রঙ্গপটের নতুন নাটক কৃষ্ণপক্ষ

সভ্যতার অসুখী সময়- হিংস্র কুয়াশাচ্ছন্ন এক সামাজিক চিত্র

সভ্য মানুষের মনোরঞ্জন ও বিনোদনের উপকরণ খাঁচার বাঘটি সহসাই তীব্র শক্তি প্রয়োগ করে, শিকল ভেঙে খাঁচা ভেদ করে বেরিয়ে এসে জীবন্ত রক্তের স্বাদ মেটালো। আসলে বন্য প্রাণীর এই আচরণকে পোষ মানানোর ও সহজাত প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করানোর প্রচেষ্টা বেশ কষ্টসাধ্য। মানুষের মধ্যেও এই পশুসুলভ সত্তা অন্তর্নিহিত আছে। তবে ধীরে ধীরে আদিম মানুষ সভ্য জীবনে প্রবেশ করলো। এক্ষেত্রে ১৬৫১ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টমাস হবস রচিত ‘লোভিয়াথান’ গ্রন্থের সামাজিকচুক্তি তত্ত্বের কথায় অবতীর্ণ হতে হয়, যেখানে রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে মানুষ ছিল স্বার্থপর, হিংস্র, নিরাপত্তাহীন ও স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হত্যা করতেও প্রস্তুত এমন দুর্বিসহ পরিস্থিতির হাত থেকে নিস্তারের জন্য মানুষ পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠন করলো। কিন্তু সত্যিই কী রাষ্ট্র মানুষের পরিত্রাতা? রাষ্ট্র নামক এই প্রতিষ্ঠানটি কী মানুষের স্বার্থবোধকে নিবারণ করতে পেরেছে নাকি মানুষে মানুষে বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতালোভী প্রকৃতিটি রাষ্ট্রকে ঘিরে আরও স্পষ্টভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। মানুষ তার আদিম স্বার্থলাভের উন্মত্ততাকে সম্পূর্ণ রূপে পরিবর্জন করেনি বরং তাদের অন্তরস্থ আদিম এই পশুসুলভ সত্তাকে লুকিয়ে রেখে বাধ্য হয়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক রাষ্ট্রনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেছে। আর যখনই ক্ষমতা প্রলোভনের সামনে হয়েছে তখনই তার মধ্যে পশুসুলভ রক্তপিপাসা জাগ্রত হয় এবং হাজারও কৌশলপূর্ণ উপায়ে তার এই স্বার্থমগ্ন সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

কৃষ্ণপক্ষ নাটকটিতে হিংস্র কুয়াশাচ্ছন্ন এক সামাজিক চিত্র দৃষ্ট হয়। নাট্যকার দেবতোষ দাস উক্ত এই দোলাচলের মুহূর্তকে বেশ বাস্তবতার তুলিতে উপস্থাপন করেন। স্বাধীন গণতান্ত্রিক সমাজ আসলে কী? কোথায় বসবাস করছি আমরা? আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে জড়িত ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের ধারণা পরস্পর যেন সহোদর। একটি ছাড়া অপরটি নিরর্থক। এই উভয় ধারণাই আপাতভাবে জনকল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে সৃষ্ট। কিন্তু এই উভয় ধারণাগুলিই শাসক শ্রেণী তাদের স্বার্থ লাভের হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করছে না তো?

ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা এই ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ করে এমন বিকৃতভাবে প্রয়োগ করছেন যে, তা বিদ্বেষের পথ নিচ্ছে। মানুষের ধর্ম বিশ্বাসের সু্যোগ নিয়ে, ‘কার ধর্ম বেশি মহান’ এই প্রতিযোগিতায় লাগিয়ে দিয়েছে সাধারণকে। নিজেদের স্বার্থসাধনের জন্য সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে তারা।

