মালিক গরিব হলেও এ দোকানের চা আমিরী

টাকা দিতে না পারলেও ‘গরিবের দোকানের আমিরী চা’ মিলবেই

বর্ধমানের এদিকটায় দিনে প্রায় হাজারদশেক মানুষ আসে বোধহয়। এদিকে আমাদের মেস। সামনেই বর্ধমান স্টেশন। শপিং মল। মাল্টিপ্লেক্স। অ্যাপার্টমেন্ট। ব্যাঙ্ক, এটিএম। বিরিয়ানির দোকান। কলেজ। কোচিং সেন্টার। বর্ধমান হাসপাতাল। বর্ধমানের কেন্দ্রীয় জেল (সংশোধনাগার) তো একেবারে দোরগোড়ায়। সকালে ঘুম ভাঙলে বাইরে বেরোই। বাইরে প্যাঁ-পোঁ শব্দ। টোটো, বাইক, রিকশা, সাইকেল, গাড়িতে ধুন্ধুমার কান্ড বেঁধে যায়। ঘুম ছেড়ে যায়। চা খেতে যাই। চায়ের দোকান এক্কেবারে মোড়ের মাথায়। দোকানের নাম ‘গরিবের দোকানে আমিরী চা’! দোকানে সাইনবোর্ড লাগানো আছে। তাতে গরিবদার দু’টো ছবি। এক দিকে গরিবদা সাদা স্যুট পরে, আরেকদিকে রোজকার জামাপ্যান্ট পরে। মানে, একদিকে আমীর তো আরেকদিকে গরিব! আজব লাগছে? ব্যাপারটা নিয্যস সত্যি।

গরিবদার বক্তব্য, মালিক গরিব হতে পারে, খদ্দেরও গরিব হতে পারে তবে চা হতে হবে আমিরী! জেলখানা মোড়ের এদিকে কোনও ঠিকানায় আসতে হলে এই দোকানই একমাত্র নির্ভরযোগ্য ল্যান্ডমার্ক। বর্ধমানে থাকে, চা-খোর, অথচ গরিবের দোকানে চা খায়নি এমন মানুষ বিরল। গরিবদার দোকান খোলে ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ। কয়লার উনোন থেকে ধোঁয়া ওড়ে। দোকানে গান বাজে। মহম্মদ রফি। পাতলা হাওয়া বয়। বটের হাওয়া। এলাকার একমাত্র বট। দিনের মাঝখানে যদি কেউ এখানে আসে, তাহলে বটগাছটা দেখতেই পাবে না। চারপাশে তখন হই-হল্লা, কেনাকাটা, ভিড়। ‘গরিবের দোকানে আমিরী চা’ সে সময়টায় পাওয়া যায় না। বন্ধ থাকে। গরিবদার দোকান বন্ধ থাকলে বটগাছটারও খোঁজ থাকেনা।

সকালে ঘুম ভেঙে খালি পেটে চা খেতে হ’লে দোকানে গিয়ে একটা বাটার টোস্ট বলতে হবে। তারপর চা। তারপর একটা সিগারেট। সব মিলিয়ে ১৮ টাকা হবে। বাটার টোস্ট খেতে না চাইলে অসুবিধা নেই, এটিএমের সামনে একজন ছাতুর সরবত বিক্রি করে, সেখানে যেতে হবে। ১০ টাকার গ্লাস আর ১৫ টাকার গ্লাস। সেখান থেকে এসে চা। একদম সকালে যারা বর্ধমানের কাছাকাছি গ্রামগুলো থেকে আসে, প্রধানত, লেবারের কাজ করতে, তারাও এখানে চা খায়। ওদের খাতা করা আছে। ওরা সেঁকা পাউরুটি দিয়ে চা খায়। ভবঘুরে, ভিখারিরা আসে, দোকান থেকে চা পায়। কেউ কেউ বাপুজি কেক, লম্বুও নেয়। গরিবদা তখন ছাতুওয়ালার পাশের কল থেকে জল বয়ে আনে। দোকানের পার্মানেন্ট কর্মচারী একজনই। কে বাকিতে খায়, কে নগদে, কার কত বাকি, কে কোন সিগারেট খায়, কে ছোট চা, কে বড়ো, সব ওর মুখস্থ। গরিবদাকে মাঝেমধ্যে ওকে ভুল ধরিয়ে দিতে হয়, এই যা।

গতবার যখন বন্যা হল, আমরা সাহায্য সংগ্রহ করছিলাম। প্রথম টাকা দিয়েছিল গরিবদাই। আমাদের পত্র-পত্রিকা বেরোলে কেউ পড়ুক না পড়ুক, গরিবদা পড়বেই। মতামতও দেবে। দোকানে রেখে দেবে, সকালে খদ্দেররা এলে তাদের পড়তে দেবে। রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্ট হলে, হাতাহাতি লাগলে, এলাকায় ইফতার পার্টি হলে সবেতে কেউ থাকুক না থাকুক গরিবদা আছেই। কারও কাছে টাকা থাক বা না থাক, ‘গরিবের দোকানের আমিরী চা’ তার জন্য আছে। টাকা না থাকার জন্য, চা না পেয়ে ফিরে যেতে হবে এমন ঘটনা ঘটেনা।

বাঙালি চা খেতে শিখেছিল ইংরেজদের থেকে। শুনেছি, একসময় ঠনঠনিয়া, বৌবাজারের রাস্তার মোড়ে ফ্রিতে চা খাওয়ানো হত। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১ পয়সার পুরিয়াও দিয়ে দেওয়া হত। কোম্পানির নৌকো নদীপথে গ্রামবাংলার ভেতরে ভেতরেও চায়ের প্রচার করেছে। রেলিশ করে বাবুয়ানা ফলানোর সেই চায়ের অভ্যেস আজ তেমন নেই। গরিবরাও তাই চা খায় দেদার। সেই চায়ের স্বাদ, গন্ধ অবশ্য আলাদা। তাতে দুধ মেশে, কখনও আদা। এবং গরিবের চায়ে কিন্তু অন্তরের গরিবী নেই। ‘গরিবের দোকানে আমিরী চা’য়ে একটা চা বলা রইল। এদিকে এলে না খেয়ে যাবেন না!

Developed by DXDasia