
২০২২ সালে মুক্তি পেয়েছিল বাংলা ছবি মহিষাসুরমর্দিনী
ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ, কলকাতায় রঞ্জন ঘোষের মহিষাসুরমর্দিনী
মাতৃরূপেণ সংস্থিতা। প্রত্যেক নারীর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এই মায়ের বন্ধন। তবু কেন আজও নারীদের সম্মান ভূলুণ্ঠিত? খবরের কাগজের পাতা ওলটালেই কেন মেয়েদের ওপর নানান অত্যাচারের ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কারুর কাছেই নেই। তবু আমরা আশায় বুক বাঁধি। যে যার নিজেদের মতো করে ভেতরের ক্ষোভকে সমাজের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। ছবিতে গানে নাচে সিনেমায় থিয়েটারের মাধ্যমে প্রকাশ পায় আমাদের ভেতরের প্রতিবাদী মন। কোভিডের তিনটে ঢেউ পেরিয়ে যখন আমরা মানসিক ভাবে ক্লান্ত, পরিচালক রঞ্জন ঘোষ এবং তার টিম তৈরি করলেন এক ভিন্নধারার ছবি। ‘মহিষাসুরমর্দিনী, এ নাইট টু রিমেম্বার’। কেন ভিন্নধারার ছবি? একটিমাত্র লোকেশনে শ্যুট করা একটি রাতের গল্প। এবং সেটাও আবার থিয়েটারের আঙ্গিকে। ২০২২ সালে মুক্তি পেয়েছিল বাংলা সিনেমা মহিষাসুরমর্দিনী। আর গত বছরেই কলকাতার দুর্গাপুজোকে হেরিটেজ তকমা দিল UNESCO। ছবিতে মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
আইআইটি মুম্বাই-এ পরিচালক রঞ্জন ঘোষ
পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্নাতকের পর, কয়েক বছর মার্চেন্ট নেভির চাকরি করেছেন পরিচালক। কিন্তু স্কুলজীবন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন সিনেমা বানাবেন। সেই স্বপ্নকে জয় করতেই জীবনের চেনা ছক ভেঙে বেরিয়ে এলেন তিনি। আজ থেকে নয় বছর আগে ‘হৃদমাঝারে’ বাংলা ছবি দিয়ে পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন রঞ্জন ঘোষ। অর্থনৈতিক সাফল্যের মুখ দেখেনি প্রথম ছবি। তবু হার মানেননি। সিনেমাকে ভালোবেসে একের পর এক ছবি তৈরি করেছেন। তারপরে ‘রংবেরঙের কড়ি’ কিংবা ‘আহা রে’-র মতো সিনেমা উপহার পেয়েছে বাংলার চলচ্চিত্রজগৎ। সাফল্য এসেছে ধীরকদমে। প্রথম ছবি স্থান পেয়েছে অক্সফোর্ড কেমব্রিজ রয়্যাল সোসাইটি অফ আর্টস-এর নাটকের সিলেবাসে। তৃতীয় ছবি ‘আহা রে’-ও জায়গা করে নিয়েছিল একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে। এশিয়ার সেরা ফুড মুভির তালিকায় জ্বলজ্বল করে উঠেছিল এই ছবির নাম। তেমনি চতুর্থ ছবি ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-ও ২০২২ সালে নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সসম্মানে জায়গা করে নেয়।
কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়, তিরুবন্তপুরমে ছবির প্রদর্শনীর পর
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রজগতে অনেক বাংলা ছবিই প্রতিবছর বিদেশের বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্থান পায় এবং পুরস্কৃত হয়। কিন্তু একটি বাংলা ছবি দেশের মাটিতে অবস্থিত একাধিক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভাষাভাষীর ছাত্রছাত্রীরা দেখছেন এবং প্রশংসা করছেন। এমন দৃশ্য কিন্তু বাংলা ছবির জগতে বিরল। আর এই অভিজ্ঞতাগুলোই এক অন্যরকমের আনন্দ হয়ে ধরা দিয়েছে। জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), এফটিআইআই (ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সিটিউট, পুনে), আইআইটি মুম্বাই, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, পন্ডিচেরি বিশ্ববিদ্যালয়-এর মতো তাবড় তাবড় সব শিক্ষাকেন্দ্রের ক্লাসরুমে পৌঁছে গেছে বাংলার ছবি মহিষাসুরমর্দিনী। অধ্যাপক থেকে ছাত্রছাত্রীদের প্রশংসা এবং বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন পরিচালক রঞ্জন ঘোষ। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? পরিচালক রঞ্জন ঘোষ বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “একটা ছবি তৈরি করেই সেই ছবি বিদেশের বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাঠিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নই একেবারেই। বরং নিজের দেশের মানুষের মধ্যে বাংলা ছবিকে ছড়িয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম।” মহিষাসুরমর্দিনীই প্রথম বাংলা ছবি, যা দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারের থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে স্ক্রিনিং হয়। এবং তার পেছনে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল এই ছবির ধরন ও বিষয়বস্তু।
