
সোনাপিসি, বীণাপানি মণ্ডল, সীমাদেবী অজস্ৰ মুখ, অজস্র জীবন
সাতসকালের ট্রেনে শহরে ঢুকছেন একদল শ্রমজীবি মানুষ
ফাঁকা মাথায় কয়েক গোছা শনের মতো সাদা চুল। তোবড়ানো গাল। ফোকলা দাঁত। কথা বললেই বেরিয়ে আসে গোলাপী মাড়ি।
ফি সপ্তাহে সকাল সকাল বাড়ির উঠোনে এসে হাঁক দিত ‘কার্ড দাও গো’…
ঘিঞ্জি হাওড়ার আধা ঘিঞ্জি এক পাড়া। ঢুকতে বেরতে কারখানার অলি গলি। সে পথ দিয়েই টরটরিয়ে হেঁটে যেত সোনামণি পণ্ডিত। সে নাম যদিও হারিয়েছিল বহুযুগ আগেই। সে পাড়ার আট থেকে আশির মুখে সে শুধু ‘সোনাপিসি’। কেউ বলত ‘সোনাদি’। মাঝে মাঝে নিজের কাছেই অচেনা ঠেকত কী ছিল তার পুরো নাম।
আশির কোঠায় বয়স। থুরথুরে চেহারা দেখলে ভয় হয়। কাঁপা হাতে পলিথিনের ব্যারেল। আর ব্যাগে রেশন কার্ড। সপ্তাহে যেদিন যেদিন ‘ক্যারাসিন’ (কেরোসিন তেল) দেয় দোকানে সেই সেই দিনগুলো সোনাপিসির কাজের দিন। সকাল সকাল পাড়ায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে কার্ড নিয়ে বেলা দশটা বাজার আগেই পৌঁছে যেতে হয় দোকানে। সেখান থেকে তেল নিয়ে আবার যার যার জিনিস তার তার ঘরে পৌঁছে দেওয়া। প্রাথমিক শিক্ষার তেমন সুযোগ ঘটেনি, তাই নাম পড়তে দোকানিই ভরসা। তবে পয়সা আর হিসেব বুঝে নিতে জানেন। এটাই তাঁর পেশার তাগিদ। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বিরামহীন। খালি পা। কখনও সখনও চটি। তবে চটি পরাও ছিল তার কাছে যেন ঝামেলার কাজ। অভ্যাস নেই কতদিন। খালি যেন পা থেকে খুলে যায়… সকাল থেকে দুপুর এভাবেই-নিত্যদিন।
তেল তোলার পয়সা বুঝে নিয়ে হলদে হয়ে যাওয়া ধুতির খুঁটে বেঁধে নিত ‘বুড়ি’। বাড়তি চাহিদা কিছু নেই। গরমের দিনে জল-বাতাসা দিলে মহাখুশি।
সোনাপিসি কিশোরী বিধবা। নিজের বলতে শুধু ভাইপো। এক মজা পুকুরের পাড়ে কয়েক ঘর বাসিন্দার মধ্যে সেও একজন। মেটে ঘর, টালির চাল, চাল দিয়ে রোদ-বৃষ্টি-হিম ঝরে। একবেলা স্বপাকে রান্না অন্যবেলা মুড়ি বাতাসা এই নিয়ে তার জীবন। তবে সে একা নয়, বান্ধবীরা আছে। তারই মতো সম পেশার মানুষ। পাড়া ঘুরে ঘুরে রেশন-তেল-বাজার তোলে তারা। হকের পয়সা বুঝে নেয়। বয়স লাগা পা, হাঁটুর ব্যথা, বাতের বেদনায় থমকে থমকে হেঁটেও তারা রোজগারে স্বাধীন। হোক না একবেলার আহার, মুড়ি বাতাসার সামর্থ্য তবু তো নিজের উপার্জন!

