
কালীকীর্তনের ভক্তিরসে জাগ্রত হত চেতনা, দর্শন
Courtesy: K.C. Pyne/ Collection: DAG
অভাবের তাড়নায় নরেন চাকরির জন্য ঘুরে ঘুরে হতাশ। প্রিয় নরেনের এ অবস্থা আর চোখে দেখতে পারছেন না শ্রীরামকৃষ্ণ। অনেক অনুরোধ করে নরেনকে তিনি পাঠালেন কালী ঘরে, তাঁর বিশ্বাস নরেনকে মা ফেরাবেন না, সে যা চাইবে তাই পাবে। সেইমতো নরেন কালী ঘরে গেলেন, কিন্তু কিছুতেই জানাতে পারলেন না অন্নসংস্থানের কথা, স্বচ্ছলতার কথা; পরিবর্তে কালীমূর্তির দিকে চেয়ে বারবার একই প্রার্থনা করলেন – বিবেক, জ্ঞান, ভক্তি, দিব্য দর্শন। নরেনের এহেন কান্ড বুঝে শুনে রামকৃষ্ণ শেষে বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, যা তোর ভাত কাপড়ের অভাব হবে না।’
উল্লিখিত ঘটনাটি আমরা সকলেই জানি। রামকৃষ্ণদেব নরেনকে গভীর সাংসারিক ও আর্থিক সংকটের সময় কালীর কাছে প্রার্থনা করতে পাঠিয়েছিলেন। “চাই না গো মা রাজা হতে/ রাজা হবার সাধ নাই মাগো/ দু’বেলা যেন পাই মা খেতে” রামপ্রসাদ সেনের কথায়, সুশীল ব্যানার্জীর সুরে, পান্নালাল ভট্টাচার্যের কণ্ঠে এই গান কি সেই কথাই বলে না?
প্রবাহমান কাল ধরে কমলাকান্ত, লালন, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত -সকলের গানেই রামপ্রসাদী প্রভাব অনুরণিত হয়েছে।
শুধু এই গানটি কেন, রামপ্রসাদ সেনের এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় কালীকীর্তনে অন্তর্নিহিত রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ দর্শনিক চিন্তন। কালী-কে ঘিরে আধুনিক বাঙালি মধ্যবিত্তের নানা ‘কল্পনা’ একসময় প্রবল হয়ে উঠেছিল। এর পিছনে রামকৃষ্ণদেবের বিশেষ ভূমিকা ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। আঠেরো শতকের রামপ্রসাদ-কমলাকান্তের ট্র্যাডিশন উনিশ শতকে দক্ষিণেশ্বরে নতুন রূপ ধারণ করেছিল। প্রবহমান কাল ধরে কমলাকান্ত, লালন, রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত -সকলের গানেই রামপ্রসাদী প্রভাব অনুরণিত হয়েছে। আজও রামপ্রসাদী গানের জনপ্রিয়তার কারণ তাঁর গান মাটির কাছাকাছি থাকা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করেছে সে কাল থেকে এ কাল। আর তাই তাঁদের মুখে মুখে বেঁচে রয়েছে গানগুলি।
রামপ্রসাদের ‘আসার আশা, ভবে আসা’-র মতো গানে নানা ধারা, সংস্কৃতি, লোকাচার, ইতিহাস, দর্শনের সম্মিলনে গান তৈরি হয় আঠেরো শতকে। বাংলার ভক্তিগানে তাই মার্গ সংগীতের শাস্ত্রীয় প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনই আছে লোকসুরের বহুবর্ণ আস্তর। ক্ষণে ক্ষণে তারাপীঠ, দক্ষিণেশ্বর ঢুঁ মারা, মঙ্গল-শনিবারে পুজো দেওয়া আম বাঙালির অবশ্য এই কালী-দর্শন নিয়ে কোনওদিনই মাথা ব্যথা ছিল না, আজ তো নেইই।
রামপ্রসাদের সময়ে নানা বিপর্যয় এবং পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল সমাজ। ১৭৩৯-এর মহাপ্লাবন, ১৭৪২ এবং ১৭৫২-এর বর্গী হানা, ১৭৫৭-এর পলাশির যুদ্ধ আর ১৭৬৯-এর মন্বন্তর। এ সবের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল বাংলার কৃষি জীবন ও সাধারণ মানুষের উপর। এই সময়ই রামপ্রসাদের গান বাঙালিকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে।
