
মারা গেল বিশ্বনাথ সাউ
আমার ভাইপোও স্কুল থেকে ফিরল। কাঁধের ব্যাগটা আমার পাশে দাওয়ার ওপর রেখে ও আমাকে বলল, “কাকু, জানো তো, বকুলতলা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের পাশে থাকত যে বিশ্বনাথ, যে জেলার ফুটবলে এক সময় নাম করা গোলকিপার ছিল, সেই বিশ্বনাথ আজ ভোরবেলা মারা গেছে”।
কে বিশ্বনাথ? একটু ভাবতেই মনে পড়ে গেল – হ্যাঁ হ্যাঁ, বিশ্বনাথ সাউ! আমারই ওয়ার্ডের শেষের দিকে বস্তির একটা ঘরে থাকত। ফুটবল খেলায় এক সময় খুব নাম করলেও এখন সব বারোটা বেজে গেছে। জুট মিলে কাজ করত। আজ সাত মাস সে মিল বন্ধ। ঘরে বৌ আর একটা কচি বাচ্চা। আর বেকার বুড়ো বাপ তো আছে। মদ খেয়ে বাপ বেটা দু’জনেই লিভার পচিয়ে বসে আছে। ভোট ক্যাম্পেনে বেরিয়ে আমি ওদের বস্তির ঘরে গিয়েছিলাম। ওর অবস্থা দেখে পার্টির একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তারকে ডেকে দেখিয়েও ছিলাম। ডাক্তার আমাকে বলেছিল, “লিভার একদম পচে গেছে। ভোট পর্যন্ত টিকলে হয়। তবুও বিশ্বনাথের হাঁ করে মুখে দু’ফোঁটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দিয়ে বিশ্বনাথকে বলেছিল, “সব ঠিক হো যায়গা। পরশু ভোট, ইয়াদ হ্যায় না? কিস মার্কমে ভোটা দেগা?”
বিশ্বনাথ কঁকিয়ে কঁকিয়ে বলল, “সূরজ মার্কা মেঁ”। বলেই মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। মুখ দিয়ে লালা গড়াতে লাগল। আমরা তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে পড়লাম।
বিশ্বনাথের মৃত্যুর খবরটা মুহূর্তেই আমায় কেমন চাঙা করে তুলল। আমার মনে হল, ভোটে আমার পরাজয়ের বদলা নেবার এই তো সুযোগ। ভোটের সময় প্রচারে বেরিয়ে আমরা বলেছিলাম, “সত্যনারায়ণ সিংহ হ্যায় লাখপতি। ভোট কা বারে সিংজি আপ কা ঘর মেঁ দশ টাইম আয়গা। ভোট কা বাদ ও সিংজি থোরাই আপকো পুঁছেগা”। তাই আমি যদি এখন বিশ্বনাথের বাড়ি যাই, তখন বস্তির লোকেরা আমাকে দেখে বুঝবে – ভোটে হেরে গেলেও আমাদের পার্টি সাধারণ মানুষের সঙ্গেই থাকে। পার্টিটা তো গরিবদের পার্টি। সত্যনারায়ণ সিংহ হল বড়োলোক – গরিব মরলে ওদের খোঁজের কি প্রয়োজন?
আমি জামাটা কোনোরকমে গায়ে নিয়ে বিশ্বনাথদের বস্তির দিকে হাঁটা দিলাম। বিশ্বনাথদের বস্তিতে এসে দেখলাম, একটা নোংরা কাপড় দিয়ে বিশ্বনাথের মৃতদেহটাকে ঘরের দরজায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাছি ভনভন করছে চার দিকে। ভিতরে বিশ্বনাথের বৌ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। বিশ্বনাথের বাবা মদ খেয়ে বিশ্বনাথের মরদেহের পাশে দেয়ালে ঠেস দিয়ে কাত হয়ে পড়ে আছে। আর মাঝে মাঝেই ঘোলা চোখে চারদিক দেখে নিয়ে চিৎকার করে বলে উঠছে, “বিশ্বনাথ কা কাঁহা হইলবা, কাঁহা হইলবা…”। বিশ্বনাথের কচি বাচ্চাটা সারা গায়ে গু-মুত মেখে হাত-পা ছুঁড়ে কেঁদে মরছে।
(চলবে)
