
“কাকে তোরা ভোট দিয়েছিস বুঝে দেখ!”
আমাকে দেখে বস্তির কয়েকজন লোক এসে ভিড় করল। বিশ্বনাথ কখন কীভাবে মারা গেছে, অতিরিক্ত মদ্যপানই যে তার মৃত্যুর কারণ তা বোঝাতে এবং এখন সংসারটার কী হবে – এইসব মন্তব্য আমাকে ঘিরে চলতে লাগল। আমি সবাইকে ভিড় না করার জন্য হাত জোর করলাম। বিশ্বনাথের বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “হে বাবা, রোনা মৎ, রোনা মৎ”। বাচ্চাটার কান্না থামাতে তাকে গু-মুত মাখা অবস্থায় কোলে তুলে নিলাম এবং সবাইকে দেখিয়ে কান্না থামাবার চেষ্টা করতে লাগলাম। সকলে প্রায় অবাক হয়ে আমার কাণ্ড-কারবার দেখতে লাগল। আমি মনে মনে বললাম, “দ্যাখ শালারা, কাকে তোরা ভোট দিয়েছিস বুঝে দেখ!”
আরও পড়ুন
ভোটে পরাজয়ের বদলা নেবার এই তো সুযোগ
এমন সময় গোবিন্দ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে আমায় সেলাম জানালে। গোবিন্দ্ ছিল এ এলাকায় আমার ভোটের এজেন্ট। গোবিন্দ্-এর সঙ্গে ছিল আরেকজন যুবক।গোবিন্দ্ যুবকটির পরিচয় দিতে আমায় বলল, “কান্তি বাবু, এ্যাই হ্যায় বিশ্বনাথ কা শালা। নাম হ্যায় গনেশ। কাকিনাড়া মে থাকে। খবর পেয়ে শুভে শুভে চলে এসেছে”। আর গনেশকে বলল, “এ্যাই হ্যায় কান্তি বাবু। ইস টাইম মিনসিপ্যালিটি চুনাওসে খাড়া হুয়া থা! বহুত আচ্ছা আদমি”। কিন্তু আমি যে ভোটে হেরে গেছি তা গোপন করে গোবিন্দ্। আমি গনেশকে বলি, “অনেকক্ষণ মারা গেছে। এখন তাড়াতাড়ি বডি শ্মশানে নিয়ে না গেলে পচন ধরবে। সুতরাং, সবাই তৈরি হয়ে নাও”।
বস্তির কয়েকজন যুবক বাঁশ ও কাতা দড়ি এনে মরা শ্মশানের দিকে নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত পাকা করে ফেলল। কিন্তু সব কয়টাই মদ গিয়ে একেবারে টং। সে অবস্থায় টলটলানো পা নিয়ে তারা এক সময় বডি কাঁধে তুলে নিল। আমিও সামনের দিকে কাঁধ লাগালাম। সবাই “রাম নাম সৎ হ্যায়” বলে বস্তি কাঁপিয়ে বিশ্বনাথের মরদেহ নিয়ে জোর কদমে পা চালাল। আমিও কাঁধে ব্যাথা লাগা সত্ত্বেও মড়া কাঁধে মদ্যপদের সঙ্গে দ্রুত পা চালিয়ে প্রায় ছুটতে লাগলাম। লক্ষ করার চেষ্টা করলাম, এলাকার লোক আমাকে এ অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে কিনা। ওরা নিশ্চয়ই ভাববে – আমাকে ভোট না দিয়ে কী অন্যায়টাই না ওরা করেছে!
মিনিট সাত-দশের মধ্যে আমরা মড়া কাঁধে জিটি রোডে এসে উঠলাম। এ দিকটা আট নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে – আমার ওয়ার্ড ছিল পাঁচ। এখানকার লোকে তাই আমাকে চেনে না। আমারও এদের ‘শিক্ষা’ দেয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কাঁধ টনটন করলেও কাঁধ বদল করার অবকাশও আমায় দিল না মদ্যপ মরদেহ বাহকরা। একেবারে শ্মশানে এসে কাঁধ থেকে মড়া নামিয়ে ওরা সব কয়জন মাটিতে মদের নেশায় গড়াগড়ি খেতে লাগল। একমাত্র গোবিন্দ ও গনেশই স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল।
(চলবে)