তখন বাংলার গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস। কলকাতা রাজা, মহারাজা, জমিদারে ভরে গেছিল। হেস্টিংসের আমলে কালেক্টারগণ একাধারে শাসক ও ব্যবসাদার হয়ে ওঠেন। কুঠীর সাহেব ও তাদের বাঙালি গোমস্তারা ব্যবসায়ী ও শিল্পীদের অপর অত্যাচার করে প্রচুর অর্থোপার্জন করতে থাকে। কলকাতা সম্বন্ধে ছড়া বেরোয়—“জাল জুয়াচুরি মিথ্যাকথা এই তিন নিয়ে কলকাতা।” নানাজনে নানাভাবে টাকার জোগাড় করে বড়লোক হয়ে উঠতে লাগলো। আর্থিক প্রতিষ্ঠা হল, এবার সামাজিক প্রতিষ্ঠাও তো দরকার। না হলে লোকজন মেনে চলবে কেন! অতএব, সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের পালা আরম্ভ হল। সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের শুরুটা হয়েছিল দেবতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
রামপ্রসাদের গানে এই পরিবর্তনের সুর প্রথম শোনা গেল অন্নের জন্য কাতর প্রার্থনা— “অন্ন দে গো অন্ন দে গো অন্ন দে গো অন্নদা।”
গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ বীরভূমের গ্রাম জমোকুণ্ডিতে মন্দির নির্মাণ করে কৃষ্ণবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেন। দেবতার রাজসিক ভোগ ব্যবস্থা করে সকলের চমক লাগিয়ে দেন। W. Ward-এর “The Hindoos” গ্রন্থে দেখা যায়, রাজা নবকৃষ্ণ দেব কালীঘাট দর্শনে গিয়ে একদিনেই এক লক্ষ টাকা খরচ করেন। জয়নারায়ণ ঘোষাল খরচ করলেন একদিনে পঁচিশ হাজার টাকা। এই টাকায় অন্যান্য খরচের সঙ্গে পঁচিশটি মোষ, পাঁচটি ভেড়া এবং ১০৮টি ছাগ বলির ব্যবস্থাও করেন। এরপর মাতৃশ্রাদ্ধ ও অন্যান্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যাপক জাঁকজমক তো ছিলই। ওয়ার্ড সাহেব লিখেছেন, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ মাতৃশ্রাদ্ধে খরচ করেন ১২ লক্ষ টাকা। নবকৃষ্ণ দেব এই উপলক্ষে ব্যয় করেন ৯ লক্ষ টাকা।
এইসব ছাড়াও উল্লেখ্য, প্রচুর পয়সা কামিয়ে প্রবাসী ইংরেজরা কীরকম বর্বর বিলাসিতার মধ্যে গা ভাসিয়ে দেয় তার বিবরণ জন ক্লার্ক মার্শম্যানের “The Life and Time of carey, marshman and Ward” বইতে পাওয়া যায়। সব জিনিসেরই আলো-আঁধারি থাকে। তখন দেশে নতুন হাওয়া। একটা আস্থার ভাব জেগেছে সর্বত্র। সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাসের পরিধি যে এতে বিস্তৃত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। দেশের সামাজিক ক্ষেত্রে সার্বিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। কবি রামপ্রসাদের গানে এই পরিবর্তনের সুর প্রথম শোনা গেল, অন্নের জন্য কাতর প্রার্থনা—
অন্ন দে গো অন্ন দে গো অন্ন দে গো অন্নদা।” অথবা
মা মা বলে আর ডাকব না।
ও মা দিয়েছ দিতেছ কতই যন্ত্রণা।।
ছিলাম গৃহবাসী করিলে সন্ন্যাসী,
আর কি ক্ষমতা রাখ এলোকেশী।
ঘরে ঘরে যাব, ভিক্ষা মাগি খাব,
মা বলে আর কোলে যাব না।।”
শুধু তাই নয় সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন রামপ্রসাদ। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রোধ করার বহু আগেই রামপ্রসাদ সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে বলেছিলেন, ‘নহে শাস্ত্রসমত্বা সমত্বা সহমৃতা।’ রামপ্রসাদ সেন মাটির মূর্তি গড়ে কালী পুজো করলেও অনেকেই মনে করেন তিনি ছিলেন নিরাকারে বিশ্বাসী ও একেশ্বরবাদী। তার প্রমাণও মেলে তাঁর কাব্যে— ‘ভবানী শঙ্কর বিষ্ণু এক ব্রহ্ম তিনভেদ করে সেই মূঢ় জন প্রজ্ঞা হীন।’
