
ছোটোদের নিয়ে চেতনা’র প্রথম কর্মশালা
লক্ষ্মীছানা-র শুটিং-এ সুজন মুখোপাধ্যায়
এই শহরেই আছে ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চিলড্রেন্স লিটল থিয়েটার’ ওরফে ‘শিশু রংমহল’। একাধিক নামজাদা মানুষের সংস্পর্শে সিএলটি হয়ে ওঠে ভারতের সর্বপ্রথম শিশুদের থিয়েটার। শুধু ভারতেই নয়, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছ়ড়িয়ে পড়ে সিএলটির নাম। এই শহরেই আছে নেহেরু চিলড্রেন মিউজিয়াম। একসময় রমাপ্রসাদ বণিক দীর্ঘদিন বাচ্চাদের নাটক শিখিয়েছেন সেখানে। এই শহর এমনই সব ঐতিহ্যের ধারক। ঐতিহ্যের সেই ধারার বাহক হয়ে এখনো ছোটোদের নিয়ে নাটকের কাজ করে চলেছে শহরের বহু চেনা-অচেনা নাট্যদল। ‘ছোটোদের হৈ হল্লা’-ও সেরকম একটি উদ্যোগ। গরমের ছুটিতে ছোটোদের নিয়ে চেতনা নাট্যদলের প্রথম কর্মশালা। পরিকল্পনা ও পরিচালনায় সুজন নীল মুখোপাধ্যায়।

চেতনা-র ৫২ বছরের ইতিহাসে ছোটোদের নিয়ে কর্মশালা কখনও হয়নি, বড়োদের হয়েছে। হঠাৎ এই উদ্যোগ কেন? “ইচ্ছে অনেকদিন ধরেই ছিল। ছোটোদের নিয়ে টেলিভিশনে কাজ করলেও, এভাবে অভিনয়ের কর্মশালা করা হয়নি কখনো। আমি ৫০-এ পা দিচ্ছি এবছর, সেকারণে আমার অভিনীত ও পরিচালিত নাটক নিয়ে একটা নাট্যোৎসব হবে আগামী জুলাই মাসে। সাতদিন ব্যাপী এই উৎসবে ৯টা নাটক থাকবে। একটা নতুন নাটক থাকছে ছোটোদের কেন্দ্র করে। অভিনব একটা কনসেপ্ট, আমি নিজেই লিখেছি। আমার ছোটোবেলায় অভিনয় করা একটি নাটককে কেন্দ্র করেই এই নতুন অভিযান। এই সময়ে তো অনেককিছুই বদলে গেছে, ভাষা, গ্যাজেট, ছোটোদের বড়ো হওয়া। মূলত নাটকটা একটা ফ্যান্টাসি, আলিবাবা ও জিনের গল্প। আমি এই নাটকটার মাধ্যমে সুকুমার রায়-কেও ট্রিবিউট দিতে চাইছি, তাই নাটকটার ফ্লেবারটাই হলো উদ্ভট রস বা ‘ননসেন্স’ আঙ্গিকের।”
মনে রাখতে হবে, ছোটোরা কিন্তু মোটেই ছোটো নয়। তাদেরও চিন্তনের, মননের এবং সৃজনশীলতার নিজস্ব একটা জগৎ আছে। সে-জগৎ চমৎকার, রং-বেরং-এর হাজারো কল্পনা দিয়ে রাঙানো। সেই রং যেন আমাদেরও মর্মে লাগে। সেই রং অটুট রাখার দায়িত্ব আমাদেরও। চেতনা-র ‘ছোটোদের হৈ হল্লা’ নিঃসন্দেহে তেমনই একটি প্রয়াস।
সুজন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত নতুন নাটকটি মঞ্চস্থ হবে নাট্যোৎসবের শেষদিন। তার জন্য শিশু-অভিনেতা বাছা হবে চেতনা নিবেদিত ছোটোদের এই কর্মশালা থেকে। তবে এটাই যে মূল উদ্দেশ্য এমনটা নয়, সুজন জানিয়েছেন ছোটোদের নিয়ে কর্মশালা করানোর ইচ্ছে তাঁর অনেকদিন ধরেই ছিল, গরমের ছুটিতে সেটাও হলো সেই সঙ্গে নতুন নাটকের জন্য অভিনেতা পাওয়াও হলো। মূল উদ্দেশ্য বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করা।

