ছ’টি সোনা এবং একটি রুপো, অলিম্পিয়াডে দুর্দান্ত সাফল্য ছয় বছরের আরুশির

বড়ো হয়ে জ্যোতির্পদার্থবিদ হতে চায় আরুশি দে

খুশির মেজাজ উত্তর চব্বিশ পরগনার (North 24 Parganas) খড়দা (Khardah) শহরে। এ শহরেরই বাসিন্দা, ছ’বছরের মিষ্টি মেয়ে আরুশি দে (Arushi Dey)। কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত একসময়ের সমৃদ্ধ শিল্প হাব খড়দহকে সম্প্রতি সে এনে দিয়েছে গৌরব। সায়েন্স অলিম্পিয়াড ফাউন্ডেশনে (এসওএফ) (Science Olympiad Foundation) দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ছোট্ট মেয়েটি গণিত বিভাগে স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছে। তার এই সাফল্য কেবল বাবা-মা অথবা পরিবারের কাছেই নয় পাশাপাশি সমগ্র রাজ্যের জন্য এনে দিয়েছে খ্যাতি। এর আগেও অলিম্পিয়াডে সাতটি বিষয়ে অংশ নিয়ে ছয়টিতে স্বর্ণ ও একটিতে রৌপ্য পদক জিতেছিল খুদে তারকা।

গত বছর মে মাসে, আরুশি মাত্র ৪৯.২৩ সেকেন্ডে অগুন্তি বিশেষ্য পদ বলার জন্য দ্রুততম হওয়ার রেকর্ড তৈরি করে।

উদ্ভাবনী ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক মনোভাবকে উন্নীত করার লক্ষ্যে পথ চলা শুরু করে, সায়েন্স অলিম্পিয়াড ফাউন্ডেশন। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ‘ইনফরমেশন টেকনোলজি’ বা IT-র প্রতি সারা দেশের ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহী করে তুলছে এই সংস্থা। নেতৃস্থানীয় শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী এবং মিডিয়া কর্মীদের মূল্যবান পরামর্শ মাথায় রেখে কাজ করে সংগঠনটি। ভারত জুড়ে ৩৩,১৭৫টিরও বেশি স্কুলের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া এই অলিম্পিয়াড পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রতি বছরই ৭০০০-এর অধিক ছাত্র-ছাত্রী পুরস্কার জিতে নেয় এই প্রতিযোগিতায়। যথেষ্ট সাহস এবং আত্মবিশ্বাস না থাকলে মর্যাদাপূর্ণ এই অলিম্পিয়াড পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব নয়, তাই এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সকল পড়ুয়াই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিজয়ী।

রবীন্দ্রপল্লী কল্পনালয় হাউজিং কমপ্লেক্সের বাসিন্দা, আরুশি রহড়ার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। গত বছর ডিসেম্বর, তখন সে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। এই সময়েই তার বাবা-মা মেয়ের অসাধারণ প্রতিভা এবং মেধা লক্ষ্য করেন। স্থির করেন অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করাবেন মেয়েকে। সেইমতো শুরু করেন প্রস্তুতিও। এতে জাপান, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ডসহ ১২টি দেশের ১০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী যোগ দেয় মেগা অনলাইন ইভেন্টে। শুধু ভারত থেকেই নয় হাজার স্কুল পড়ুয়া অংশ নিয়েছিল পরীক্ষায়। এ পরীক্ষাটিকে শুধু কঠিন বললে কম বলা হয়, প্রকৃতই সেরা না হলে এ পরীক্ষায় পাশ করা অসম্ভব। অংশগ্রহণকারীদের ১০০ নম্বরের সাতটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ সময় ৪৫ মিনিট। অনলাইনে পরীক্ষা হলেও ওয়েব ক্যামেরার মাধ্যমে কঠোর নজরদারির চলতে থাকে। কিন্তু এসব দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েনি আরুশি, উপরন্তু সমস্ত বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলে নিজের যাত্রাপথে। মোট ছ’টি স্বর্ণপদক জিতে বাকি সমস্ত দেশের প্রতিযোগীদের পরাজিত করে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে সে। পাশাপাশি সামাজিক গবেষণায় প্রথম স্থান অধিকার করে পেয়েছে রৌপ্য পদক।

আমরা জানি, অলিম্পিয়াড বিজয়ী একদিনে তৈরি হয় না। এই জয়ের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ অনুশীলন, উত্সর্গ এবং যথেষ্ট পরিমাণে অধ্যবসায়। অলিম্পিয়াড জিততে হলে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় দিতে হবে। আরুশির বাবা দেবজ্যোতি দে একজন রাজ্য-সরকারী কর্মচারী। তিনি প্রতিনিয়ত মেয়েকে উৎসাহ দেন। নিজের পুরোনো রেকর্ডগুলিকে ভেঙে যাতে আরও এগিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেন৷ আরুশিও তার বাবাকে হতাশ করেনি। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। তার মা, প্রীতি সাহা চৌধুরী একজন গৃহবধূ। মেয়ের সাফল্যে তিনিও সমানভাবে গর্বিত।

আরুশির এই চিত্তাকর্ষক সাফল্যের খবর খড়দহের বাড়িতে পৌঁছানোর মাত্রই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাদের পরিবার এবং বন্ধুরাই নয়, পাশাপাশি সমস্ত প্রতিবেশীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হন এই আনন্দের ভাগীদার হতে। আরুশি ইতিমধ্যেই ওর বয়সী অন্যান্য বিজয়ীদের প্রিমিয়ার লিগে যোগদান করেছে, যারা অসাধারণ দক্ষতায় ‘ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস’-এ তাদের নাম নথিভুক্ত করেছে। গত বছর মে মাসে, আরুশি মাত্র ৪৯.২৩ সেকেন্ডে অগুন্তি বিশেষ্য পদ বলার জন্য রেকর্ড তৈরি করে। তখন তার বয়স সবে ৫ বছর, ১০ মাস এবং ২৪ দিন (জন্ম ২৩ মার্চ, ২০১৫)। পড়াশুনা করতে আর স্কুলে যেতে খুব ভালোবাসে সে। ওর বয়সী বাচ্চাদের মতোই আনন্দে হেসে খেলে বেড়ায়। এই খ্যাতি তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। সাধারণ হয়েও অসাধারণ সে। নতুন কিছু জানার আগ্রহ তাকে সর্বদা তাড়িয়ে বেড়ায়। আরুশির স্বপ্ন, বড়ো হয়ে সে একজন জ্যোতির্পদার্থবিদ হবে।

মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia