শারদীয়া উৎসব এক অর্থে বই পার্বণও, জানাচ্ছেন প্রকাশকরা

শুরু হয়ে গেছে বাঙালির উৎসবের মরসুম। আজ পঞ্চমী। উৎসবের সময় যত এগিয়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানুষের উন্মাদনা। পুজোর শপিং, ছুটির আনন্দ আর উৎসবের জৌলুসের মধ্যে বাঙালির শারদীয়া উৎসবে বইয়ের একটা সুনির্দিষ্ট জায়গা থাকে প্রতিবছরই। বাঙালির অন্যতম সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এই যে, উৎসব উপলক্ষ্যে তারা নতুন বই প্রকাশ করে নিয়ম করে। পুজোসংখ্যা যার অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ। পুজোসংখ্যার হাত ধরেই আগত পুজোর আভাস পায় আপামর বাঙালি। ছুটির দিনগুলো গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধে দিব্যি কেটে যায়। তবে শুধু পুজোসংখ্যাই নয়, প্রকাশিত হয় অন্যান্য বইও। এমনকি, কিছু কিছু পুজোমণ্ডপ থেকে বিশেষ পত্রিকা বা সংকলন বেরোনোর চলও রয়েছে। বাঙালির এই আবহমান অভ্যাসে মরচে পড়েনি আধুনিক ডিজিটাল যুগেও। বরং, সামাজিক মাধ্যমের হাত ধরে বইয়ের খবর পৌঁছে যাচ্ছে আরও দ্রুত। প্রকাশকরাও আকর্ষণীয় ছাড়ে বই বিক্রি করতে পিছপা হন না এইসময়। এই বছরও তার ব্যতিক্রম নয়, উপরন্তু করোনা পরবর্তী সময়ে বই কেনার চল যেন বেড়েছে। প্রকাশিত হয়েছে দেশ, বর্তমান, আজকাল, দেবভাষা, আনন্দবাজার পত্রিকা, কিশোর ভারতী পুজোসংখ্যা, বঙ্গদর্শন.কম উৎসব সংখ্যা ইত্যাদি।

অনেকটাই সহমত পোষণ করলেন দে’জ পাবলিশিং হাউস-এর কর্ণধার এবং বুকসেলার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স গিল্ড-এর কর্মকর্তা সুধাংশুশেখর দে। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানান, “এখন প্রচুর ছোটোবড়ো প্রকাশনা সংস্থা পুজোসংখ্যা বের করে। তার পরিমাণ উত্তরত্তোর বাড়ছে। প্রচুর লেখক, বিশেষ করে নতুন লেখকেরা লেখার সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁদের লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছচ্ছে। প্রকাশক হিসাবে এটা অত্যন্ত আনন্দের কথা। তবে শুধু পুজোসংখ্যা নয়, পুজোর আগে আগে বা পুজোর সময় অন্য বইও প্রকাশিত হয় প্রচুর পরিমাণে।” পুজো উপলক্ষ্যে দে’জ পাবলিশিং হাউস থেকে দশ-বারোটি বই বেরিয়েছে বা বেরোবে। সত্যপ্রিয় ঘোষের উপন্যাস সমগ্র, শ্রী পারাবতের ‘ঐতিহাসিক কাহিনি সমগ্র’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রচনা সংগ্রহ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প সমগ্রের প্রথম খন্ড তাদের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম। সুধাংশুশেখর আলো ফেললেন বই সংক্রান্ত আরেকটি দিকে। তাঁর কথায়, “এখন সারা বছর প্রচুর বইমেলা হয়। পুজোর আগেও বেশ কিছু ছোটোবড়ো বইমেলা আয়োজিত হয়। মফসসলে, বিভিন্ন আবাসনেও বইমেলা হচ্ছে এখন। মানুষ আগ্রহও দেখাচ্ছেন।”