ছবিতে সুজন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তারে জমিন পার-খ্যাত শিশু-অভিনেতা দরশীল সাফারি
গরমের ছুটিতে এহেন উদ্যোগ প্রসঙ্গে মনে পড়লো, গরমের ছুটিতে নব্বইয়ের দশকে দূরদর্শনে ‘ছুটিছুটি’ নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। সেখানে ছোটোদেরমনোরঞ্জনের জন্য দেখানো হতো নাটক, পুতুলনাচ, মুকাভিনয়, ক্যুইজ আরও নানা কিছু। আবার, কেবল টিভি-র যুগে আমরা দেখেছি দারুণ জনপ্রিয় টেলিভিশন-শো ‘লক্ষ্মীছানা’। পরিচালনা করতেন সুজন মুখোপাধ্যায়। ছোটোদের সঙ্গে তাঁর রসায়নই ছিল লক্ষ্মীছানা’র ইউএসপি। এখন টেলিভিশনে ইংরেজি বা হিন্দি ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ জাতীয় অনুষ্ঠানগুলির প্রতিলিপি বানানো হয়। সেখান থেকেও খুদে প্রতিভা খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু আগের সেইসব অনুষ্ঠানের আমেজ বা অভিনব ভাবনা তাতে অনুপস্থিত। এবং লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আজকাল টেলিভিশনের এইসব অনুষ্ঠানের জেরে অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের নাচ, গান শেখানোর জন্য যতটা উদগ্রীব, ততটা নাটকের মতো পারফর্মিং আর্ট নিয়ে নন। ছোটোদের থিয়েটার নিয়ে তেমন উৎসাহ চোখে পড়ে না।
সুজনের কথায়, “সেটা একদিকে ঠিক। তবে, টেলিভিশনের তাৎক্ষণিক ফরম্যাটের সঙ্গে থিয়েটার ঠিক মেলে না। থিয়েটার মূলত একটা যৌথ প্রয়াস, ছোটো বড়ো মেজ সেজ সবাই থাকতে পারে সেখানে। যেমন আমি যে নাটকটা করছি, সেটা বাচ্চাদের নিয়েই কিন্তু সেখানে বাচ্চাদের সঙ্গে বড়োরাও আছে। যেকারণে আমার এই নাটকটায় দৃশ্যগত কিছু মজা থাকবে। তবে, পরিচালনার সময় এটা মাথায় রাখতে হয়েছে যে, ছোটোদের না ভালো লাগলে নাটকটা ‘ফেল’ করবে। ভালো লাগা, মজা পাওয়াটাই আমার কাছে আসল ব্যাপার। কী শিক্ষা পেল বা বার্তা পেল, আমার মনে হয় বাচ্চাদের মনে হয় ছোটোদের মনে এতো চাপ দেওয়া উচিত নয়। তার উপর কিছু চাপিয়ে না দিলেও সে যেখান থেকে যা পাওয়ার ঠিক পেয়ে যায়। এছাড়া, ‘এসো নাটক শিখি’-র মতো শুধু বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করে এরকমও প্রচুর দল আছে। তাদের নাটকের বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে অন্যান্য যাবতীয় কিছু বাচ্চাদের কেন্দ্র করেই।”
অনেকেই মনে করেন, লক্ষ্মীছানা-র দ্বিতীয় হয় না। আপনার আর ছোটোদের বন্ডিং আজও মনে রেখেছেন দর্শক। ছোটোদের সামলানো মোটেই সোজা কথা নয়, “ছোটোদের সঙ্গে এই বন্ডিং-এর সেরকম বিশেষ কোনও কারণ নেই। হয়ে যায়। আমি তো প্রাথমিক ভাবে একজন অভিনেতা, যখন লক্ষ্মীছানা করলাম মীর আমাকে খুব বলতো, আমি এতো অনুষ্ঠান করেছি, লক্ষ্মীছানা সঞ্চালনার মতো ধৈর্য আমার নেই। কখনও কখনও আমারও অধৈর্য লাগতো কিন্তু কীভাবে যেন হয়ে যেত তখন। ভালো লাগা থেকেই হয়েছিল। আবার ছোটোদের সঙ্গে কাজ করতে চলেছি, খুব ভয়ে ভয়ে আছি (হাসি)। দেখা যাক কতটা ধৈর্য আমার অবশিষ্ট আছে!” বলছিলেন সুজন।

‘ছোটোদের হৈ হল্লা’ কর্মশালার বিশদ তথ্য
“ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।” মনে রাখতে হবে, ছোটোরা কিন্তু মোটেই ছোটো নয়। তাদেরও চিন্তনের, মননের এবং সৃজনশীলতার নিজস্ব একটা জগৎ আছে। সে-জগৎ চমৎকার, রং-বেরং-এর হাজারো কল্পনা দিয়ে রাঙানো। সেই রং যেন আমাদেরও মর্মে লাগে। সেই রং অটুট রাখার দায়িত্ব আমাদেরও। চেতনা-র ‘ছোটোদের হৈ হল্লা’ নিঃসন্দেহে তেমনই একটি প্রয়াস। সুজনের কথায়, “এই কর্মশালা থেকেই চেতনা বেছে নেবে খুদে দেবশঙ্কর, গৌতম হালদার বা সোহিনী সেনগুপ্তকে।” ৪ মে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মশালাটি শুরু হয়েছে। তবে, ভর্তির আবেদন জানানো যাচ্ছে এখনও, ক্লাস শুরু হবে আগামী ১১ মে থেকে।
