
উষ্ণ আন্তরিকতায় ভরা পাহাড়ি গ্রামের স্বাদ
এই শীতে পেতে চান উষ্ণ আন্তরিকতায় ভরা পাহাড়ি গ্রামের স্বাদ? কমলালেবু বাগানের ছায়ায় বসে খেতে চান কমলালেবু? তবে যেতেই হবে সোরেন – দার্জিলিং জেলার তাকদা ব্লকের এক গ্রাম।
আমাদের সোরেন যাওয়া হয়েছিল আকস্মিক ভাবেই। বড়দিনের ছুটিতে জায়গা পেলাম না বড়মাঙ্গোয়ার হোমস্টেতে, তারাই সন্ধান দিল সোরেন-এর গিরিলজের। ফোনে জানলাম নতুন তৈরি হয়েছে হোমস্টে ব্যবস্থায় এই গিরি লজ –আমরাই হব তাদের প্রথম অতিথি। ‘প্রথম অতিথি’ হওয়ার আশা, আশঙ্কা দুই নিয়েই পৌঁছলাম সোরেন। তিস্তা বাজার থেকে পেশক রোড ধরে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে একটা পথ উঠে গেছে তিনচুলে, জোড়বাংলা হয়ে দার্জিলিং। এই পথে বড়ামাঙ্গোয়া ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা উপরে উঠলে সোরেণ বস্তি। গ্রামের সারা পথ জুড়ে কমলার বাগান, গাছের পাতাও ঢেকে আছে কমলালেবু ফলে। শুনলাম এবারের ফলন হয়েছে বেশি। তবে এই তাকদা অঞ্চলের কমলালেবুর ফলন ছিল সব থেকে বেশি, এই গ্রামের প্রধান জীবিকাই ছিল কমলালেবু চাষ। কিন্তু কোন এক অজানা সংক্রমণে বেশ ক’বছর ধরেই তেমন ফলন হচ্ছে না। এরা আশঙ্কা করছেন –কাছেই এক মোবাইল টাওয়ার বসানোতেই হয়তো এই বিপত্তি। এখন বিকল্প জীবিকা খুঁজছেন অনেকেই। গিরিলজের প্রতিষ্ঠার কারণও বোধ হয় সেটাই।
শিলিগুড়ি থেকে তিস্তা বাজার হয়ে সোরেনের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। গিরিলজের ঠিকানা আপার সোরেন। বড়ামাঙ্গোয়ার পর থেকে রাস্তা বেশ খারাপ। দার্জিলিং থেকেও আসা যায় জোড়বাংলা, পেশক চা-বাগান, তিনচুলে হয়ে। আরেকটা পথ গিয়েছে তিনচুলে থেকে তাকদা হয়ে। তবে এই পথের অবস্থা আরও খারাপ। এই রাস্তায় হোমস্টে আছে কয়েকটা। তবে সোরেনে একটাই হোমস্টে। গিরিলজের ফোন নাম্বার ৮০১৬৬২৭৭৪৮/৯৬০৯৩১৩৪৬০/৯৮৩২৫২৮২০৪।
ই-মেল – hbgiri193@gmail.com. তবে মেলের উপর বেশি ভরসা না করাই ভালো, প্রায় সময়েই যোগাযোগ থাকে না। আরও বলি, কমলালেবু পাকার সময় জানুয়ারির শেষ, এই জানুয়ারিতেই চলে যান না কেন? শুভস্য শীঘ্রম।
প্রথম দর্শনেই যে গিরিলজ মন টানে, তা বলা যায় না। শহুরে আরামের সব উপকরণ নেই – কিন্তু সব অভাব পূরণ করে দেয় এখানকার মানুষের আন্তরিকতা। লজের মালিক হর্ক বাহাদুর গিরি নিজের হাতে রান্না নানারকম সুস্বাদু নেপালি খাবার, শাকসবজি থেকে শুরু করে কমলালেবু- সবই তাঁর ক্ষেতের। জানালেন এই গ্রামের কেউ কোন রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। ঘরের গরুর দুধ দিয়ে তৈরি হয়েছে ক্ষীর, ভাতপাতে ঘরে তৈরি