ইংলিশ অ্যান্ড ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস ইউনিভার্সিটি, হায়দ্রাবাদে পরিচালক রঞ্জন ঘোষ
থিয়েটারের ধারায় তৈরি করা এই ছবি। কেন এমন ভাবনা মাথায় এলো পরিচালকের? “দীর্ঘদিন ধরে মেয়েদের ওপরে হয়ে আসা নানান অত্যাচারের খবর মনকে ভারাক্রান্ত করে দিত। এবং সেখান থেকেই বোধহয় এমন ছবির পরিকল্পনা শুরু। নানান রকম নোটস খাতাবন্দি করে রাখতাম দিনের পর দিন। অনেকগুলো ঘটনাকে একত্রিত করে এই ছবির কাঠামো তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু সেইসব ঘটনাবলিকে একটা রাত্রে বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে ছবিতে দেখানো সম্ভব ছিল না। তখন এই থিয়েটারের ফর্মটিকে বেছে নিয়েছিলাম…”, জানান রঞ্জন। দুর্গাপুজো সূচনার মুহূর্তে দশ বছরের একটি মূক বধির মেয়ের গণধর্ষণ এবং হত্যাদৃশ্য দিয়ে গল্পের শুরু। এক পুরোনো রাজবাড়ির মালকিন এবং তার চার কলেজ পড়ুয়া ভাড়াটে শেষ মুহূর্তে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। ঠাকুরদালানে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্পূর্ণ একটি দুর্গামূর্তিকে সাজাতে সাজাতে এগোতে থাকে সেই ঝোড়ো রাতের গল্প। একটি মেয়েকে জীবনের বিভিন্ন সময়ে কী ভীষণ অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেরকম কতগুলো ঘটনার কোলাজ তৈরি করা হয়েছে এই ছবিতে।
ছবির দৃশ্য
আমরা একদিকে ধুমধাম করে এক নারীকে ঈশ্বরের স্থানে রেখে পুজো করি। আবার অন্যদিকে আমাদেরই আশেপাশে বহু নারী অসম্মানিত হন প্রতিনিয়ত। এই ছবি সেই সমস্ত অসম্মানের বিরুদ্ধে যেন এক প্রতিবাদের ভাষা গড়ে তুলেছে। সেই বার্তা পৌঁছেছে কলকাতার বাইরে বাস করা অবাঙালি মানুষদের মধ্যেও। ছাত্রছাত্রীদের থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এই ছবি দেখে উছ্বসিত হয়েছেন, প্রশ্ন করেছেন, আবার সন্দেহ প্রকাশও করেছেন। পরিচালকের মতে এটাই সবথেকে বড়ো পাওয়া। তবে চমক এখনও শেষ হয়নি। কেরালা বিশ্ববিদ্যালয়েও নাকি এই প্রথম কোনও বাংলা ছবি স্ক্রিনিং হল। এবং সেখানে সব দর্শক অবাঙালি। অতুলপ্রসাদ সেনের লেখা গানের একটি লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে বারবার। “নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান”। মহিষাসুরমর্দিনী ছবিটি যেন সেই যোগসূত্র তৈরি করে দিল। শুধু ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই নয়, কেরালার কোল্লাম জেলার একটি গ্রামের সাধারণ মানুষেরাও এই বাংলা ছবি দেখে ভালোলাগার অনুভূতি ভাগ করে নিয়েছেন পরিচালকের সঙ্গে। এইভাবে আগে কখনও কোনো বাংলা ছবি ভারতের মাটিতেই এত জায়গায় ভ্রমণ করেছে এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে বলে মনে হয় না। সবথেকে ভালো মুহূর্ত বা অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞেস করায় রঞ্জন ঘোষ জানান, “বম্বের টাটা ইন্সটিটিউট অব সোশ্যাল সাইন্স-এর ছাত্রছাত্রীদের জন্যে এই ছবি স্ক্রিনিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এক মারাঠি অন্ধ ছাত্রী ওইদিন হলে উপস্থিত ছিল। মেয়েটি ছবির ভাষা বুঝতে পারেনি, চোখে দেখতেও পায়নি। শুধু ছবির সাউন্ড ফলো করেছিল। এবং একজন মেয়ে হিসেবে অন্য মেয়েদের ওপরে হয়ে চলা অত্যাচারের কাহিনিগুলোকে শুধুমাত্র শব্দের মাধ্যমে ভেতর থেকে অনুভব করতে পেরেছিল।”
ছবির প্রধান পোস্টার
এরকম কিছু কিছু মুহূর্ত সত্যিই আজীবন মনে রয়ে যায়। ছাত্রছাত্রী এবং অধ্যাপকদের থেকে পাওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা, এফটিআইআই-এর মতো ইন্সটিটিউশনের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের ভাষার ছবিকে সকলের সামনে মেলে ধরতে পারা, এ পাওয়া সত্যিই সারাজীবনের। নিজের সন্তানের মতো করে তিলতিল করে গড়ে তোলা একটি ছবি যখন আপন জন্মভূমিতে এভাবে কদর পায়, তার চেয়ে বেশি আনন্দের হয়তো কিচ্ছু হতে পারেনা। একজন বাঙালি পরিচালকের মনে এই ভালোলাগার অনুভূতিটাই বারবার ফিরে ফিরে আসে। বিলেত ফেরত ডাক্তারের মতো বিলেত ফেরত সিনেমার কদর সমাজে বেশি হতেই পারে। কিন্তু আপন দেশের আপন মানুষদের কাছে একটি পরীক্ষামূলক বাংলা ছবিকে পৌঁছে দিতে পারাটা মনে হয় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের এবং একইসঙ্গে গর্বের।
