পূর্ণিমা সিনহা – পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা

গবেষণার জন্য পূর্ণিমার দরকার ছিল এক্স-রে মেশিন, কিন্তু তা সহজলভ্য ছিল না

ভারতে তখন ব্রিটিশের শাসন। সমাজ ছিল এখনকার থেকে অনেক বেশি রক্ষণশীল। তার মধ্যেই পুরোনো বিধিনিষেধ এবং ভয়কে অগ্রাহ্য করে বহু নারী এগিয়ে এসেছিলেন সাম্য এবং স্বাধীনতার পথে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবারও তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল।

নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত ছিলেন সেযুগের এক প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। এছাড়া তিনি অধ্যাপনা করতেন, আর চলত সাহিত্যচর্চা। বেশ কিছু প্রবন্ধ, নাটক, গল্প, উপন্যাস রচনা করেছেন। নারী-পুরুষ সাম্যের পক্ষে প্রচার করতেন বলিষ্ঠভাবে। বাড়ির পরিবেশ ছিল খুব প্রগতিশীল। তাঁরই কনিষ্ঠা কন্যা পূর্ণিমা সেনগুপ্ত, পরবর্তীকালে যিনি ডঃ পূর্ণিমা সিনহা (Dr. Purnima Sinha) নামে খ্যাত হয়েছিলেন।

পূর্ণিমার জন্ম ১৯২৭ সালে। কলকাতার লেক স্কুলে তাঁর প্রথাগত শিক্ষাজীবন শুরু হয়। আশুতোষ কলেজ এবং স্কটিশ চার্চ কলেজে অধ্যয়নের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা। পড়াশোনার সঙ্গেই শিল্পচর্চা চলত। যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের থেকে শিখেছিলেন হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সংগীত। পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের থেকে তবলার পাঠ নিয়েছেন। ছবি আঁকা শিখেছেন বিখ্যাত শিল্পী গোপাল ঘোষের থেকে। ভাস্কর্য নির্মাণেও পূর্ণিমা ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং ডিরাকের সঙ্গে পুর্ণিমা সিনহা (বোটানিক্যাল গার্ডেন, ১৯৫৪)

এরই মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৯৫১ সালে স্নাতকোত্তরে দারুণ ফল করলেন পূর্ণিমা। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Calcutta University) খয়রা অধ্যাপক বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। জহুরির চোখ তাঁর। পূর্ণিমাকে নিয়ে নিলেন তাঁর রিসার্চ টিমে। পুরুষতান্ত্রিক লোকজনেরা রে রে করে উঠল। একজন মেয়ে কিনা পিএইচডি করবেন পদার্থবিজ্ঞানে! বিজ্ঞানের ওই শাখার গবেষণায় তখন পুরুষদের একাধিপত্য। যদিও আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ এবং ছাত্রী পূর্ণিমা – কেউই হার মানার মানুষ ছিলেন না। 

১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম বাঙালি নারী, যিনি অর্জন করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি

পুর্ণিমা সিনহার শান্তিনিকেতনের স্কুল ‘মেলামেশার পাঠশালা’

গবেষণার জন্য পূর্ণিমার দরকার ছিল এক্স-রে মেশিন। কিন্তু তা সহজলভ্য ছিল না। খবর পেলেন, ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের বাড়ির পাশে বিক্রি হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানা বাতিল সরঞ্জাম। তিনি কিছু যন্ত্রাংশ কিনলেন এবং সেগুলো দিয়েই এক শক্তিশালী এক্স-রে মেশিন বানিয়ে ফেললেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম বাঙালি নারী, যিনি অর্জন করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি (First Woman Physicist in Calcutta University)।

উচ্চতর গবেষণার জন্য আমেরিকা গিয়েছিলেন পূর্ণিমা। দেশে ফিরে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এবং বোস ইন্সটিটিউটে কাজ করেন। সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক ইনস্টিটিউটে ডেপুটি ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদেও কাজ করেছিলেন। পূর্ণিমা বিয়ে করেন বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ডঃ সুরজিৎ সিনহাকে, যিনি পরে বিশ্বভারতীর উপাচার্য হয়েছিলেন। 

বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন ডঃ পূর্ণিমা সিনহা। যেমন- বিজ্ঞান সাধনার ধারায় সত্যেন্দ্রনাথ বসু (প্রকাশক- বিশ্ব বিদ্যা সংগ্রহ), আমার কথা (প্রকাশক- বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ), সত্যেন বোসের ব্যক্তিত্ব ও মননের ধারা (প্রবন্ধ – দেশ পত্রিকা)। শান্তিনিকেতনে আদিবাসী ছেলেমেয়েদের জন্য অন্যরকম একটি স্কুল তৈরি করেছিলেন, যার নাম ‘মেলামেশার পাঠশালা’। খেলা এবং শিল্পের মাধ্যমেই শিক্ষা দিতেন শিশুদের। ২০১৫ সালে তিনি প্রয়াত হন। বাংলা তথা ভারতে মেয়েদের লড়াইয়ে ডঃ পূর্ণিমা সিনহা চিরকাল প্রেরণা হয়ে থাকবেন।

তথ্যঋণঃ
স্বপন সেন, সোনাক্ষী শ্রীবাস্তব

Developed by DXDasia