
দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে বসানো হচ্ছে শ্বেত ও রক্তচন্দন গাছ
*প্রতীকী ছবি
ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ রুখতে যে গাছ লাগানো কতখানি প্রয়োজনীয়, তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না। এ যাবৎকাল ধরে “গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান”-এর দাবি বারংবার উত্থাপিত হয়েছে পৃথিবী জুড়ে। তবে সমীক্ষা বলে, যে কোনো গাছ নয়; পরিবেশকে সবুজ করে তোলবার জন্য বেছে নেওয়া উচিত এমন গাছেদের, যারা একদিকে যেমন পরিবেশে অক্সিজেনের সরবরাহ করবে, অন্যদিকে তেমনই সেটিকে ব্যবহার করা যাবে নানাবিধ দরকারি উদ্দেশ্যসাধনে।
পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের সুবাদে এবার দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দারা নিজেদের বাড়ির বাগানেই রোপণ করতে পারবেন চন্দন গাছ। বনদপ্তর যে কেবল গাছের চারাটির বন্দোবস্ত করে দেবে তাই নয়, এটির যত্ন নেওয়ার জন্য কী কী করণীয়, সে বিষয়ে গাছের মালিককে অবগত হতে সাহায্যও করবে। এর আগেও একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বনদপ্তর। আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়নে অভিনব চাষাবাদ শুরু হয়েছিল পুরুলিয়ার একাধিক বনাঞ্চলে। পাশাপাশি বালিগেড়িয়ার শুষ্ক জমিতে ঘন শালবন নির্মাণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

গত ৫ মার্চ, ২০২৩ পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের উদ্যোগে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোপগড় ইকো পার্কে পালিত হল বন বান্ধব উৎসব ২০২৩। অনুষ্ঠানটিতে অন্যান্য বন আধিকারিকদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। অনুষ্ঠান চলাকালীন তিনি একটি পাইলট প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন, যার দরুন সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলগুলিতে রোপণ করা হবে বহুসংখ্যক শ্বেত ও রক্তচন্দন গাছ।
বনদপ্তর যে কেবল গাছের চারাটির বন্দোবস্ত করে দেবে তাই নয়, এটির যত্ন নেওয়ার জন্য কী কী করণীয়, সে বিষয়ে গাছের মালিককে অবগত হতে সাহায্যও করবে।
এতদিন অবধি কেবলমাত্র দক্ষিণ ভারতেই চন্দন কাঠের চাষ হত। তবে সম্প্রতি একদল বাঙালি গবেষকের পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলগুলিও চন্দন কাঠ চাষের উপযোগী। এই পরীক্ষাকেই বাস্তবায়িত করে তুলতে নির্বাচন করা হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের ২৫টি বনভূমি। এমনকি এই চাষকে শুধুমাত্র বনভূমির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে, জনসাধারণের জন্যেও মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় মানুষদের কারোর বাড়িতে যদি চাষের অনুরূপ ফাঁকা জমি থাকে, তাহলে যে স্থানীয় বনদপ্তর থেকে চন্দনের চারা সংগ্রহ করে, তা রোপণ করতে পারে। গাছটি রোপণের পদ্ধতি ও যত্নের নিয়মাবলী বনবিভাগের পক্ষ থেকেই জানানো হবে সেই ইচ্ছুক ব্যক্তিকে। সম্পূর্ণ রূপে বৃদ্ধি পাওয়ার পর যে কোনো চন্দন গাছের মূল্য কয়েক লক্ষ অবধি হতে পারে বলে জানায় পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগ। সবুজ বাঁচানোর সাফল্য ছড়িয়ে পড়েছিল বাঁকুড়া জেলার জয়পুর অরণ্যেও – সেখানে আরও বেড়ে উঠেছে অরণ্যের গভীরতা।

এই প্রকল্পটিকে সাফল্যমণ্ডিত করবার উদ্দেশ্যে জঙ্গলমহলের অন্তর্গত দুই জেলাতেই রপ্তানি করা হবে শ্বেত ও রক্তচন্দনের চারা। পশ্চিম মেদিনীপুরে রোপণ করা হবে ১৫ হাজার শ্বেত চন্দনের চারা এবং ১০ হাজার রক্ত চন্দনের চারা। অন্যদিকে ঝাড়গ্রামে রোপণ করা হবে শ্বেত ও রক্ত চন্দনের যথাক্রমে ৬ হাজার ও ১০ হাজার চারা। চন্দন কাঠ চাষের খরচ যাতে প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখার আশ্বাস দিয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। যেমন আশ্বাস ছিল সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও। ম্যানগ্রোভ বিস্তারে ঘুরে দাঁড়াবে উপকূলের পরিস্থিতি, কথামতো কাজও করা হয় সেখানে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নানান ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী এবং সুগন্ধযুক্ত খাদ্য ও পানীয় তৈরি ছাড়াও শ্বেত ও রক্তচন্দন (চন্দনের উপকারিতা) উভয়েই ব্যবহৃত হয় নানান কাজে, যার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল চিকিৎসা শাস্ত্রে এর ব্যবহার। রক্ত চন্দনের ভিতরের অংশ ‘হার্টউড’ নামে পরিচিত। কাশি, খাদ্যনালীর সমস্যা, ফ্লুইড রিটেনশন, রক্ত পরিশুদ্ধকরণ প্রভৃতিতে কাজে আসে এই অংশ। এছাড়াও ‘অ্যান্টিক’ আসবাবপত্র তৈরিতে রক্তচন্দনের ব্যবহার করা হয়। অন্য হাতে, সাধারণ জ্বর, ঠান্ডা লাগা, কাশি, ব্রঙ্কাইটিস, মুখগহ্বর ও গলার যন্ত্রণার উপশমে শ্বেত চন্দন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও লিভার ও গলব্লাডারের সমস্যা, মাথাধরা, এবং হৃদপিণ্ড ও রক্তনালীর চিকিৎসায় কাজে লাগে এটি।
পরিবেশকর্মীরা আশা করছেন, এই পাইলট প্রকল্পের জেরে একাধারে বনভূমির সবুজায়ন ও পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুই-ই সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষেরাও বৃহত্তর প্রকল্পটির অংশ হয়ে ওঠবার সুযোগ পাবেন।
____
তথ্যঃ পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর
