
পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত বটগাছদের সংরক্ষণের লড়াই চলছে কয়েক বছর ধরে
পিটার উলহেভেন নামের এক গাছপাগল জার্মান ঘুরতেন বনে-বনে। খুঁজতেন পুরোনো গাছ। তাঁর ‘দ্য হিডেন লাইফ অফ ট্রিজ’-এ তিনি লিখেছেন এক আশ্চর্য গল্প। লিখেছেন মরে যাওয়া গাছের গুঁড়িকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখছে আশে-পাশের গাছ। শিকড়ে শিকড়ে তারা সেই বুড়ো গাছকে পাচার করছে জীবনরস। বলছে, ‘থেকে যাও।’ এ যেন প্রাচীনকে রক্ষা করতে চাওয়া নতুনদের।
অনেকটা এমনভাবেই যেন আসল বুড়ো বটগাছকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় তার নতুন মূল। বলা ভালো, ঝুরিরা। বটও যেন চায়, তার উত্তরাধিকার থেকে যাক এই মাটিতে। তাই যেন নেমে আসে ঝুরি। আর, এই বাংলারই কয়েকজন পাগল মিলে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে সেইসব ঝুরিদের। যাতে বেঁচে থাকে বুড়োবট। চলছে বটগাছ-সংরক্ষণ।
তদারকিতে জয়িতা কুণ্ডু
অদ্ভুত গাছ বটে এই বট। বট মানে তো নিছক একটা গাছ নয়, বটগাছ আসলে ঐতিহ্য। কত্তো কত্তোদিনের ইতিহাস এর সঙ্গে লেপ্টে। গ্রামের মধ্যিখানে একটা বুড়ো বটগাছ। সেই কবে থেকে আছে। ঠাকুরদার ঠাকুরদাও নাকি দেখে গেছে এই গাছ। এরই তলায় গ্রামবুড়োদের জটলা, গণমান্যদের সঙ্গে বৈঠক। পরব বা উৎসবের দিন এই গাছতলাতেই বসে আসর। কবেকার এই প্রথা। গাছকে ঘিরেই বসে মঙ্গলচণ্ডীর মেলা। পাশের গ্রামে বটগাছের নিচেই পীরের মাজার। বটগাছকে বেড় দিয়ে মানতের সুতো বেঁধেছে কত্ত মানুষ। প্রবাদ, এই গ্রামের বটগাছেই নাকি থাকে বেহ্মদত্যি। গায়ে পৈতে—বুড়ি ঠাম্মা নাকি প্রায়ই দেখে। সন্ধের সময় গাছের মাথায় হাজারো পাখির ডাক, গাছের কোটরে কাঠবেড়ালি, বেঁজি। আর, গরমের দুপুরে এই গাছের তলায় মাদুর বিছিয়ে ঘুম। আহ, শান্তি।

অথচ, চারপাশে হুহু করে যখন গাছ কমছে, তখন সেই হারানোর পথের শরিক হয়েছে বটেরাও। ইমারত উঠবে কিংবা চওড়া হবে রাস্তা। অতএব, কাটা পড়ল গাছ। হয়তো তিনশো বছর বয়স হয়েছে তার। তাতে কী! যেসব গাছের নিচে থান বা মন্দির বা সেগুলো রাস্তার ধারে নয় ঠিক—সেগুলো হয়তো বেঁচে গেল। কিন্তু সে বাঁচাও সুখের নয়। গাছের নিচে বাঁধিয়ে দেওয়া হল গোল বেদী। ঝুড়ি আর মাটিতে নামেই না। গাছের গায়েই পেরেক পুঁতে টাঙানো হল কখনও সাইনবোর্ড, কখনও দড়ি। ইচ্ছেমতো ছাড়িয়ে নেওয়া হল গাছের ছাল। ঝুরি টেনে ছিঁড়ে ফেলা, ডালপালা কাটা তো লেগেই আছে। এতসব অত্যাচারে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়তে শুরু করল গাছটাও। অথচ, বট ভারতের জাতীয় গাছ। অবহেলার বহর দেখে সেই কথা মনেই হবে না।

