
এই উৎসব যতটা না রাধা-কৃষ্ণের ছিল, ততটা ছিল ছোটোদের
ছোটো ছোটো দু’হাতে কাদা। চোখে মুখে আনন্দ। আনন্দ, সব ভুলে রূপকথাকে নিজের হাতে গড়বার—মাটির পুতুল গড়বার। শুধু কি মাটির পুতুল, গল্প সত্যি করতে হলে ক্যারেক্টারের সঙ্গে মানানসই পরিবেশ চাই তো! গাছপালা চাই, জঙ্গল চাই, মাঠ চাই, পাহাড় চাই। আগে থেকে সব প্ল্যান করা থাকত। আশপাশ থেকে ভেঙে আনা ডালপালা দিয়ে গড়ে উঠত জঙ্গল, মাঠ- জমে থাকা শ্যাওলা, পাহাড়- কাগজ কেটে রঙ করে অথবা পুরোনো কাপড়ে কাদা মাখিয়ে লাঠীর উপর চাপিয়ে। পাউডার দিয়ে পাহাড়ের মাথায় বরফ। কাঠের স্কেল বা ডাঁশা দিয়ে মাপ করে বালি বা মাটি দিয়ে রাস্তা। জঙ্গলের ফাঁকফোকর থেকে উঁকি দিত টিয়া পাখি, বাঘ, সিংহ, হরিণ, রূপকথার অন্যান্য চরিত্ররা। সবই মাটির। সব পুতুল দিন কে দিন বানানো হতো এমনটা নয়, কোনো কোনোটা আবার বিশেষ দিনকে মাথায় রেখে আগেভাগে মেলা থেকে কিনে রাখা হতো। দশ-পনেরো বছর, তারও আগে ঝুলন উৎসব যতটা না রাধা-কৃষ্ণের ছিল, ততটা ছিল ছোটোদের। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আড়ম্বর নয়, ছোটোদের খেয়ালখুশি দুলতো ঝুলনের দোলনায়।

শ্রাবণ মাসে একাদশী থেকে পূর্ণিমা, এই পাঁচদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয় বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব ঝুলন উৎসব। মূলত বৈষ্ণবদের প্রথাগত অনুষ্ঠান হলেও সকল সম্প্রদায়ের মধ্যেই এর প্রচলন আছে । ঝুলনে সংস্কৃত নাম ‘হিন্দোল’ । মথুরা-বৃন্দাবনের মতোই বাংলার ঝুলন উৎসবের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। এটি দোল পূর্ণিমার পরবর্তী বৈষ্ণবদের আর একটি বড়ো উৎসব।
“অনুগ্রহায় ভূতানাং মানুষং দেহমাশ্রিতঃ।
ভজতে তাদৃশীঃ ক্রীড়াঃ যাঃ শ্রুত্বা তৎপরো ভবেৎ।।”
শাস্ত্রমতে, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্ত অভক্ত নির্বিশেষে সকলকে অনুগ্রহ করবার জন্য গোলকধাম থেকে ভূলোকে এসে লীলা করেন। ছড়িয়ে দেন প্রেমের ওম। তবে, শুধুমাত্র রাধাকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ দোলনায় স্থাপন করে হরেক আচার অনুষ্ঠান উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। আগে ঠাকুর দেবতা ছাড়াও বর্তমান সমাজ, বন জঙ্গল পশু পাখিতেও সাজানো হতো ঝুলনে। তখনকার মৃৎশিল্পীরা এই ঝুলন সাজানোর জন্য নানা ধরণের মূর্তি বানাতেন। কোথাও কোথাও রীতি ছিল ঝুলনযাত্রা শেষ দিন রাধাকৃষ্ণকে দোলনায় বসিয়ে, নাম কীর্তন করে, বাড়ি বাড়ি পরিক্রমা করা। তবে এখন সে সব অতীত। আজকাল কিছু বিশেষ জায়গা ছাড়া ঝুলন সাজানো হয় না কোথাও, আর ছোটোদের ঝুলন তো বহুদিনই বেপাত্তা। এখনকার শৈশব জানেই না ঝুলন কী!
এ কথাও বলতে হয় যে, তখনকার সময়ে ছোটোদের আনন্দ ছাড়াও ঝুলনের অন্য তাৎপর্য ছিল। শ্রীকৃষ্ণ নাকি কদম গাছে ঝোলানো দোলনায় পাশাপাশি বসে শ্রীরাধাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন। তাই ঝুলন প্রেমের উৎসব । এ প্রসঙ্গে এখনও অনেকের মনে পড়ে যাবে শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্রর দ্বৈত কণ্ঠে “দেয়া নেয়া” ছবির সেই বিখ্যাত গান :
“দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা
দোলে কৃষ্ণ দোলে ঝুলনা
দোলে রাই (দোলে) ঝুলনা
দোলে দোদুল নাই তুলনা।।
রাধারও অধরে জাগে হাসি
কহিছে ডেকে শ্যামেরই বাঁশি
এ লগন রাই ভুলনা।।“
রাধা-কৃষ্ণের ঝুলন যাত্রা শুধু বৈষ্ণব কবিদেরই নয় বাংলার কাব্য-সাহিত্যকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। “ঝুলন” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ
“… মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
বসিব দুজনে বড় কাছাকাছি,
ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা ;
আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা
নিশীথবেলা ।। …”
আসলে যে কোনো উৎসবের মতোই ঝুলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিখাত আনন্দ, নির্ভেজাল প্রেম, যা আচার-বিচারের জটিলতার ঊর্দ্ধে। সেদিক থেকে ঝুলন হারিয়ে গিয়েও লোক উৎসবের আঙিনায় সগৌরবে নিজের স্থান করে নিয়ে আছে বৈ কি!