সাম্প্রদায়িকতার বিষময় প্রভাব চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। নাটকটিতে গাজীরামপুরের গোষ্টি ও ধর্মীয় সংঘাতের ফলে সৃষ্ট এক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই এই নাটকটির ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে। নাটকে উল্লিখিত অমৃতাভর পরিবার এই ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত। এই পরিবারের চরিত্রগুলির মধ্যে একদিকে পারিবারকে সুরক্ষিত রাখা ও অপরদিকে সমাজকে এই পচনের হাত থেকে রক্ষা করবার এক টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হয়। লেখকপুত্র আকাশ সমাজ সচেতন হলেও সে হতাশা থেকেই সে বলে ওঠে তাদের কোন ‘সার্ত্র’ নেই, কারণ ফরাসি ছাত্র আন্দোলনের জ্বালামুখ ও বৌদ্ধিক অনুপ্রেরণা যে ভাবে সঞ্চার করেন জ্যাঁ পল সার্ত্র তাঁর লেখনীর দ্বারা তেমন বৌদ্ধিক নেতৃত্ব আজ কোথায়। এখন বৌদ্ধিকমহলও কোন ছাতার তলায় দাঁড়াবে সেই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, তেমনিই নেতৃত্বের অভাবে ছাত্র সমাজ।

আসলে বাম বা ডান যে কোনও পন্থাই কঠোরভাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে মানবতাবিমুখ মৌলবাদে পরিণত হয়। আর এই রকম মৌলবাদের অন্ধপূজারীদের দ্বারা এই নাটকে ইদ্রিসের কন্যা এক গণধর্ষণের শিকার হয়।

ভারত নির্মাণের মূলে রয়েছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের নীতি। এই নাটকটিতেও একই মুখোশের উল্লেখ হলো ঠিক বহুমুখী ভারতকে একমুখী করে তোলার ছলনা এবং এই ছলনাকে আচ্ছাদন করে স্বার্থের নেশায় মগ্ন কিছু মানুষ। নাটকটিতে যেমন, কল্লোল সেন। এরাই সাধারণ মানুষের সারল্যকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্ম দিয়ে চলেছে আর যার শিকার হয় অমৃতাভর মতো মানুষরা। সমাজের ভারসাম্য ফেরাতে গিয়ে মানসিক যন্ত্রণা কাতর হয়ে নিজেরই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

জীবনের বাস্তবতা ও নাটকটির অন্তিম দৃশ্যের মধ্যে সাদৃশ্যতাই পরিলক্ষিত। কারণ নাটকটির প্রতিটি চরিত্রের অভিনয় শৈলী বাস্তবিক রূপ প্রদান করেছে। বিশেষত লেখক অমৃতাভর ভূমিকায় তপন জ্যোতি দাসের অভিনয় আর তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে অরুণা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় যথাযথ। ইদ্রিসের চরিত্রের সারল্য যথার্থ ভাবে ফুটিয়ে তোলেন সঞ্জীব সরকার। এবং কল্লোল সেনের চরিত্রের ধূসর দিকটি ফুটিয়ে তোলেন কমল ব্রহ্ম ও আকাশের চরিত্রে সন্মিত্র ভৌমিক এই নাটকে নব ও উন্মুক্ত মনের যুবসম্প্রদায়ের প্রতীক।

অমৃতাভর পরিণতি ব্যতিক্রমী নয়, কারণ সাধারণ মানুষ লড়তে লড়তে মানসিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যায়। আসলে আমরা যতই গণতান্ত্রিকতার কথা বলি না কেন, যেটি সর্বসাধারণের বিপরীতে, মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদেরই পালনের জন্য।

তা বলে কি কোন দিনই কৃষ্ণপক্ষ কেটে ভোরের আলোয় এ সমাজ ভরে উঠবে না? কোনদিনই আবার কোন সার্ত্র’র আগমন ঘটবে না? সবই কি আরও কৃষ্ণাভ হয়ে যাবে? নাকি সত্যি একদিন দার্শনিক রুশোর মত সাধারণের ইচ্ছা শক্তিই ভেঙে দেবে পাহাড় প্রমাণ স্বার্থপরদের গড়া মিনারকে?

Developed by DXDasia