“এই তো আমার দেশ, মুখটা খুললেই শেষ” – র‍্যাপের তালে ‘ট্যাংরা ব্লুজ’

র‍্যাপার সঞ্জয় মণ্ডলের জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘ট্যাংরা ব্লুজ’

র‍্যাপ ঘোরাফেরা করছে ঠোঁটের ডগায়। হাতে রয়েছে প্লাস্টিকের পারকাশন। কারোর হাতে ফেলে দেওয়া বোতল কিংবা বালতি, কেউ লাঠি দিয়ে স্টিলের থালা বাজাচ্ছে, কেউ আবার মুখেই আওয়াজ করছে। ঠোঁটে ঠোঁট তখন ছড়ার ব্যারিকেড। কখনও সহজ পাঠের, আবার কখনও নিজেদের লেখা। এরকমই সব ফাঁকা কৌটো, বোতল, এক মুঠো ছিপি, স্টিলের মোটা রড, উল্টোনো বড়ো বাঁকাচোরা থালার পাত্র অস্ত্র হয়ে উঠেছিল একদল বস্তিবাসীর। কখনও জলতরঙ্গ, কখনওবা জ্যাজ।

সঞ্জয় মণ্ডল অ্যান্ড গ্রুপ

কলকাতার ট্যাংরা এলাকার এক বিস্তীর্ণ বস্তি। আর পাঁচটা বস্তির মতোই। সেখানেও মানুষ বাঁচেন কাজের নেশায় আর স্বপ্ন দ্যাখেন হাজার গোলাপের বাগানে বসে। মনে মনে আসলে সবাই জিতে গেছেন। দিন আনা দিন খাওয়া জীবনের মধ্যে এক বস্তিবাসী সঞ্জয় মণ্ডলের বেঁচে থাকা পাল্টে গিয়েছিল। বস্তিরই কিছু বাচ্চাদের তুলে নিয়ে এসে তৈরি করেছিলেন এক ব্যান্ড। ব্যান্ডের বৈশিষ্ট্য ছিল র‍্যাপ করা। সেই র‍্যাপে উঠে আসবে নিজের সংগ্রাম, লড়াই, ভুখা পেট আর রঙিন প্রেমের গল্প। কথা মতো কাজ। সঞ্জয় তাঁর নিজের স্বপ্নকে চাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন আরও পাঁচটা বাচ্চার মধ্যে। বাচ্চাগুলোর কাছে সঞ্জয় হয়ে উঠেছিলেন বাবা-মা কিংবা বড়োদাদার মতো। সেই সঞ্জয় মণ্ডলের জীবন নিয়ে এবার নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা চলচ্চিত্র। যার চিত্রনাট্য লিখেছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং সুপ্রিয় সেন।

কলকাতার ট্যাংরা বস্তি এলাকা। ‘ট্যাংরা ব্লুজ’। যা সঞ্জয় মণ্ডল এবং তাঁর গানের দলের জীবনের লড়াই এবং তাঁদের বিখ্যাত ওয়েস্ট ব্যান্ড গ্রুপ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি। সর্বভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের জনপ্রিয় ‘ইন্ডিয়া’স গট ট্যালেন্ট’ রিয়্যালিটি শোয়ে ২০১০ সালে তাঁরা দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। সঞ্জয়দের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে যায় তখন থেকেই। রিয়্যালিটি শো থেকে ফিরে আসার পর আর তাঁদের পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁদের র্যারপের সঙ্গে মিল খুঁজে পান সমাজের পিছিয়ে পড়া তথাকথিত প্রান্তিক মানুষের দল।

“কেউ রাখে না খবর কোনো, কেউ রাখে না খোঁজ/ লড়তে লড়তে মরতে মরতে বেঁচে থাকা রোজ
রাত্তিরবেলা শব্দ তুলি ময়লা তুলি দিনে/ আমাদের এই জীবন কাটে রিসাইকেল বিনে
মালকড়ি নেই সিন্দুকে ভাত ছিল না পেটে/ দানা ভরা বন্দুকেতে জীবন গেছে ঘেঁটে 
কে যে আপন চৌকি চাপন বুঝি বড়ো লেটে/ কোথায় গেছে জানা নেই তবু যাচ্ছি হেঁটে 
এই তো আমার দেশ, মুখটা খুললেই শেষ”

ট্যাংরা ব্লুজ ছবির চরিত্রেরা

এই তাঁদের জীবন। এই তাঁদের বেঁচে থাকা। ‘ট্যাংরা ব্লুজ’ ছবির ট্রেলার লঞ্চের দিনে সাংবাদিক বৈঠকে আপ্লুত বোধ করেন সঞ্জয় মণ্ডল। তিনি জানান, “গান, প্রেম, অপরাধ, জেলবন্দি দশা সবই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আমার জীবনও যে কোনোদিন সিনেমার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, ধারণাই ছিল না।” বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন আনন্দে। আর তাঁকে জড়িয়ে ধরল ব্যান্ডের বাচ্চাগুলো। সবটাই তো স্বপ্নের মতো। কিন্তু সত্যি। তিনি পেরেছেন। তিনি করে দেখিয়েছেন।

ছবিতে সঞ্জয়কে দেখানো হয়েছে সঞ্জীব চরিত্রে, যেখানে অভিনয় করেছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। ব্যান্ডের প্রধান সদস্যের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ খ্যাত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সামিউল আলম। অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মধুমিতা সরকার। ছবিতে সংগীত পরিচালনার দায়িত্বে নবারুণ বসু।

সাংবাদিক বৈঠকে নিজের ছবি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে পরিচালক সুপ্রিয় সেন বলেন, “ভেবেছিলাম ট্যাংরার উপরে ছোটো ছবি বানাব। সে ছবি আজও হচ্ছে কালও হচ্ছে। তার আগে গোটা একটা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি হয়ে গেল একই বিষয়ের উপর।”

অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় জানান, “সবাই ছিল বলেই কাজটা সম্ভব হয়েছে। সঞ্জয় মণ্ডল আর তাঁর বাহিনি না থাকলে আমি সঞ্জীব মণ্ডল হয়ে উঠতে পারতাম না। আমাদের প্রত্যেককে ধরে ধরে টিপস দিয়েছেন স্বয়ং সঞ্জয়।”

ট্যাংরার বস্তি এলাকা

অভিনেত্রী মধুমিতা সরকার ওরফে জয়ী বলেন, “আমার চোখ দিয়ে ট্যাংরা ব্লুজ এবং ট্যাংরার বস্তি এলাকাকে দেখানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন পরিচালক। আশা করছি, তাঁর নির্দেশ ঠিক মতো মানতে পেরেছি।”

“আমাদের ছোটো নালা চলে আঁকেবাঁকে/ নালার পাশে সব্বোনেশে পদ্ম ফোটে পাঁকে
পদ্ম ফোটে পাঁকে আর পদ্য ফোটে খাতায়/ বাজ পড়েছে বৃষ্টি ছাড়া আমার মোটা মাথায়”
– এমন কঠিন কথাকে সহজ করে বলার দায়িত্ব নিয়েছে ট্যাংরা ব্লুজ। তৃতীয় বিশ্বের সঞ্জয়রা তাই প্রতিটি যুগে জিতে যান ‘মোটা মাথা’ নিয়েই। আগামী পয়লা বৈশাখ ‘ট্যাংরা ব্লুজ’-এর শুভমুক্তি।

ছবির অফিশিয়াল ট্রেলার

Developed by DXDasia