অতএব, কত্তগুলো পাগল মিলে ঠিক করল বটগাছ বাঁচাবে। বাঁচানো মানে সংরক্ষণ। বট যে ঝুরি নামায়, তা মাটিতে পৌঁছোবার আগেই নষ্ট হয়ে যায় অনেকসময়। ছেলে-ছোকরার দল সেই ঝুরি ধরে দোল খায়, টেনে ছিঁড়েও নেয় অনেকে। এইভাবে অনেক ঝুরিই আর মাটিতে নামে না। তারপর, একসময় ধীরে ধীরে যখন মূল গাছটা বুড়োটে হয়ে মরতে বসে, তখন আর তাকে চারপাশ থেকে সাহায্য করতে পারে না এইসব স্তম্ভমূলেরা। অথচ ঝুরিদের বাঁচালেই, তাদের ঠিকমতো মাটিতে প্রবেশ করার সুযোগ দিলেই বটগাছের আয়ু বেড়ে যায় বিপুল। এমনিতেই গড়ে প্রায় চারশো বছর বাঁচে যে বটগাছ, সেই গাছকেই তখন বাঁচিয়ে রাখা যায় অন্তত আটশো-নশো বছর।

বটগাছ সংরক্ষণের ইচ্ছে নিয়েই উলুবেড়িয়ার মহিষরেখা অঞ্চলের মাধবপুরে ২০১৫ সালে গড়ে উঠল ‘মাধবপুর পরিবেশ চেতনা সমিতি’। সালটা ২০১৫। মূল উদ্যোক্তা জয়িতা কুণ্ডু। বটগাছ সংরক্ষণের উদ্যোগ অবশ্য শুরু হয়েছে আরও আগেই। হঠাৎ এমন ইচ্ছে কেন? জয়িতা বলছিলেন, “বটগাছ সংরক্ষণ মানে তো শুধু গাছ-সংরক্ষণ নয়। এই গাছের কোটরে বাসা বাঁধে অনেক সাপ, আশ্রয় পায় বেঁজি, অনেক অনেক পাখি বটফল খেয়ে বেঁচে থাকে। তাছাড়া, বটগাছকে বলা হয় প্রাকৃতিক এয়ারকন্ডিশন। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ক্ষেত্রে বট যেন সত্যিই আশ্রয়ের মতো।” শিল্পী তপন কর শিবপুরের বোটানিকাল গার্ডেনে দেখেছিলেন বাঁশ ছিড়ে তা দিয়ে ঝুরিদের ঘিরে দিয়ে বট-সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া। বোটানিকাল গার্ডেনের বিখ্যাত বটগাছটি এইভাবেই সংরক্ষিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
যে নদীকে জয় করা যেত না একদিন
এই পদ্ধতিতেই প্রথমে মহিষরেখা রেলব্রিজের কাছে বিখ্যাত বটগাছটি সংরক্ষণের কথা ভেবেছিলেন তপনবাবু ও জয়িতা। গাছটির তলায় পিকনিক করতে আসেন অনেকে। কিন্তু, অযত্নে, অবহেলায়, অত্যাচারে গাছটির অবস্থা বেশ খারাপ। এই কাজটা করতে গিয়েই জন্ম মাধবপুর পরিবেশ চেতনা সমিতির। এবং, জয়িতার মাথায় বট-সংরক্ষণের নেশা চেপে বসে তখন থেকেই। একটা সাফল্য লোভও বাড়িয়ে দেয়। মনে হয়, এভাবে এলাকার নানা বটগাছ সংরক্ষণ করলে কেমন হয়? বিশেষ করে দামোদর নদের পার্শ্ববর্তী বটগুলো! বট তো নদীপাড়ের ভূমিক্ষয়ও রোধ করে অনেকটাই। ততদিনে অনেকে যুক্তও হয়েছেন এই কাজের সঙ্গে। বটগাছ-সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে পুরোদমে। জয়িতা নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে লিখতে শুরু করেন, কোথাও যদি ক্ষতিগ্রস্ত বা খুব পুরোনো বটগাছের সন্ধান জানা থাকে, তাহলে যেন তাঁদের খবর দেওয়া হয়। এইভাবেই বাড়তে থাকে সংরক্ষণের উদ্যোগের পরিধি।

