
“একবার ঠাকুরপো ভোটে জিততা লউক না, সব রাস্তার মোড়ে মোড়ে কল বসাইয়া দিব!”
মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে প্রথম দাঁড়াবার সময় আমার জনগণ সম্পর্কে একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার কাহিনি, যাকে একটা গল্পও বলা যেতে পারে। তৃতীয় ঘটনা হিসেবে তার উল্লেখ না করলেই নয়।
প্রথমবার ভোটের ফলাফল যেদিন বেরুলো, সেদিন কংগ্রেসিরা রাত প্রায় ন’টা-সাড়ে ন’টা পর্যন্ত আমাদের বাড়ির সামনে “চিনের দালাল ধ্বংস হোক”, “কংগ্রেস জিন্দাবাদ” ইত্যাদি ধ্বনি দিয়ে লম্ফ-ঝম্ফ করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে গিয়েছিল। পরের দিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বিমর্ষ মন নিয়ে ঘরের দাওয়ায় বসে আছি, এমন সময়ে আমাদের প্রতিবেশী কামাখ্যা বসু, রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমাকে বিমর্ষভাবে বসে থাকতে দেখতে পেয়ে আমাকে সান্ত্বনা দিতে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। বললেন, “কী, হিন্দুস্তানি ব্যাডাটারে হারাইতে পারলা না! ভোটারগো মদ গিলাইয়া ব্যাডা সব ভোট কিন্যা ফালাইছিল। আর হিন্দুস্তানিরাও তো তোমারে একটা ভোটও দেয় নাই”।
আমার মা ঘরের ভেতরে সন্ধ্যা-আহ্নিক করছিলেন। কামাখ্যাদার কথা বোধ হয় তাঁর কানে গিয়ে পৌঁছেছিল। তিনি বেরিয়ে এসে কামাখ্যাদাকে বললেন, “এ্যাইখানে আপনি হিন্দুস্তানি-বাঙালি, ঘটি-বাঙাল, হিন্দু-মুসলমান ইত্যাদি টাইন্যা আনবেন না। ও তো ভোট হারবোই। ওর না আছে টাকা প্যসার জোর, না আছে লোকবল। আর সত্যনারায়ণ সিংহের মতো লাখপতি রাঘব বোয়ালের কাছে ও তো পুঁটি মাছ। তবুও তো ওর জামানত জব্দ করতে পারে নাই”। ছেলের সপক্ষে কথাগুলো বলে মা আমাকে বললেন, “যা হাতমুখ ধুইয়্যা আয়। কাইল রাতে যা গেছে…”। কামাখ্যাদা মুখ ব্যাজার করে চলে গেলেন।
হাতমুখ ধুয়ে আবার আমি দাওয়ায় এসে বসলাম। বৌদি একটা ছোটো এলুমিনিয়ামের থালায় দু’খানা রুটি আর দু’পিস বেগুন ভাজা আমার সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “অনেক দেশোদ্ধার তো করেছেন, এবার রুটি দুটি গিল্লা আমাগো উদ্ধার করেন”।
অথচ এই বৌদি গতকালও রাস্তার টাইম কলে ভিড় করা মেয়ে-বৌদের ডাঁট দেখিয়ে বলেছিল, “একবার ঠাকুরপো ভোটে জিততা লউক না, সব রাস্তার মোড়ে মোড়ে কল বসাইয়া দিব!”
আরও পড়ুন
এরকম ভোটের প্রচার লোকে আগে কখনও দেখেনি
বৌদি রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই আমি রুটি দু’টো গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। পেটে খিদে দাউদাউ করছিল – গত রাতে চা ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি।
সেদিন ছিল শনিবার। সকালের প্রাইমারি স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বেজেছে। ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বাড়ি ফিরছে। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, ওরা সবাই আমাকে ‘হেরো’ বলে দুয়ো দিতে দিতে যাচ্ছে।
(চলবে)
