হুগলির ত্রিবেণীতে জাফর খান গাজি নামাঙ্কিত বাংলার প্রথম মসজিদ

মসজিদের দেওয়ালে দেওয়ালে রয়েছে সংস্কৃত শ্লোক

বরের কাগজ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া, ধর্ম নিয়ে কথা উঠলেই বাতাস সরগরম। কখনও মারপিট, দাঙ্গা আবার কখনও বা বিভেদের মাঝে মহামিলনের কথা সবকিছুই রয়েছে এই বাংলায়। আধুনিক সময়ে মানুষ নতুন করে ভাবতে শিখেছে। আজ হরদম বিয়ে হচ্ছে হিন্দু মুসলিম পরিবারের মধ্যে। ফ্ল্যাট বাড়ির যুগে প্রতিবেশী হিসেবেও ধর্ম নিয়ে ভাবেন না কেউই। স্কুল কলেজে আজ একই বেঞ্চে বসে সময় কাটায় সুমন, রফিকরা। এ তো গেল আজকের সময়ের কথা, কিন্তু এখন যা নিয়ে কথা বলব তা মোটেই একালের গল্প নয়।

ইতিহাস বলছে, এটাই বাংলার প্রাচীনতম মসজিদ (Oldest Mosque)। স্থাপত্যরীতিতে স্বতন্ত্র। আজও মসজিদের গায়ে টেরাকোটার কারুকাজ।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকের কথা, মুঘল সম্রাটরা তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। ত্রিবেণীর হিন্দু রাজার রাজত্বে এক মুসলমান প্রজার বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কুরবানি দেওয়া হয়েছে একটি গরু। ব্যাস, আর রক্ষে নেই, হিন্দু রাজা শুনেই দণ্ড দিলেন প্রজাকে। প্রজাটিও বাধ্য হয়ে নালিশ জানালেন খোদ দিল্লির বাদশাহের কাছে।

দিল্লি-বাংলা কোঁদল, বড় রাজা-ছোট রাজার রেষারেষি সে যুগেও ছিল। শোনা মাত্রই বাদশাহ বিরাট সেনাবাহিনী পাঠালেন বদলা নিতে। শোনা যায়, আজকের হুগলি জেলার ত্রিবেণীর অদূরেই হয়েছিল সেই যুদ্ধ। হিন্দু রাজা বনাম মুসলিম সেনানায়ক জাফর খান গাজি (Zafar Khan Gaji) । যুদ্ধে অবশ্য হার হয়েছিল হিন্দুদের। বিজয়ের পর শাসকের পদে বসেছিলেন জাফর খান গাজিই।

একাল কিংবা সেকাল বলে নয়, শাসক মাত্রই চেয়েছেন সিংহাসন জয়ের গৌরবকে বেশ জাঁকজমক সহকারে মানুষের মনে গেঁথে দিতে। কেউ বানিয়েছেন বিশালকায় মূর্তি, কেউ আকাশ-ছোঁয়া স্তম্ভ, মিনার, কেউ বা ধর্মস্থান। জাফর খানও তার ব্যাতিক্রম নন। আজও হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে জাফর খান গাজির নামাঙ্কিত সেই মসজিদ। মসজিদের সামনে বসানো আর্কিয়োলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার বোর্ড-এর দিকে তাকালেই জানা যাবে, সে দিনের যুদ্ধজয়ী মুসলমান সেনাপতির বানানো মসজিদটি তৈরি হয়েছিল ১২৯৮ সালে। আর সংলগ্ন দরগা, যেখানে আজও জাফর খান এবং তাঁর ছেলে-নাতি এমনকী পুত্রবধূরও কবর দেখতে লোকে ভিড় করে, তা গড়ে উঠেছিল ১৩১৫ সালে।

ইতিহাস বলছে, এটাই বাংলার প্রাচীনতম মসজিদ (Oldest Mosque)। স্থাপত্যরীতিতে স্বতন্ত্র। আজও মসজিদের গায়ে টেরাকোটার কারুকাজ। মসজিদের কাছেই দরগা, যেখানে জাফর খান গাজির সমাধি, তার দরজার গায়ে মঙ্গলঘটের মোটিফ। কোথাও আঁকা কল্পলতা, কোথাও তারা, ফুল, প্রদীপ। আরবিতে লেখা পাথরফলক যেমন আছে, তেমনই খোদিত আছে সংস্কৃত লিপিও। আছে দশাবতারের ছবি, দেবদেবীর মুখ। গোটা মসজিদটাই ইট এবং পাথরের অদ্ভুত কায়দায় বানানো।

দরগায় জাফর ছাড়াও বেশ কয়েকটি সমাধি রয়েছে, যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাফরের তৃতীয় পুত্র বর খাঁ গাজী ও তাঁর হিন্দু স্ত্রী, হুগলির রাজকন্যার সমাধি।

