
“রাইফেলই শক্তির উৎস”
দ্বিতীয় ঘটনাটির কথা এবার বলা যাক। সিপিএম পার্টি থেকে যখন ‘হটকারী’-দের বহিষ্কারের জোয়ার বইছিল, তখন একদিন ওই পার্টি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানালো –
“বিখ্যাত নাট্যশিল্পী উৎপল দত্ত কখনও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না। এখনও তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সদস্য নন। অতীতে তাঁর শিল্পকর্ম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে এবং পার্টি বিভক্ত হওয়ার পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র পক্ষে তিনি প্রচার করেছেন। তাতে পার্টির লাভ নিশ্চয়ই হয়েছে, কিন্তু তাঁর নিজের ও দলের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। আজ উৎপল দত্ত হটকারীদের দলে ভিড়ে গিয়ে আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে প্রচারকার্য চালাতে আরম্ভ করেছেন। তিনি নিজের পথ বেছে নিয়েছেন। আমাদের পার্টির সভ্য তিনি নন যে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা আমরা নেব।
আরও পড়ুন
এরকম ভোটের প্রচার লোকে আগে কখনও দেখেনি
“আমাদের পার্টির সভ্য ও বন্ধুগণের নিকট আমরা অনুরোধে জানাই যে তাঁরা যেন শিল্পী উৎপল দত্ত ও তাঁর দলের সঙ্গে কোনো সংস্রব না রাখেন – কোনো সভাসমিতি ও অভিনয়ে তাঁদের যেন নিমন্ত্রণ না করেন”।
উৎপল দত্তের সঙ্গে আমার একরকম হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ঘটনাচক্রে। মিনার্ভা থিয়েটার ও তাঁর অফিস ঘর, মেক আপ রুমে আমার প্রবেশ ছিল অবাধ। তিনি আমাকে তুই-তোকারি করতেন। গণনাট্য আন্দোলন তখন স্থিমিত প্রায়। সংগঠনের অবস্থাও তথৈবচ। উৎপল দত্ত ও তাঁর গ্রুপের অংশগ্রহণে পথনাটিকা ছিল পার্টির ভোটে জেতার প্রচারে অন্যতম হাতিয়ার। সেই উৎপল দত্ত এখন কিনা বলছেন, সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ভোটের প্রচারে অংশগ্রহণ করবে না। ভোটে কখন অংশগ্রহণ করা উচিত, কখন উচিত নয় – তা ভাবার কাজ পার্টির। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কাজ ভবিষ্যৎ বিপ্লবের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে তোলা। ভোট প্রচার তার কাজ না। সে সময়ের অনেক সাংস্কৃতিক ও নাট্য ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের সঙ্গে যুক্ত হলেন। যুক্ত হল বহু ছোটো বড়ো নাট্য ও সাংস্কৃতিক বাহিনী। মিনার্ভা থিয়েটার ক্রমে হয়ে উঠল নকশালবাড়ি কৃষক সংগ্রামের সমর্থক সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি মস্ত বড়ো ঠাঁই। ওই সংগ্রামের সমর্থনে মিনার্ভা মঞ্চে এক সপ্তাহ ধরে সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করা হল। আমার তখন ঘরবাড়ি প্রায় ওই মিনার্ভা। মঞ্চে যেমন এক সপ্তাহ ধরে নাটক-গান ইত্যাদি হয়েছিল, তেমনি মঞ্চের বাইরে টিকিট ঘরের সামনে আমার উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সম্পর্কে ফটো প্রদর্শনী। নয়া দিল্লির চিনা দূতাবাসের সঙ্গে তখন আমার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বহু পত্রপত্রিকা, মাও সেতুং রচনাবলী তাঁরা আমায় পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে আমি ঐসব ফটোগ্রাফ পেয়েছিলাম।
উৎসবের প্রথম দিন উৎপল দত্ত সমেত আমরা কয়েকজন মঞ্চ সাজাতে মঞ্চে উপস্থিত। ঠিক হল, মঞ্চের পেছনের কালো কাপড়ে সাদা কাগজ কেটে আমরা লিখব মাও সেতুং-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি – “রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে বন্দুকের নল থেকে”। দেখা গেল, লাইনটি বেশ দীর্ঘ। ওটাকে ছোটো করা প্রয়োজন। আমরা সবাই ভাবতে বসে গেলাম। হঠাৎ উৎপল দত্ত লাফিয়ে উঠে বললেন, “ইউরেকা! ইউরেকা! মাথায় এসে গেছে। লেখো – রাইফেলই শক্তির উৎস”। আমাদের সবারই পছন্দ হল কথাটি। আমরা কাগজ কেটে লিখতে বসে গেলাম। “সাত দিন ধরে সে উৎসব চলেছিল, / সাত দিন ধরে সে মঞ্চ থেকে বপণ করা হয়েছিল বিপ্লবী যুদ্ধের সাংস্কৃতিক প্রেরণা / সাত দিন ধরে সে মঞ্চের কালো পর্দায় জ্বলজ্বল করছিল তিন শব্দের একটি বারুদবাক্য / কয়েকদিনের মধ্যেই শহরের সমস্ত রাজপথের দেওয়াল অধিকার করে নিয়েছিল সেই শব্দমালা, / গ্রাম নগর বন্দর – সবই এসে গিয়েছিল সেই বারুদ বাক্যের অধিকারে / এবং তারপরই চতুর্দিকে রাইফেল ও বন্দুক কাড়াকাড়ি”।
উৎপল দত্তের মতো কৃষিবিপ্লবী সাংস্কৃতিক নেতা এরপরই হয়ে উঠলেন নকশাল আন্দোলনের (কয়েকদিনের জন্য) অমূল্য সম্পদ! তারপর সেই বিপ্লবী উৎপল দত্তের কী পরিণাম হয়েছিল তা অনেকেরই জানা। তাঁর মৃত্যুর পর “কেওড়াতলা শ্মশানে / তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাল / আকাশের দিকে রাইফেল তুলে রাইফেলধারী কয়েকজন (বামফ্রণ্টের) রাষ্ট্রীয় পুলিশ / সেই রাইফেলের মাথায় তখনো লেগেছিল অসংখ্য বিপ্লবীর কলিজার লাল রক্ত”। তখন তিনি সিপিএম-এর সদস্যপদ অর্জন করেছিলেন কিনা সে তথ্য আমার জানা নেই। তবে “এতদিন যা করিয়াছিলাম, ভুল করিয়াছিলাম” – তাঁর এই স্বীকারোক্তির জন্য সিপিএম তাঁকে আবার কোলে ঠাঁই দিয়েছিল।
(চলবে)
