বাংলার শিল্পীদের ভাবনায় কালী

কালী রূপ এসেছে নানা ভঙ্গিতে

বি আঁকিয়ের ভাবনায় বারে বারে কালী রূপ এসেছে নানা ভঙ্গিতে ও বিষয়ের ভাঁজে। বাংলা জুড়ে যেমন কালীমায়ের নাম-গান তেমনই বাংলার শিল্পীদের তুলিতে কালী অঙ্কনের প্রভূত প্রাবল্য। শুরুর গল্পটা যে ঠিক কোথা থেকে হলে ভালো হয় তা ভাবতে গেলে রাত ভোর হয়ে যাবে। শুরুটা বরং আমরা করি আমাদের উত্তর কলকাতার ঘরের কাছে বটতলা দিয়ে। আর তার সঙ্গে কালীঘাটের কালীমাতা ঠাকুরানির ছবির প্রসঙ্গ দিয়ে।

 

বটতলায় কাঠখোদাইতে কালী 

বটতলার ছাপা ছবির কাল আর কালীঘাটের ছবির সময়কাল সমান্তরাল। সেটা ১৮, ১৯ শতকের কলকাতার কথা। কলকাতার ছবি-বাজারে কালীঘাটের কালী-র ছবির কদর তখন ঘরে ঘরে। এদিকে বটতলার মানে উত্তর কলকাতার বটতলা অঞ্চলে তখন শুরু হয়ে গিয়েছে ছাপাখানা কেন্দ্রিক আন্দোলন। দক্ষিণ থেকে কালীর ছবি পৌঁছল উত্তরে। তারপর বটতলার শিল্পী বেণীমাধবের কাঠখোদাইতে সাদা-কালোয় সেই ছবি প্রকাশ হল। অসামান্য আবেদান তাঁর। এই ভাবেই লোকায়ত ও নাগরিক স্তরে কলকাতার ছবিতে কালী চর্চার শুরু। তবে স্বদেশী আমলে ধূমপানের বিজ্ঞাপনেও এসেছে কালীর ছবি। সে ছবি লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে ছাপা হয়েছিল। সেই ছবিও পরে বিজ্ঞাপনের খাঁচা থেকে বেড়িয়ে এসে শুধুই একটা আস্ত ছবি হিসেবে পৌঁছে গিয়েছে কলকাতার এপ্রান্ত ওপ্রান্তে লোকের ঘরে ঘরে।

ধূমপানের বিজ্ঞাপনে কালীর ছবি

তবে কালী-তুলিতে, কালীর ছবি আঁকার ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। নন্দলাল বসুর নরম কালির টানে কালী মায়ের ছবি তো সবার পরিচিত। সেই ধারাতেই পরবর্তী কালে ছবি এঁকেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম।

নন্দলাল বসুর আঁকা কালী

রেখার সটান আঁচড়ে এই দুটি ছবিতেই কালীমায়ের দৃপ্ত ভঙ্গিমাকে তুলে ধরা হয়েছে। নন্দলাল বসু এবং ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্ম এঁদের উভয়ের ছবির মধ্যেই দেখা গিয়েছে ভারতীয় শিল্পের প্রাচীন পরম্পরার আঙ্গিক। তার সঙ্গে মিশেছে তিব্বতি ঘরানা। এক্ষেত্রে শিল্পীদের অভিপ্রায় ছিল আধ্যাত্মিকতাকে প্রকাশ করা। কালীঘাট বা বটতলায় কিন্তু এমন অভিপ্রায় ছিল না। সেখানে শিল্পীদের লক্ষ্য ছিল কালীঘাটের মন্দিরস্থ কালী মূর্তির একটা রূপাবয়ব নির্মাণ ও পয়সা-পয়সা দরে তা লোকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া। বাংলার শিল্পীরা নানা সময় বিভিন্ন সামাজিক ও মানসিক অবস্থার প্রেক্ষিতেও কালীকে এঁকেছেন। যেমন পূর্ব-বঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিঘাতে কালীর ছবি এঁকেছিলেন বেঙ্গল স্কুলেরই আরেক শিল্পী মনীন্দ্রভূষণ গুপ্ত। কালীর ছবির চারপাশে দেখা যায় ভারতের পতাকার ফ্রেম। আর ছবির ভিতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দাঙ্গার নির্মম পরিহাস। শিল্পী যেন বলতে চান মানুষের অসুর-বৃত্তির মর্দনে এবার মা’কে আবার আসরে নামতে হবে। আবার আমরা দেখি ‘মহাভারত’ সিরিজের ছবিতে গণেশ পাইন কালীকে এনেছেন। মহাভারতের কথায় কালীর উল্লেখ নেই ঠিকই কিন্তু শিল্পী ভেবেছেন যে, গোটা ‘মহাভারত’ জুড়ে যে মৃত্যুর মিছিল সেই বিদেহী অতৃপ্ত আত্মারা কার কাছে গিয়ে আশ্রয় নেবেন? সেই ভাবনা থেকেই মহাভারত পর্বে যেন কালী-র উপস্থিতির আবশ্যিকতা অনুভব করেছেন গণেশ পাইন। এ ভাবেই চলতে থাকে বাংলার চিত্রকলায় মা-কালীর নিত্যনতুন রূপ দর্শন।

 

ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্মের কালী

এই বাংলারই শিল্পী শুভাপ্রসন্নর তুলিতে কলকাতা এবং কালী বারে বারেই একাকার হয়ে গিয়েছে। তিনি যেন বলতে চান কলকাতা আর কালী ক্ষেত্র সমার্থক। তিনি বলতে চান কলকাতা হল কালী-কীর্তনের পীঠস্থান। একটা ছবিতে দেখাচ্ছেন মা রিকশায় করে যাচ্ছেন আর রিকশা চালক স্বয়ং শিব। এমন ছবিতে কোথায় যেন একটা কলকাতার গন্ধ লুকিয়ে আছে।

শুভাপ্রসন্নের ভাবনায় কালী

অন্য একটিতে কালীকে কেন্দ্র করে বঙ্গসন্তানদের কীর্তন বেড়িয়েছে রাস্তায়। এর মধ্যেও এক অদ্ভুত কালী দর্শন শুভাপ্রসন্নর। সব মিলিয়ে এরকমই হল বঙ্গে কালীচর্চার কিছু নিদর্শন গাথা।

 

Developed by DXDasia