মাছ কেটে/বেছে দেওয়াই যাঁদের পেশা
দৃশ্যগুলো বদলে যায় কখনও শহুরে পাড়ার কেরোসিন তেলের জারে, কখনও জাংশন ভোরের বাজারে শাকের বোঝায়, কখনও বা মেঠো পথে পাতা কুড়ানির বস্তায়। ঘাম-রক্তের কলের গান, দাঁড়িপাল্লার ভর ওজন আর প্রাত্যহিকের অজস্ৰ প্রয়োজনে। পুরনো শিকলের চিহ্ন সারা অঙ্গে, আঙুলে টিপ ছাপ সঙ্গী তবু খিদে বড়ো দায়। সেই দায়েই জীবিকার পথে।
ওঁরা বলেন, ‘যার ভাত নেই, তার কেউ নেই’। নিজের ভাত নিজে যে জোটায় সেই আসল স্বাধীন। নিজের মত, নিজের পথ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অধিকার, ক্ষমতা থাকবে কিনা ঠিক করে দেয় ‘স্বাধীন ভাত’।
ভোরের ট্রেন ছুটে চলে। ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দেন ওঁরাও। রোদ-জল-বৃষ্টি হারাতে পারে না। বড় স্টেশনে ‘ভ্যানগাড়ি’ বলা থাকে। কখনও কখনও ‘গাড়ি মিস’ হলে মালের গাড়ি চড়ে টাইমে বাজারে আসা। তারপর আর ফুরসতের সময় মেলে না। দুপুর হলে বারোটার পর চা-রুটি-ব্রেকফাস্ট। মধ্য চল্লিশের বীণাপানি মন্ডলের নিত্যকার জীবন। মাছের আঁশ ছাড়াতে ছাড়াতে হাতের আঙুল ভ্যাপসা। নখের কোণে কোণে ব্যথা। সারাদিন ভর দিয়ে বসে থেকে পায়ের পাতা ফুলে ঢোল। ঘুরে ফিরে আর নড়ার ক্ষমতা থাকে না। চাড্ডি ভাত খেয়ে আটটার মধ্যে ঘুম, আবার সেই আঁধার থাকতে ওঠা। মাঝখানে শখের রান্না আর টিভি সিরিয়াল আছে। এই টিভি বীণাপানির নিজের টাকায় কেনা। চার ছেলে, নাতি-বৌমায় ভরা সংসার । স্বামীও আছে। কাঁচা বয়সে দেখাশোনার বিয়ে। কিন্তু মরদ মানুষ নেশার টানে সংসার দেখে না। ভাত জোটে না ছেলেদের মুখে। অগত্যা একদিন ভোরের ট্রেনে শহর পাড়ি।
এখন দিন বদলেছে। ছেলেরা সমর্থ। কিন্তু ইচ্ছাপুর বাজারের এক প্রান্তে তেরো সখীর দরমা বেড়ার ঘরটিকে ছাড়তে পারেনি সে। এই ঘরটাই তার ৬-১টার কর্মক্ষেত্র।
রাঁচির সেল সিটিতে ঠিকা কাজ করেন সীমাদেবী। স্বামী আছে। সংসারের বড়ো দায় সীমার কাঁধেই। হাসিমুখে ঝাড়ুপৌঁছা লাগান। বাবু বাড়িতে নতুন কাজ ঘাড়ে চাপালেও মুখের হাসি তেমনই থাকে। কিন্তু তার কাজের শর্ত একটাই—দরকার হলে শৌচাগার ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে। সেল সিটি চ্ত্বরের বাবু-বিবিরা বেশিরভাগ সে অনুমতি দেন না। কারণ সীমা নীচু জাত। তারওপর ‘কাজের লোকরা খুব নোংরা হয়’ যে! সে সব বাড়িতে কাজ নেন না সীমাদেবী। ঘরে অভাব যথেষ্ট, তবু তিনি কাজ করেন নিজের শর্তে।
নীচু জাত আর ঠিকে কাজের লোক বলে শৌচাগার ব্যবহারে অনুমতি নেই। এক সঙ্গে বসা যায় না, টেবিল চেয়ারে বসতে দেওয়া যায় না, আরও কত কত ‘না’ শুধু ঘটনার সংখ্যাটা নেহাত কম না।

সীমাদেবী
সোনাপিসি, বীণাপানি মণ্ডল, সীমাদেবী অজস্ৰ মুখ, অজস্র জীবন। তাঁরাই সংখ্যা গরিষ্ঠ। চকচক মল, আউটলেটের ঝকঝকে ‘নারী দিবস’ সেলিব্রেশনের খবর ওঁরা রাখেন না। সে সব খবর রাখার যে খুব প্রয়োজন আছে তেমনটাও মনে করেন না। কিন্তু জীবনে যদি ‘লো ফিল’ করেন একটা দিন বা কয়েক ঘণ্টা ওঁদের সঙ্গে কাটান, শিখে যাবেন আত্ম বিশ্বাস আর পেশাদারিত্ব-এর সংজ্ঞা।
পৃথিবীর চাকা ঘোরে খিদের টানে। বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড়ো কারণ বোধহয় খিদে। ওঁরা বলেন, ‘যার ভাত নেই, তার কেউ নেই’। নিজের ভাত নিজে যে জোটায় সেই আসল স্বাধীন। নিজের মত, নিজের পথ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অধিকার, ক্ষমতা থাকবে কিনা ঠিক করে দেয় ‘স্বাধীন ভাত’। দু’বেলা দু’মুঠোর সংস্থান। তার জন্যই যত যুদ্ধ দিনভোর।

‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি নারী দিবস’-এর ওপর একটা লেখা চাই, ওয়েব-পত্রিকা দপ্তর থেকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন কার্যনির্বাহী সম্পাদিকা। আমিও তো শ্রমজীবি, কী আমার পেশাপ্রবেশের অনুপ্রেরণা। আমার মতো একজন সদা শিক্ষানবীশ কলমজীবির অনুপ্রেরণা কী হতে পারে কখনও ভেবে দেখিনি।
বসন্ত রাতের ফাঁকা রাস্তায় বেশ খানিকটা হাতড়েও কোনও উত্তর পাইনি সেভাবে। তবে নিজের দায়দায়িত্ব নিজেকে নিতে হবে, নিজের বোঝার ভার নিজে বহন করার মতো কাঁধে শক্তি চাই- এ ভাবনা অক্সিজেনের মতোই মন মস্তিষ্কে এমন সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে এসেছিল যে দ্বিতীয় চিন্তা জানাও ছিল না কোনওদিন। নিজেকে কখনও ‘মেয়ে মানুষ’ বলে ভাবতেও শিখিনি কোনওদিন। নামের আগে ‘মেয়ে’ বসুক বা ‘পুরুষ’ মানুষই তো। লিঙ্গ চিহ্ন নয়, আমি শুধুই একজন মানুষ, ঘর, সমাজ সংসারে এই হোক আমার একমাত্র পরিচয়। তবে আজকাল মনে হয় নিজের অস্ত্র-শস্ত্র-বর্ম আর স্বাধীন ভাবনায় টিকে থাকার দায়টাই সব চেয়ে বড়ো ‘Inspiration’, নিজের ভাত কাপড়ের দায় দায়িত্ব নিজে নিতে হবে, দ্বিতীয় ভাবনা মহাপাপ।