তবে পুজোসংখ্যায় এত লেখার ভিড়ে কি সাহিত্যের মান খানিকটা হলেও কমে? চিরাচরিত এই বিতর্কে বঙ্গদর্শন.কম–কে বুকসেলার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স গিল্ডের সভাপতি এবং প্রকাশক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর স্পষ্ট উত্তর, “সাহিত্যের গুণ বিচার করবেন পাঠকরা। বেশি পরিমাণ লেখা মানেই ভালো বা খারাপ লেখা, এমনটা বলা যায় না। অনেকে লেখার সুযোগও পান। প্রকাশকরাও তাঁদের কথা জানতে পারেন।” তিনি এবং সুধাংশুশেখর দে, দুজনেই জানালেন যে, এই সময়ে ভিনরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বইমেলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি, হায়দ্রাবাদ-সহ ৭টি বড়ো শহরে এমন বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে বা হচ্ছে। তার অনেকগুলিই গিল্ডের সহায়তায়। ত্রিদিব জানান, “এই সময়টা আসলে পুজোসংখ্যার বাজার। বিশেষত কলকাতার বাঙালিদের কাছে। বরং, প্রবাসী বাঙালিরা এই সময়ে পুজোসংখ্যা ছাড়াও অন্য বই কেনেন। তাঁরা সারা বছরের বইয়ের খিদে যেন এই সময়ে মিটিয়ে নেন।”

তুলনায় নবীন কিন্তু সাড়াজাগানো প্রকাশনা সংস্থা ধানসিড়ি। এই প্রকাশনা সংস্থা বছরের দুটি সময়ে বেশ কিছু নতুন বই প্রকাশ করে। পয়লা বৈশাখ এবং পুজোতে। ২০১৮ সাল থেকেই তাঁরা এই কাজ করে আসছেন। “যেহেতু আমাদের কোনও পুজোসংখ্যা নেই, তাই পাঠকদের কথা মাথায় রেখে আমরা পুজোর সময়টাকে বেছে নিয়েছি। আমাদের ক্যাচলাইন- বঙ্গে পুজো, সঙ্গে বই”, বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন প্রকাশক শুভ বন্দ্যোপাধ্যায়। এবছর তাঁরা যেসব বই প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম- রঞ্জন সেন ও কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত রচিত ‘কলকাতার বিচিত্র পেশা’, সায়ন্তন ঠাকুরের লেখা ‘জঙ্গলের গল্প’, দেবব্রত কর বিশ্বাসের ‘দেওদর্শন’, একরাম আলির ‘চিঠিতে চিঠিতে’ ইত্যাদি। প্রতিটি বইয়েই খুব ভালো সাড়া পাচ্ছেন, জানালেন শুভ।

বইপাড়ার নবীন ও ব্যতিক্রমী প্রকাশনা সংস্থা মান্দাস। তাদের প্রকাশিত ‘পল ক্লি-র ডায়েরি’ (অনুবাদে শুভেন্দু সরকার), জয় গোস্বামীর ‘ঘাতক’, অয়ন চক্রবর্তীর ‘নক্ষত্ররাতের গান’ পাঠকমহলে সাড়া ফেলেছে বেশ কিছুদিন থেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা দশটি বই প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই- দেবহূতি সরকারের কবিতা সংকলন ‘কর্মমঙ্গল’, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি নতুন কবিতার বই, প্রখ্যাত নকশাল গায়ক (‘জনগণের গায়ক’ নামে খ্যাত) প্রয়াত গদরের ‘দেশ আমার, জমি আমার’ (সাংবাদিক দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায় কর্তৃক নেওয়া গদরের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক লেখা, যে বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ) ইত্যাদি। মহালয়ার দিন রামমোহন হলে শারদ বই পার্বণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বইগুলির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশক সুকল্প চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমাদের প্রকাশিত নন-ফিকশনের একটা আলাদা চাহিদা আছে। অফলাইন, অনলাইন, দুভাবেই অর্ডার পাচ্ছি। আমার অভিজ্ঞতা বলে, পুজোর বাজার আসলে বইয়ের বাজারও বটে।”

প্রকাশকরা একটা বিষয়ে মোটামুটি একমত যে, পাঠকদের সাধারণভাবে কোনও বিশেষ পছন্দের জ্যঁরা নেই। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ- সবকিছুই বিকোচ্ছে দেদার। বিভিন্ন বইমেলা, শারদীয়া সংখ্যা, পুজো উপলক্ষ্যে নতুন প্রকাশিত বই আর মণ্ডপের বাইরে বইয়ের স্টল- বেঁচে থাকুক বাঙালির বই-উৎসব। নিশ্চিত করে বলা যায়, এই উৎসবের বিসর্জন হবে না কোনওদিন।

Written by