
গত ১২ মার্চ শহরের বুকে প্রথমবার আয়োজিত হল মহিলাদের শাড়ি দৌড়
বিদেশে নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৬০ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য ঠাকুরবাড়ির এই সন্তান বিলেত গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি নিজের স্ত্রীকে ব্যক্ত করেছিলেন, “এখানকার জনসমাজের যাহা কিছু সৌভাগ্য, যাহা কিছু উন্নতি, যাহা কিছু সাধু, সুন্দর, প্রশংসনীয় – স্ত্রীলোকদের সৌভাগ্যই তাহার মূল। আমাদের দেশে এরূপ সৌভাগ্য কবে হইবে?” সত্যেন্দ্রনাথের সেই চিন্তার আলোতেই পরবর্তীতে আলোকিত হয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনীদেবী। এবার ফিরে আসি এই শতকে। নারী এখন নিজের সৌভাগ্য নিজেই রচনা করার অধিকার পেয়েছে। তাও কিছু প্রশ্ন ওঠে।
“চিরকালই সমাজ মেয়েদের পায়ে বেড়ি পরিয়েছে। সেটা কখনও রক্ষণশীলতা বা কখনও আচার-আচরণের নামে, কখনও বা পোশাকের নামে। একসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে বউ মাথায় এক গলা ঘোমটা দিয়ে বাইরে বেরোতেন। সভ্যতার এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের বেড়ি অনেক ভেঙেছে। এখনও পোশাকের ব্যাপার বলতে নারীর নিজস্ব মতামত নেই অনেক পরিবারে। শাড়িই অগ্রগণ্য।” বঙ্গদর্শন.কম-কে এমনই বলছিলেন কলকাতার সুদক্ষিণা চোপড়া। পেশায় ফিন্যান্স কনসালটেন্ট সুদক্ষিণা শরীরচর্চার ব্যাপারে সচেতন। শরীরচর্চার প্রয়োজনে তিনি যে কোনো পোশাকে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু বাকিরা? সংসারের চার দেওয়ালের বাইরে মেয়েদের আলাদা পরিচয় কোথায়? ট্র্যাক স্যুটের মতো পোশাকে কতজন শরীরচর্চা করতে বাইরে আসতে পারেন? পুরুষরাই কি চান যে নারীরা নিজেদের ফিটনেসে মন দিতে এগিয়ে আসুক?
প্রায় সাড়ে চার হাজার ভারতীয় মহিলা শাড়ি পরে সাতসকালে কলকাতার সল্টলেকে বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের কাছে হাজির হয়েছিলেন। রবিবার ১২ মার্চ কলকাতায় প্রথমবার আয়োজিত হল শাড়ি দৌড়।

সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সুদক্ষিণার মতো প্রায় সাড়ে চার হাজার ভারতীয় মহিলা শাড়ি পরে সাতসকালে কলকাতার সল্টলেকে বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের কাছে হাজির হয়েছিলেন। রবিবার ১২ মার্চ কলকাতায় প্রথমবার আয়োজিত হল শাড়ি দৌড়।
কী এই শাড়ি দৌড়? প্রশ্নটা করেছিলেন সুদক্ষিণাই। উত্তর দিলেন তিনিই। “বলুন তো, আজকের মহিলারা সংসার সামলে অফিসের হুকুম তামিল করে নিজের দিকে তাকাতে পারেন কি? মহিলারা তাদের ফিটনেস নিয়ে আদৌ ভাবেন কি? এসব প্রশ্ন নিজেকেই করেছেন একালের নারীরা। তাই তো প্রথমবারের ইভেন্টে আমরা এত সাড়া পেয়েছি।”

