন্দী কবিতাঘর বলে নতুন একটি কবিতার স্কুল শুরু করেছি”।

ঈশানী কুণ্ডু
লড়াই যে শুধু সমাজ বা পরিবারের সঙ্গে তা সবসময় হয় না, বিড়ম্বিত ভাগ্যের সঙ্গে লড়ে পরিবারের সহায় হয়ে উঠেছেন আরেক লক্ষ্মী ঈশানী কুণ্ডু। পরিবারের ওপর একের পর এক বিপর্যয় সর্বোপরি দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনসঙ্গীর মৃত্যু যখন তাকে চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তখন থেকেই শুরু হয় তার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। সংসারের আর্থিক প্রয়োজনে নিজের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ঈশানী তৈরি করেছেন নিজস্ব রুপোর গয়নার ব্র্যান্ড ‘মেরাকি’। বঙ্গদর্শনের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানালেন, “নাচ করতে ভালোবাসি, নাচকে সম্বল করেই নিজের খরচটুকু চালানোর মতো রোজগার বরাবরই করতাম। তবে আমার স্বামীর মৃত্যুর পর শুধু ওই রোজগারে যখন সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে তখন নতুন কিছু করার কথা ভাবি। তখন থেকেই আমার ডিজাইন করার কাজ শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে মার্কেট সার্ভে শুরু করি। এইভাবে কলকাতা থেকে আমার ডিজাইনের কাছাকাছি যেসব ডিজাইন পেয়েছি সেরকম গয়না কিনে আমার ব্যবসা শুরু করি। প্রাথমিক ভাবে আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীরা বেশ পছন্দ করেন আমার গয়না গুলো। তারপর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনলাইনে প্রচুর অর্ডার পেতে থাকি। এইভাবেই সৃষ্টি হয় আমার নিজস্ব রূপোর গয়নার ব্র্যান্ড মেরাকি”। ঈশানীর কাজ আজ প্রশংসিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
সৎ লক্ষ্যে স্থির থেকে যাঁরা প্রতিনিয়ত লড়ে চলেন নিজের জন্য, সমাজের জন্য তাঁরা সকলেই আজকের লক্ষ্মী। লক্ষ্মীর পাঁচালিতে উল্লিখিত লক্ষ্মী অংশে সৃজিত নারীরা আজ সত্যিই অনেকের সুখের কারণ, অনেকের প্রেরণা। আগামীর কন্যা সন্তানেরাও জন্ম নিক এক সমৃদ্ধ সমাজে, সকলের মন ভরে উঠুক ইতিবাচক সম্পদে।
