এরকম ভোটের প্রচার লোকে আগে কখনও দেখেনি

রাঘব বোয়ালের সঙ্গে পুঁটি মাছের লড়াই

যারা চাঁপদানি-বৈদ্যবাটি অঞ্চলে কাজ করতাম, তারা চ্যালেঞ্জ নিলাম, – মিউনিসিপ্যালিটি নির্বাচনকে বিপ্লবী প্রচার আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে কীভাবে গ্রহণ করা যায় তা আমরা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ‘দেখিয়ে’ দেব। আমরা ঠিক করেছিলাম, ভোটে আমরা কোনো পোস্টার ছাপাব না, কোনো ভোটারকে বাড়ি থেকে ডেকে আনব না, প্রত্যেকটি ভোটারের কাছে আমরা দেখা করব, কেন ভোটে দাঁড়িয়েছি তা বুঝিয়ে বলব – আমাদের রাজনীতিকে বোঝানোর চেষ্টা করব, আমরা কেউ ‘ফলস’ ভোট দেব না। আমাদের ছেলেরা পাড়ায় পাড়ায় সন্ধেবেলা দল বেঁধে গান গেয়ে প্রচার করত, “ভোট দিয়ে হয় মন্ত্রীবদল, আর তো কিছু হয় না / দাদাদের হয় গাড়ি-বাড়ি, গরিব খেতে পায় না”, “মন্ত্রীরা সব ছোট্ট কথায় পুঁজিবাদের শালা / মুখেতে বাঘ-ভালুক মারে কাজেতে কাঁচকলা”, “রাষ্ট্রটাতো নিপীড়নের জানবে আসল যন্ত্র / বদলাতে তা পারবে নাকো ভোটের গণতন্ত্র”, “সোজা আঙুলে ওঠে না ঘি, প্রবাদ বাক্য বলে / মুখ না ধুলে মুখের গন্ধ দূর করা কি চলে? / আঘাত যদি না করো তো দেওয়াল ভাঙবে নাকো / রাষ্ট্রটাকে ভাঙার মন্ত্র তাই তো শিখে রাখো” ইত্যাদি ইত্যাদি। 

ভোটের দিন নকশালবাড়িতে কৃষকদের ওপর পুলিশদের অত্যাচারের ছবি সাজিয়ে একটি প্রদর্শন ভোটকেন্দ্রে যাবার পথে নির্দিষ্ট দূরত্বে টাঙানো হল। পথের মোড়ে মোড়ে গেট তৈরি করে তাতে বড়ো বড়ো করে লেখা হল, “তোমার ভাগ্য তোমার হাতে, নেতার হাতে নয়, / হাটে মাঠে লড়াই করেই করতে হবে জয়”, “দেশি জোতদার, পুঁজিপতি, বৃহৎ মাপের যারা / শ্রমিক, কৃষক মধ্যশ্রেণির পরম শত্রু তারা”, “শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত গণতান্ত্রিক শ্রেণি / লড়াইয়ের মাঠেতে হোক বন্ধু চেনা-চিনি”। এ ধরনের ভোটের প্রচার লোকে আগে কখনও দেখেনি। তাঁরা অনেকেই বিস্ময় অনুভব করেছিলেন সেদিন। নকশালবাড়ির কৃষকদের ওপর প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পুলিশি হামলা ও কৃষক হত্যার ছবি দেখতে পথচলতি মানুষও দাঁড়িয়ে পড়তেন, কেউ কেউ প্রকাশ্যে ক্ষোভও প্রকাশ করতেন। আমাদের কমরেডরা উৎসাহের সঙ্গে তাঁদের পোস্টার প্রদর্শনীটি বোঝাতেন।

আমি যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, তিনি গত দু’বারের পৌরভোটে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে জিতে এসেছেন। দু’বারই তিনি চেয়ারম্যানের ভূমিকা পালন করে এসেছেন। আর যে ওয়ার্ডে আমাদের বাড়ি, গতবার যে ওয়ার্ড থেকে দাঁড়িয়েছিলাম, এটা সম্পূর্ণ আলাদা ওয়ার্ড। আমাদের পাড়ার লোকজনের এখানে ভোট নেই। আমার লড়াইটা ছিল রাঘব বোয়ালের সঙ্গে পুঁটি মাছের লড়াইয়ের মতো। সুতরাং আমার পরাজয় প্রায় সুনিশ্চিত ছিল। কিন্তু ব্যবধান ছিল খুব কম। ভোটের পর আমি যখন আমার অফিসে গেলাম, তখন আমাদের অফিসের প্রধান আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই ক’টা ফলস ভোট দিয়া ব্যাটাকে হারাইতে পারলেন না?” তিনি ছিলেন মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভদের ইউনিয়নের সভাপতি এবং সিপিএম-এর একজন বড়ো মাপের নেতা? তাঁর কথার জবাবে আমি একটু হেসেছিলাম মাত্র। সত্যিই তো, ফলস ভোট ছাড়া কি ভোট হয় নাকি?
(চলবে)

Developed by DXDasia