এই কাজ যদিও সহজ নয় মটেই। সংরক্ষণের কাজে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দুই-ই দরকার। প্রথমেই দেখতে হয়, গাছটির বাড়ার পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিনা। তারপর, বাঁশ ফালি করে, বাঁশের ভিতরের গাঁটগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে নতুন ঝুরির সঙ্গে সেগুলোকে তার দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। যাতে ঐ ছোটো ছোটো ঝুড়িগুলো স্তম্ভমূল গঠন করতে পারে। প্রায় একবছর পরে ঝুরিগুলো বেড়ে যখন প্রায় মাটি অবধি পৌঁছে যায়, তখন সরিয়ে নেওয়া হয় বাঁশের কাঠামোগুলো। বাঁশ দিয়ে ঘিরলে পর্যাপ্ত জল-বাতাস পায় ঝুরিগুলো। এর ফলে, আসল গাছটা মারা গেলেও স্তম্ভমূলগুলো বেঁচে থাকবে।

তবে, যে কোনও ঝুরিকে ঘিরে দিলেই চলবে না। খুঁজতে হয় তাজা, নতুন ঝুরি। তার আগে বুঝতে হয় গাছটা কতগুলো ঝুড়ির স্তম্ভমূল গঠনের ভার বহন করতে পারবে। একদম কচি ঝুরি হলেও চলবে না। সামান্য কদিনের পুরোনো হতে হবে। একদম মোক্ষম সময়ে ঝুরিকে ঘিরতে হবে। তাহলেই তা নেমে আসবে মাটিতে। এগুলো বোঝার জন্য জহুরির চোখ চাই, গাছের ভিতরের গল্প শুনতে পারার কান চাই। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাধবপুর পরিবেশ চেতনা সমিতির সদস্যরা দিনের পর দিন ধরে এই কাজ করে চলেছেন। অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে জানা নেই—তাও মুমূর্ষু গাছের সন্ধান পেয়ে ছুটে গেছেন সক্কলে। স্থানীয় মানুষদের সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন তাঁদেরও জড়িয়ে নিতে এই সংরক্ষণের উদ্যোগে। এইভাবে, চলছে বটগাছদের বাঁচিয়ে রাখার কাজ।

শুধু ঝুরি সংরক্ষণই নয়, জয়িতা দীর্ঘদিন ধরেই আওয়াজ তুলছেন গাছে পেরেক মারার বিরুদ্ধেও। পেরেক মারলে পচন ধরে গাছের শরীরে। এই কাজ যে আসলে আইনবিরুদ্ধ—তা মনে করিয়ে দিয়ে সরব হয়েছেন বারবার। এমনকি, বোটানিকাল গার্ডেনেও এমনটা ঘটেছে দেখে প্রতিবাদ করে চিঠি লিখেছেন। পঞ্চায়েত ভোটের আগে ঘুরে ঘুরে প্রচার করেছেন। গাছ থেকে খুলে দিয়েছেন সব পেরেক। জয়িতা বলছিলেন, “গাছের গুঁড়ি বাঁধিয়ে দেওয়াও অন্যায়। এতে আসলে গাছকে বেঁধে ফেলা হয়। তাছাড়া গাছের কোটরে বাসা বাঁধে যেসব সাপ, বেঁজি—বাসা কেড়ে নেওয়া হয় তাদের।” বলছিলেন, এই কাজে হাজারো প্রতিকূলতার কথা। কিন্তু, তারপরেও অনেকে মিলে লড়ে যাচ্ছেন রোজ। ছুটে যাচ্ছেন বিভিন্ন জায়গায়। বটগাছ বাঁচিয়ে রাখা মানে তো বাঁচিয়ে রাখা পাখি, সাপ, পোকা, বেঁজিদেরও। এই কাজের নেশা ছড়িয়ে পড়ছে অন্যত্রও। দেরিতে হলেও তৈরি হচ্ছে একটা কমিউনিটি। যারা বটগাছকে, বটগাছের সঙ্গে জুড়ে থাকা ইতিহাস, জীববৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে তৎপর।
এমন পাগলামোর নেশা আরও ছড়িয়ে পড়ুক বাতাসে-বাতাসে। বেঁচে থাকুক বটগাছেরা। আশ্রয় হয়ে।
