ষোড়শ শতাব্দীতে দু’জন বাঙালি কবির সংস্কৃত কাব্যে বাঙলার খাবার
“যখন খাইতে পাওয়া যায় না, তখনই খাবারের কথা বেশি করিয়া মনে হয়। আজ বাস্তবরাজ্যে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করা অনেকের পক্ষেই দুঃসাধ্য, ও কাহারো কাহারো পক্ষে অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছে। তাই, আজ সাহিত্যের মধ্যেও মন খাবারের খোঁজ করিতেছে।”
আজ থেকে কুড়ি-বাইশ বছর আগে, হুবহু এই কথাটাই ‘সংস্কৃত কাব্যে বাংলার খাবার’ প্রবন্ধের শুরুতে লিখেছিলেন বিমানবিহারী মজুমদার। কী আশ্চর্য! অতিমারীর এই দুঃসময়ে, সাহিত্যের মধ্যে আমাদের মনও খাবারের খোঁজ করে চলেছে। কবি কালিদাস বলেছেন ‘আশ্বাস : পিশাচো হপি ভোজনেন’। অর্থাৎ পিশাচকেও ভোজন দ্বারা বাগে আনা যায়। কথাটার মধ্যে যে রস রয়েছে, তা হাসিরও, ভাবনারও। না, কোনও রাশভারী আলোচনা নয়, এই লেখা 'ষোড়শ শতাব্দীর সংস্কৃত কাব্যে বাংলার খাবার' প্রসঙ্গে।
খ্রীস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে দুজন বাঙালি কবি সংস্কৃত কাব্য লিখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম পরমানন্দ সেন কবিকর্ণপূর। এই কবির বাড়ি ছিল কাঞ্চনপল্লীতে, বর্তমানে যার নাম কাঁচড়াপাড়া। কথিত আছে, কবিকর্ণপূর শ্রী চৈতন্যের কৃপালাভ করে সাত বছর বয়সেই সংস্কৃত শ্লোক লিখে মহাপ্রভুকে উপহার দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর লেখা ‘শ্রীশ্রীকৃষ্ণাহ্নিক-কৌমুদী’ নামক কাব্যটি বাংলায় অনুবাদ করেন নবদ্বীপের হরিবোল কুটিরের হরিদাস বাবাজী। সেই কাব্যেরই দ্বিতীয় সর্গে ৮৫ থেকে ১১৮ শ্লোকে বসন্ততিলক ও পুষ্পিতাগ্রা বৃত্তছন্দে শ্রীরাধার রান্নার একটি লোভনীয় বর্ণনা পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দীর অপর যে বাঙালি কবির সংস্কৃত কাব্যে সমসাময়িক বাঙালি খাবারের বর্ণনা মেলে, তিনি হলেন ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’-লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজ। চরিতামৃত লেখার আগেই তিনি লিখেছিলেন ‘গোবিন্দলীলামৃত’ নামে সংস্কৃত কাব্য। সেই কাব্যেরই তৃতীয় সর্গের ৮৫ থেকে ১১০ শ্লোকে নানারকম খাবারের পাকপ্রণালী রয়েছে। এই দুই কবির কাব্য থেকেই ষোড়শ শতাব্দীর বাঙালির ভোজনবিলাসের পরিচয় দেবো।