কুমারহট্ট (হালিশহর) গ্রামে থাকতেন রামপ্রসাদ। সংস্কৃত, হিন্দি, বাংলা তিন ভাষাতেই সড়গড় ছিলেন। তন্ত্র শাস্ত্রের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি থাকাতে কৌলাচার ধর্মেই বিলক্ষণ শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশ করতেন। কিন্তু, মূর্খদের মতো মোহ মুগ্ধ ছিলেন না। তাঁর স্বপ্রণীত পদাবলিতেই তাঁর সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।
মন কর কি তত্ত্ব তারে।
ওরে, উনমত্ত, আঁধার ঘরে।।
সে, যে ভাবের বিষয়, ভাব ব্যতীত, অভাবে কি ধরতে পারে।।
মন অগ্রে শশি ভুত, কর তোমার শক্তি সারে।।
ওরে কোটার ভিতর চোর কুটারী, ভোর হলে সে, লুকাবেরে।।১।।
ষড়দর্শনে দর্শন পেলে না, আগম নিগম তন্ত্র ধরে।
সে, যে, ভক্তি রসের রসিক, সদানন্দে বিরাজ করে পুরে।।২।।
সে ভাব লতে পরম যোগী, যোগ করে যুগ যুগান্তরে।
হলে ভাবের উদয় লয় সে যেমন, লোহাকে চুম্বুকে ধরে।।৩।।
রামপ্রসাদ বলে মাতৃ ভাবে, আমি তত্ত্ব করি যারে।
সেটা চাতরে কি ভাঙবো হাঁড়ি, বুঝরে মন ঠারে ঠোরে।।৪।।
অষ্টাদশ শতকে বাংলার যে দু’জন কবি বিশেষ ভাবে পরিচিত তাঁরা রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় এবং রামপ্রসাদ সেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ‘রামপ্রসাদ’ প্রবন্ধে রামপ্রসাদের প্রথম জীবনে জমিদারী সেরেস্তায় খাতালেখা ও মাসিক ৩০ টাকা বৃত্তি পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় “কালীকীর্তন” প্রকাশ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তই। ১৮৫৩ সালে ‘সংবাদপ্রভাকর’-এ রামপ্রসাদ-জীবনী প্রকাশিত হয়। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদকে “কবিরঞ্জন” উপাধি দিয়েছিলেন। কালীকীর্তন, কৃষ্ণকীর্তন, নৌকাখণ্ডের সংগীত, সীতা বিলাপ, শিব সংগীত, কবিরঞ্জন বিদ্যাসুন্দর, পদাবলি –এই বইগুলি তিনি লিখেছিলেন। এর মধ্যে কালীকীর্তনই খ্যাত হয়েছে বেশি।
রামপ্রসাদ সাধক ও গৃহী একসঙ্গে ছিলেন। ছোটো থেকেই মা অন্ত প্রাণ। ছোটো বয়সেই বাবাকে হারান। সংসারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি কখনও। সাংসারিক জটিলতা, দারিদ্রতাই তাঁর মনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল গভীর বৈরাগ্যে, সাধনার পথে, চির ভক্তিরসে, কবিতার ভিতর।
“ঐ যে প্রতিদিন হয় দিন যাওয়া ভার, সারাদিন মা কাঁদি বসে/ মনে করি গৃহ ছাড়ি, থাকবো না আর এমন দেশে।”
কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেনের ‘শ্রীশ্রীকালীকীর্তন’ বইতে লেখা আছে, ৬০ বছর বয়সে তিনি মারা যাচ্ছেন যখন, তার আগের মুহূর্তে ভাগীরথীর জলে অর্ধেক ডুবে একটি পদ গেয়েছিলেন-
তারা, তোমার আর কি মনে আছে।
ওমা, এখন যেমন রাখলে সুখে, তেমনি সুখ কি পাছে।।
শিব যদি হন সত্যবাদী, তবে কি তোমারে সাধি, মা গো।
ও মা, ফাঁকির উপরে ফাঁকি, ডান চক্ষু নাচে।।১।।
আর যদি থাকিত ঠাঁই, তোমারে সাধিতাম নাই, মা গো।
ও মা, দিয়ে আশা, কাটলে পাশা, তুলে দিয়ে গাছে।।২।।
প্রসাদ বলে মন দড়, দক্ষিণার জোর বড়, মাগো।
ও মা, আমার দফা, হলো রফা দক্ষিণা হয়েছে।।৩।।
____________________
তথ্যসূত্র: রামপ্রসাদ, যোগীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় | রামপ্রসাদ: জীবনী ও রচনা সমগ্র | শ্রীশ্রীকালীকীর্তন