এ তো আজকের কথা নয়। প্রায় ৭২৪ বছরের পুরনো কোনো মসজিদের দেওয়ালে হিন্দু পুরাণের গাঁথা, সংস্কৃত শ্লোক, ভাবতে গেলেও থমকাতে হয় খানিক। শুনলে আরও অবাক হবেন, যে শাসক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ বানালেন, তিনিই আবার গঙ্গাপূজারী। ঐতিহাসিকরা বলেন, যেখানে জাফর খান মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে নাকি আগে একটি হিন্দু মন্দির ছিল। সেই মন্দির ধ্বংস করেই তার উপাদান দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করেন জাফর খান। মসজিদ সংলগ্ন দরগায় রয়েছে বিষ্ণুমূর্তি, বুদ্ধমূর্তি ও জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মূর্তিও। ধ্বংসের হাত ধরে হলেও, ভারতবর্ষের চারটি প্রধান ধর্ম মিলেমিশে আছে এখানে।

যিনি গঙ্গাস্তব লেখেন বা পাঠ করেন, তিনিই মসজিদও বানান, শুনতে অবাক লাগলেও সেই জিনিসই সম্ভব হয়েছিল সেকালে হুগলির ত্রিবেণীতে। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের উল্লেখযোগ্য জনপদ ত্রিবেণী (Tribeni)। ভাগীরথী-যমুনা-সরস্বতী – এই তিন নদীর সঙ্গমেই এই জায়গার নাম হয়েছে ত্রিবেণী। গঙ্গার শীতল হাওয়া, নদীতীরের মনোরম পরিবেশ এসবই যেন বিবশ করে দিয়েছিল ইমানদার মুসলমান জাফর খানকেও।

‘কেমব্রিজ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে স্পষ্টই লেখা – ‘Curiously enough, it is not at Gaur, but at Tribeni in the Hughli District, that the oldest remains of Muslim buildings have survived. These are the tomb and mosque of Zafar Khan Ghazi. The former is built largely out of the materials taken from a temple of Krishna, which formerly stood on the same spot but now so multilated as to have lost most of its architectural value.’

তবে এই ইতিহাস শুধু হিন্দুবিদ্বেষেরই নয়। মিলনেরও এক অদ্ভুত রসায়ন খুঁজে পাওয়া যায় জাফর খাঁ গাজীর জীবনে। এক হিন্দু রাজার সঙ্গে যুদ্ধে নাকি মারা যান তিনি। তবে ইতিহাস যেখানে তল পায় না, বিশ্বাস সেখানে আঁচল পেতে দেয়। ৭২৪ বছরের পুরনো মসজিদ এখনও বর্তমান। দরগায় জাফর ছাড়াও বেশ কয়েকটি সমাধি রয়েছে, যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাফরের তৃতীয় পুত্র বর খাঁ গাজী ও তাঁর হিন্দু স্ত্রী, হুগলির রাজকন্যার সমাধি। আজও স্থানীয় মুসলমানরা প্রার্থনা করেন এখানে, পথচলতি হিন্দুরাও মাথা ঠেকান দরগায়। আজও যেন ইতিহাসের দলিল হয়ে থেকে গেছে বাংলার প্রথম মসজিদ। বিভেদের মধ্যেও মিলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আমাদের। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কলমেও স্বীকৃতি পেয়েছে মুসলমান শাসকের সেই ইতিহাস –

‘পাজোয়ায় বন্দিয়া যাবো শুভি খাঁ পীরে।

দফর খাঁ গাজীরে বন্দো ত্রিবেণীর ধারে।।’

মানুষটা যুদ্ধ করতে এসেছিলেন, তবে সেখানেই ছেদ পড়েনি তাঁর গঙ্গাপাড়ের সফরে। আজও থেকে গেছেন ত্রিবেণীর মসজিদেই। ত্রিবেণীর গঙ্গা যেন আজও ঢেউ উঁচিয়ে প্রণাম জানাচ্ছে বাংলার প্রথম মসজিদ নির্মাতাকে। আর জাফর খান গাজী মসজিদের (Zafar Khan Gaji Masjid) ইতিহাসে মিলছে ধর্মীয় সম্প্রীতির স্বস্তিটুকু!

________________________________

তথ্যসূত্র:

“মসজিদের গায়ে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ও সংস্কৃত শ্লোক! বাংলার প্রাচীনতম মসজিদ এখনও প্রচার করে সম্প্রীতির মন্ত্র!”, সায়ন মিত্র

“বাংলার প্রাচীনতম মসজিদে আজও দেখা যায় সংস্কৃত লিপি”, প্রহর.ইন

Developed by DXDasia