প্রথমেই বলি, শাকের কথা। কবিকর্ণপূর বাস্তুক (বাথুয়া বা বেতো), মারিষ (নটে), নতির পাতা (পটল শাক), কলায়বল্লী শিখা (কলায়লতার শাক), বিতুন্ন (সুষনি), শতপুষ্পী (মেথি শাক), চনকাগ্র শিখা (ছোলার শাকের কচি ডগা), তুম্বীশিখা (কোমল লাউডগা) এবং পুদিনা শাকের উল্লেখ করেছেন। এই শাকগুলি শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণের জন্য ভালো করে সরষের তেলে ভাজতেন। পুদিনার শাক ভাজলে কেমন খেতে লাগে তা জানা নেই তবে, পুদিনার চাটনি বা শরবত কেমন লাগে তা আমরা জানি। কৃষ্ণদাস কবিরাজ আবার শাক রান্নার ‘টোটকা’-রেসিপিও বলে দিয়েছিলেন ‘গোবিন্দলীলামৃত’তে। পাকা তেঁতুলের রস দিয়ে কলমি শাক এবং কাঁচা আম দিয়ে নালিতা পাতার রস নাকি বেশি রুচিপ্রদ। এই দুই কবির তালিকায় পাওয়া যায়নি পালং, মূলো শাক ও পুঁইশাকের নাম।
বার্তাকু সূরণক মানক কর্করোথৈ
রম্ভামুঘোত্থ কণিশৈঃ কচুভিঃ পটোলৈঃ।
কুষ্মাণ্ডকৈর্লবলবৈঃ শিতসূচিরাজী
বেধেন নীরসতমৈর্বিবিধাহস ভাজী।।
হেহেহে…এখন এই সংস্কৃত শ্লোক আউড়ে রান্না করতে হলে আগেই তো দাঁত ভাঙবে, খাওয়া তখন লাটে! কিন্তু, কবিকর্ণপূর এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন ‘ভাজা’র। উল্লিখিত শ্লোকটির অর্থ এই যে, বার্তাকু (বেগুন), সূরণক (ওল), মানক (মান), কর্করোথৈ (কাঁকরোল), রম্ভামুঘোত্থ কণিশৈঃ (গর্ভমোচার কলাগুলি), কচুভিঃ (কচু), পটোলৈঃ (পটল) ও কুষ্মাণ্ড (কুমড়ো) সূক্ষ্ম সূচীসমূহ দ্বারা বিদ্ধ করে অর্থাৎ ঝাঁঝরি দিয়ে কুরিয়ে রস বের করে তারপর তা ছাঁকা তেলে ভাজা। কৃষ্ণদাস কবিরাজ আবার কতগুলো বেসন ভাজার বর্ণনা দিয়েছিলেন। গর্ভমোচার ও থোড়ের কোমল আগা, মানকচুর আগা, আলু, কুষ্মাণ্ড বা ডিঙিস (ঢ্যাঁড়শ) গোল গোল করে কেটে ডালের বেসনে চুবিয়ে ভাজা।
কবিকর্ণপূর অনেক রকমের তরকারি রান্নার প্রণালী বর্ণনা করেছেন। যথা- ভালো কাসুন্দি, আদা-বাটা ও নারকেল-বাটা দিয়ে কাঁঠালের দানার দুরকম ব্যঞ্জন। কুষ্মাণ্ড, আলু, কচু, মূলা, মান প্রভৃতি দিয়ে ভালো ভালো তরকারি। ভালো কাসুন্দি ও আদা-বাটা দিয়ে নতিপাতা মেখে গরম সরষের তেলে নেড়েচেড়ে রান্না।
যস্মিন প্রতপ্ত-কটু তৈল্যা-তিক্তপত্রীঃ।
সৎকাসমর্দদলিতার্দ্রক-সাধুমৈত্রীঃ।।
ডালের মধ্যে নারকেল ও মূলোর পুরু পুরু টুকরো দিয়ে প্রচুর ঘি, হিং, আদাবাটা ও গুড় সহযোগে ‘মাসসূপ’ নামে একপ্রকার রান্না হত। আবার, মোচার ভিতরের শস্যগুলিকে পরিষ্কার করে কুটে তাতে দুধ, হিং ও মরিচ দিয়ে ‘মরিচাঘ্য’ বানানো হত। দুধলাউ তৈরির উপায় সম্বন্ধে কবি লিখেছিলেন-
