মাস্টারমশাই গিরিশ ঘোষ তো বলেই ফেলেছিলেন যে, বাংলার রঙ্গমঞ্চে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী
একেবারে শুরুর দিকে বাংলার মঞ্চাভিনেত্রী হিসেবে বিনোদিনী দাসী আজও একইরকম আলোচিত এবং জনপ্রিয়। হতে পারে এই জনপ্রিয়তার কারণেই বিনোদিনী নামের আড়ালে রয়ে গিয়েছেন কিরণবালা বা তিনকড়ি দাসীর মতো সেসময়ের মঞ্চ-মাতানো অভিনেত্রীরা। অথচ তাঁরাও গিরিশবাবুর ছত্রছায়ায় এসেছিলেন, তাঁরাও তো দায়িত্ব নিয়ে পাঁকে পদ্ম ফুটিয়েছিলেন; সমাজের অন্ধকার কুহর থেকে তাঁরাও তো নিজেদের বের করে এনে আলোয় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন!
তিনকড়ি দাসীর কথা বিস্তারিত বলার আগে কিরণবালাকে নিয়েও দু-চার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। বেশি কিছু তাঁকে নিয়ে বলার পরিসর বন্ধ করেছে তাঁর অকালমৃত্যু। বিনোদিনীর থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো ছিলেন। জন্মেছিলেন কলকাতার নিষিদ্ধ পাড়ায় এক বারবনিতার ঘরে। বিনোদিনীর সঙ্গেই স্টার-এ অভিনয়-জীবন শুরু করেন। গিরিশ ঘোষের কাছে অভিনয়ের তালিম পেয়েছিলেন। ১৮৮৭ সালে বিনোদিনী যখন স্টার থিয়েটার এবং অভিনয় জীবন থেকে ইতি টানলেন, তখন মঞ্চে পাকাপোক্ত একটা জায়গা হয় তাঁর। বিনোদিনী যেসব ভূমিকায় অভিনয় করতেন, সেসব ভূমিকাতেই দেখা যায় কিরণবালাকে। বিভিন্ন লেখালিখি থেকে জানা যায়, অভিনয়ে বিনোদিনী যে-আদর্শ রেখে গিয়েছিলেন, কিরণবালা তা যোগ্যতার সঙ্গে বজায় রাখতে পেরেছিলেন। বেশ উঁচু দরের অভিনেত্রী হিসেবেই তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে, তাঁর এই দক্ষতা ব্যাপকভাবে পরিচিতি পাওয়ার আগেই বসন্ত রোগের কবলে পড়ে মারা যান বছর বাইশের কিরণবালা।
জগত্তারিণী, গোলাপসুন্দরী, এলোকেশী আর শ্যামা, এই চার বারবণিতাকে যখন বেঙ্গল থিয়েটার উদ্যোগ নিয়ে নাট্য-অঙ্গনে আনে, সেসময় পুরুষ-পরিচালিত অনেক পত্রপত্রিকাই তাদের তীব্র সমালোচনা করেছিল। একটি পত্রিকায় বেঙ্গল থিয়েটারের সমালোচনা করে লেখা হয়, “‘বেশ্যা’দের মঞ্চে এনে নাটককে যাত্রার স্তরে নামিয়েছেন।” তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রসমাজ ঠিক এভাবেই যাত্রাকে অশিক্ষিতের বিনোদন হিসেবে তাচ্ছিল্য এবং বেঙ্গল থিয়েটারের এই উদ্যোগকে অস্বীকার করেছিল। এবার আসি তিনকড়ি দাসীর কথায়। তিনকড়ি দাসীর মা ছিলেন যৌনকর্মী। বিনোদিনীর পরে সে যুগের সবচেয়ে নামী অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। গিরিশবাবু তাঁরও শিক্ষক ছিলেন। টাকার অভাব তো ছিলই এছাড়াও তাচ্ছিল্যের দুনিয়া থেকে মুক্তি পেতে অভিনয়কে অস্ত্র বানিয়েছিলেন। তিনি যখন গিরিশ ঘোষের ‘বিল্বমঙ্গল’ নাটকে অভিনয় শুরু করেন, তখন তাঁর ভূমিকা ছিলো নির্বাক সখীর। অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম পরিচিতি তৈরি হয় মীরাবাঈ নাটকে, মীরাবাঈয়ের ভূমিকায়। ১৮৯৩ সালে লেডি ম্যাকবেথের ভূমিকায় অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনকড়ি। পরে গিরিশবাবুর আরও কয়েকটি নাটকে তাঁকে প্রধান চরিত্রে দেখা যায়। ছাত্রীর অভিনয় পারদর্শীতায় মুগ্ধ হয়ে মাস্টারমশাই তো বলেই ফেলেছিলেন যে, বাংলার রঙ্গমঞ্চে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী।
অভিনয়ের প্রতি তিনকড়ি এত আন্তরিক ছিলেন যে, এক বড়োলোক ব্যক্তি তাঁকে মাসে দুশো টাকার বিনিময়ে রক্ষিতা রাখতে চাইলেও তিনি চল্লিশ টাকা মাইনের অভিনয় জীবন ছাড়তে চাননি। দুশো টাকার লোভনীয় প্রস্তাব স্বেচ্ছায় অস্বীকার করায় তাঁর মা তাঁকে বাঁশের বাখারি দিয়ে মেরেছিলেন। মার খেয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন এবং টানা তিনদিন জ্বরে ভুগেছিলেন। কিন্তু, ওই যা হয়… জীবনের শেষ দিকের বছর কুড়ি তাঁকে এক ‘বাবু’র রক্ষিতা হতেই হয়েছিল। তবে, নিজের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই বাবু তাঁকে যত্নের সঙ্গেই রেখেছিলেন বলে শোনা যায়। এমনকি, এই বাবুর আত্মীয়স্বজনরাও তিনকড়িকে বাবুর প্রণয়িনী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এই বোধহয় তাঁর প্রাপ্য ছিল! মৃত্যুর আগে এই বাবু তাঁকে তিনটি বাড়ি দিয়ে যান, তার মধ্যে তৃতীয় বাড়িটি তিনকড়ি দান করে দিয়েছিলেন এই বাবুর ছেলেকে এবং আর দুটি বাড়ি ১৯১৭ সালে মারা যাওয়ার আগে হাসপাতালের জন্যে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনকড়িরা যত ভালো কাজই করুন না কেন, শেষপর্যন্ত তাঁদের জীবন-কলস হতাশা, উপেক্ষা আর দুঃখে ভরা থাকে। আর এভাবেই নিয়ম মতো তাঁদের গল্প একসময় ফুরিয়ে যায়, নটে গাছটিও মুড়িয়ে যায়।
তথ্যসূত্রঃ রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া নারীপ্রগতির একশো বছর, গোলাম মুরশিদ