বাস্তবিকই সংসারের হাজারো কাজে ব্যস্ত মহিলাদের কেবল নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার সময় থাকে না। অথচ তাঁদের ভালো থাকাটা দরকার ভীষণভাবে। নিয়ম মেনে যোগাসন তো দূরের কথা, অনেকে মর্নিং ওয়াকে যেতে পর্যন্ত পারেন না। সেই বিষয়েই সচেতনতা জাগাতে আয়োজন করা হয়েছিল শাড়ি দৌড়ের। যে কোনো বয়সী মহিলাই এই দৌড়ে অংশ নিতে পারবেন। শর্ত একটাই, মহিলাদের পুরোদস্তুর শাড়ি পরেই দৌড়তে হবে। একইসঙ্গে ফিটনেসের বার্তা আর ট্যাবু ভাঙার চেষ্টা। ফিটনেস বজায় রাখতে সংসারের রক্ষণশীলতা কোনোমতেই বাধা হতে পারে না। আমাদের সমাজে এই শাড়ি পরেই মহিলারা বছরের পর বছর জীবন কাটিয়েছেন। কোনো কাজই অসাধ্য ছিল না। ধর্ম জাতি নির্বিশেষে কর্মরতা থেকে গৃহিণীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতেই ১২ মার্চ শাড়ি দৌড়ে মহিলাদের শাড়ি পরাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কেউ পরেছিলেন আটপৌরে বাঙালি শাড়ি, তো কেউ করেছিলেন মারাঠি স্টাইলে শাড়ি। কেউবা আবার হিজাব আর শাড়ি দুটোই পরেছিলেন।

সুদক্ষিণা বলেন, “পুরস্কার মূল্য ছিল না বটে। কিন্তু কোনো অংশেই প্রথামাফিক দৌড়ের চেয়ে কম ছিল না। আসলে ৮ মার্চের মতো এটাও ছিল এক নারীদিবস উদযাপন।”
আয়োজক সংস্থা ছিল একটি ফিটনেস ট্রেনিং সংগঠন। ব্যাঙ্গালোরের জেজে অ্যাকটিভ। তাঁরা ব্যাঙ্গালোরে সাত বছর সফলভাবে এই দৌড়ের আয়োজন করে আসছেন। তবে কলকাতায় এই আয়োজন প্রথমবার। আয়োজকরা জানিয়েছেন, যারা প্রথামাফিক দৌড়ে এখন আর অংশগ্রহণ করতে পারেন না, তাদের পাশাপাশি প্রথমবার দৌড়াচ্ছেন এমন অনেকেও দৌড়েছেন।
আজকের মহিলারা সংসার সামলে অফিসের হুকুম তামিল করে নিজের দিকে তাকাতে পারেন কি? মহিলারা তাদের ফিটনেস নিয়ে আদৌ ভাবেন কি? এসব প্রশ্ন নিজেকেই করেছেন একালের নারীরা।
শাড়ি পরে তিন কিলোমিটার অথবা পাঁচ কিলোমিটার দৌড়াতে হবে সঠিক নিয়মে। তাতেই মিলেছে সাড়া। বয়স্কদের পাশাপাশি ছোটোরাও শাড়ি পরে মায়ের সঙ্গে দৌড়েছে। সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে আত্রেয়ী সরস্বতী পুজোর সকালের মতো ভোর ভোর উঠে পড়ে লাল হলুদ শাড়িতে সেজে নিয়েছে। পায়ে তার দৌড়ের জুতো। এই দৌড় রীতিমতো উপভোগ করেছে তার মায়ের সঙ্গে।

সুদক্ষিণার সঙ্গে তাঁর ৮২ বছরের শাশুড়ি গায়ত্রী চোপড়া, নিজেও এই দৌড়ে অংশ নিয়েছিলেন। আবার পরিবারের অনেকে মিলে দৌড়েছেন। যেমন স্বাগতা গোস্বামী, দীপান্বিতা গোস্বামী আর প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জী, সম্পর্কে মা-মেয়ে বোনঝি। ফেসবুকের পাতায় সেসবের প্রমাণ তাঁরা ধরেও রেখেছেন। দৌড়ে অংশগ্রহণকারী মনীষা ধর বলেন, “এটা আমার কাছে নারী ক্ষমতায়ন। মেয়েরা যে নিজের শরীর এবং সংস্কৃতি দুটোই বহন করতে পারে, নিজের যোগ্যতাতেই। তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ।”
যারা মনে করেন, শাড়ি শুধু ঘরের কাজের জন্যই উপযুক্ত। তাদেরকে ভুল প্রমাণ করে এখানে হাজির হয়েছিলেন ৬৫ বছরের এম কোকিলা সুধা। পেশায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এই নারী ইতিমধ্যে তেনজিং নোরগে পুরস্কার জিতেছেন দীর্ঘ ট্রেকিং-এর সুবাদে। তাঁর মতে, “মহিলারা নিজেদের সুস্থ রাখতে পারলে তবেই গোটা পরিবার মসৃণ ভাবে চলতে পারে। নিজেকে ঠিক রাখার কাজটি শাড়ি পরেও করা যায়।”