সৌস্মেণ জীরক-নিভং পরিকৃত্য তুম্বীং
সিদ্ধাঞ্জকেন পয়সা চ নিধায় কম্বীম।
আলোড্য দত্তঘনসারমপাচি দুগ্ধাহ-
লাবুঃ সিতামরিচ জীরকহিঙ্গুমুগ্ধাঃ।।
লাউকে জিরের দানার মত ঝিরিঝিরি করে কেটে, জল ও দুধে সিদ্ধ করে হাতা দিয়ে বারবার নেড়ে কর্পূর, চিনি, মরিচ, জিরা, হিং প্রভৃতি দিয়ে দুধলাউ তৈরি করা। তবে কবিরাজ গোস্বামী হিং দিতে কিন্তু বলেননি। এটার নাম তিনি দিয়েছিলেন- দুগ্ধতুম্বী ( তুম্বী= লাউ)।
আরও পড়ুন: সাহেবদের মুগ্ধ চোখে সেকালের পালকি, বেহারা
অম্বলের কথা আর কী বলি…কবিকর্ণপূর তিনরকম অম্বলের কথা বলেছেন, ঈষদম্ল( অল্প টক), মধুরাম্ল ( মিষ্টি টক), মধ্যাম্ল ( মাঝামাঝি টক)। পাকা কুমড়ো টুকরো করে কেটে সরষের তেলে ভেজে ঘোল, আদা, মৌরি ও হিং দিয়ে ছানা ও বড়ার সঙ্গে মিশেয়ে বানানো হত কোমল অম্বল। কবিরাজ গোস্বামী আবার বারো রকমের অম্লের কথা বলেছিলেন।
ভাজা-ঝাল-ঝোল-অম্বলের পর নিয়মমতো শেষ পাতে একটু মিষ্টান্ন হবে না, তাও কি হয়! শ্রীকৃষ্ণর গোঁসা হলে সামলাবে কে! শ্রীরাধাই সেসব কলকাঠি জানতেন। এবার পালা পিঠে, পুলি, পায়েসের। দুই কাব্যেই তার বর্ণনা রয়েছে। কবিকর্ণপূর যে পিঠেগুলির বর্ণনা দিয়েছিলেন সেগুলি হল- হংসকেলি, শোভারিকা, বেণী, চন্দ্রকান্তি, ললিতা। এখন আমরা যে মিষ্টি খাই, চারশ বছর আগেও সেগুলির কিছু কিছু অস্তিত্ব ছিল।
জীলাবিকা মউহরি পুরু পূপগূজা
নাড়ীচয়াঃ কৃত সরস্বতিকাদি পূজাঃ।
খর্চুরদাড়িমক শর্করপালমুক্তা
লাড্ডুৎকরান্ বিধতি রেহত কলাভিযুক্তাঃ।।
জীলাবিকা হল জিলিপি, পুরু হল পুরী ( আটার তৈরী), গূজা হল গজা/গুজিয়া, খর্চুর হল খইচুর, দাড়িমক কি জিনিস উদ্ধার করা যায়নি। কবিরাজ গোস্বামী আবার বলেছেন, শ্রীরাধা যে কর্পূরকেলি ও অমৃতকেলি পিঠে বানাতেন তার রেসিপি নাকি তাঁর সখীরাও জানতেন না।
কোনও রাশভারী আলোচনা নয়, এই লেখা 'ষোড়শ শতাব্দীর সংস্কৃত কাব্যে বাংলার খাবার' প্রসঙ্গে, শুরুতেই বলেছিলাম এ কথা। আমাদের বাংলায় তরি-তরকারি, মিষ্টির যে কদর ষোড়শ শতাব্দীতে ছিল, তার বিবর্তন হয়েছে তবে, একেবারে বিলীন হয়নি এখনও।
সূত্রঃ
সংস্কৃত কাব্যে বাংলার খাবার : বিমানবিহারী মুখোপাধ্যায় (উদ্বোধন : শতাব্দীজয়ন্তী নির্বাচিত সঙ্কলন)