ঘি। তাছাড়া কমলালেবুতো আছেই। এ গ্রামের সব থেকে বড় কমলালেবুর বাগান তাঁরই। নিজেই নিয়ে গেলেন আমাদের বাগান দেখাতে, গাছে উঠে পেড়ে দিলেন কমলালেবু। লজের সাথে রয়েছে তাঁর এক মনিহারি দোকান – এ অনেকটা গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপের মত, গ্রামের সকলেই আসে সেখানে গল্পগাছা করতে, খদ্দেরের সংখ্যা বোধহয় নগণ্য। গ্রামের ‘প্রথম অতিথি’রা আসায় ভিড়টা একটু বেশিই ছিল।
গ্রামের পথ দিয়ে যে দিকেই যাই, মন জুড়িয়ে যায়। আবহাওয়া অনুকূল হলে সারা পথ সঙ্গ দেয় তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। দূরে দূরে ছোট ছোট বাড়ি, প্রতি বাড়ির লাগোয়া কমলালেবুর বাগান। আর আছে নানারকমের ক্ষেত– টমাটো, ফুলকপি, রাইশাক, ব্রকোলি আরও কত কী। পাকদণ্ডী দিয়ে হারিয়ে যাওয়া যায় জঙ্গলের পথে। তবে পাহাড়, জঙ্গলের স্বাদ পেতে হলে অবশ্যই হাঁটতে হবে, গাড়ি নৈব নৈব চ।
বড়দিনের দিন গেলাম গ্রামের গির্জায় – গাছগাছালিতে ভরা ছোট্ট গির্জা। গ্রামের বাচ্চারা মন দিয়ে রিহার্সাল দিচ্ছে, শুনলাম কিছুক্ষণ পরেই বাইবেলের উদ্ধৃতি পাঠের প্রতিযোগিতা শুরু হবে। মধ্যাহ্নভোজেরও আয়োজন হয়েছে চার্চ চত্বরে। এই গ্রামে খ্রিষ্টানেরা সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ, তার পরে হিন্দু। পথে এক বৌদ্ধমন্দির চোখে পড়ল, কাছে এক হিন্দু মন্দিরও আছে। মিলেমিশে বেশ রয়েছে সব – কোথাও কোন সমস্যা নেই।
পরেরদিন গিরিসাহেব ব্যবস্থা করে দিলেন এক গাড়ির, গাড়ি করে যাব তিনচুলে। তিনচুলের ‘গুরুং কটেজে’র নাম শুনেছি। দেখলাম বেশ ঝাঁ চকচকে, ভিড়ও অনেক। কিন্তু সোরেন-এর গ্রাম্য নিরিবিলি পরিবেশই মন টানে বেশি। ড্রাইভার গল্প জুড়লেন – নতুন বাড়ি করেছেন কেলবুং গ্রামে,অনুরোধ করলেন একবার গিয়ে ‘নেপালি চা’ খেতে হবে। এমন আন্তরিক ডাক কি ফেরানো যায়? শুনলাম চা পাতা বাড়িতে শুকিয়ে হাতে ডলে তৈরি হয় এই চা, তার পর কাঠের আগুনে নুন সহযোগে বানাতে হয়। সুদৃশ্য কাপে পরিবেশিত হল সেই চা। ওঁনারও ইচ্ছে এ বাড়িতে ব্যবস্থা করবেন হোম-স্টের। সে সময়ে অবশ্যই আসব প্রতিশ্রুতি দিলাম। হোমস্টে এই পাহাড়ি অঞ্চলের লোকেদের উপার্জনের একটা পথ খুলে দিয়েছে। আর আমরাও পাচ্ছি এদের জীবনের ছন্দের স্বাদ, যেতে পারছি কত নাম না জানা জায়গায়। তবে ভয়ও হয়, শহুরে লোকেদের ভিড়ে হারিয়ে যাবে না তো এদের সরল আন্তরিকতা?
অল্পদিনে মন ভরে না এখানে, কিন্তু ফিরতেই হবে কর্মব্যস্ত শহরে। আসার সময়ে গিরিসাহেব দিয়ে দিলেন বাগানের কমলালেবু, ঘরে তৈরি ঘি, যেন কত আপনজনের বাড়ি থেকে চলে আসছি। ঠিক করলাম আবার আসব এখানে।
