
চারদিনের পুজো। চারটি সিনেমা। আর রুপোলি পর্দার সামনে আপনি
বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই কি শুধু বাড়িতে বাড়িতে রঙিন পর্দা কিংবা রাত জেগে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো? হ্যাঁ, এসব তো আছেই। কিন্তু বাঙালির পুজো ষোলোকলায় পূর্ণ হয় আরও অনেকগুলো স্তর পার করে আসার পর। পুজো মানে ভুরিভোজ। পুজো মানে বাল্যবন্ধুর বাড়ি গিয়ে আড্ডা জমানো। পুজো মানে সেলফি আর আড়চোখ। পুজো মানে টইটই ভ্রমণে নতুন হাওয়ায় গা ভাসানো। পুজো মানে বাংলা ছবি।
অনেক বাঙালিই আছেন, যাঁরা পুজোতে ঠাকুর দর্শনে না বেরিয়ে হলের সামনে লাইন দিয়ে টিকিট কাটেন সিনেমা দেখবেন বলে। পুজোর চারদিনে বেছে নেওয়া হয় কোনদিন কোন সিনেমা তিনি দেখবেন। ঠিক যেমন সপ্তমী থেকে দশমী, কোনদিন কোন পোশাকটি পরব, তা ঠিক করা হয়। এক্ষেত্রেও তাই। আহা! ঠিক এজন্যেই তো রসেবশে বাঙালি। ২০১৮-র দুর্গাপুজোয় চার-চারটি ছবি আপনার মনে-প্রাণে জাঁকিয়ে বসুক। এবার এখন থেকেই হিসাব করে নিন কোনদিন কোনটা দেখবেন। বা কোনদিন কে আপনাকে সঙ্গ দেবে।
সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘এক যে ছিল রাজা’
ভাওয়াল সন্ন্যাসী ফিরে আসছেন। ইতিমধ্যেই সন্ন্যাসীর বেশভূষা বেশ তাক লাগিয়েছে সিনে-প্রেমীদের। ‘এক যে ছিল রাজা’ সৃজিত পরিচালিত একটি পিরিয়ড ড্রামা। ১৯৭৫ সালে এই একই বিষয় নিয়ে ছবি বাংলায় হয়েছে। ‘সন্ন্যাসী রাজা’র উত্তম কুমারকে কি আজও আমরা ভুলতে পেরেছি? তবে, ভাওয়াল সন্ন্যাসীকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালক দেখতে চেয়েছেন, অনেকটা গবেষণার মাধ্যমে। এই ছবির ঘটনা এগোবে একটি মামলাকে ঘিরে। মৃত ঘোষণা হওয়ার প্রায় বারো বছর পর ফিরে আসেন ভাওয়াল রাজা। সেই চরিত্রেই দেখা যাবে অভিনেতা যিশু সেনগুপ্তকে। তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় রাজনন্দিনী পাল। জমিদারের দিদির চরিত্রে জয়া এহসান। এবং দুই আইনজীবীর চরিত্রে দেখা যাবে অঞ্জন দত্ত ও অপর্ণা সেন-কে। তাবড়-তাবড় অভিনেতাদের মধ্যে টক্কর যে জমবে– বলাই বাহুল্য।

কৌশিক গাঙ্গুলির ছবি ‘কিশোর কুমার জুনিয়র’
কিশোর কুমারকে আটকে রাখা যাবে না বিশেষ কোনো একটি প্রজন্মের মধ্যে। তাঁর কণ্ঠ আজও তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর রেখেছে বলেই বাঙালি কিশোর কুমারের জন্মদিনে বা মৃত্যুদিনে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন। গানে গানে স্মরণ করেন। অডিটোরিয়াম ভর্তি হয় অজস্র চোখ আর হাততালিতে। পাশাপাশি দর্শক ছাড়াও কণ্ঠশিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখেন ওই কণ্ঠী শিল্পী বা ‘কপি সিঙ্গার’। পাড়ার জলসায় তখন কেউ হয়ে ওঠেন হেমন্ত, কেউ আশা-লতা, কেউ নচিকেতা। ঠিক এমন একটা ভাবনা থেকেই কৌশিক চিত্রনাট্য লিখলেন। কিশোর কুমারের গলায় গান গাইলেন কুমার শানু। আর কেন্দ্রীয় চরিত্রে স্বয়ং প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। কৌশিকের গল্পটা শুধু এই স্ট্রাগেলের মধ্যেই থেমে থাকেনি। বাবা-ছেলে, স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও অন্য একটা মোচড় রয়েছে। কিশোর কুমার জুনিয়রের স্ত্রীর চরিত্রে অপরাজিতা আঢ্য এবং ছেলের চরিত্রে ঋতব্রত মুখার্জীকে দেখা যাবে।

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ছবি ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’
আমাদের ছেলেবেলা জুড়ে থাকে কয়েকটা টুকরো টুকরো ছবি। আকাশে ঘুড়ি ওড়ে। বাড়ির পাশে আঁকা হয়ে যায় ছোট্ট একটা পুকুর। ঠাকুরঘরে বাতাসা চুরি করলে ঠাম্মারা তেড়ে আসেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’। সেখান থেকেই চরিত্ররা আমাদের ছেলেবেলার ঘাটে এক এক করে উঠে আসবেন এবারের পুজোয়। বইয়ের পাতার মনোজরা রুপোলি পর্দায় উঠে আসবেন, ঘটনা পরম্পরায় তিনি বড় হবেন। পুজোয় এমন একখান ছবি তো দেখতেই হবে। শীর্ষেন্দুর লেখা ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’র প্রথম সংস্করণের জন্য ইলাশট্রেশন করেছিলেন সুধীররঞ্জন মৈত্র। সেইসমস্ত ইলাশট্রেশন ব্যবহার করা হয়েছে ‘একটি ছবি’ নামের গানে। ছবিতে গান লিখেছেন পরিচালক স্বয়ং। অভিনয় করছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, আবির চ্যাটার্জী, ব্রাত্য বসু, সোহাগ সেন, রজতাভ দত্ত, শিলাজিৎ প্রমুখ।
অরিন্দম শীলের ছবি ‘ব্যোমকেশ গোত্র’
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে ব্যোমকেশ থাকবে না, তা তো হতেই পারে না। বাংলা সিনেমার শেষপাতে তাই এমন একটি গোয়েন্দা চরিত্রকে রাখতেই হয়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রক্তের দাগ’ অবলম্বনে চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন অরিন্দম শীল। তবে কলকাতার বদলে এই ছবির প্রেক্ষাপট মুসৌরি। আসলে গল্প অনুযায়ী, স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতার পুনর্নির্মাণ বিভিন্ন কারণে সমস্যার ছিল। আর মুসৌরির দেওয়াল জুড়ে এখনও ব্রিটিশ স্থাপত্যের গন্ধ রয়েছে। সে কারণে মুসৌরিকে বেছে নিয়েছেন অরিন্দম। ব্যোমকেশ-সত্যবতীর চরিত্রে কোনো বদল না এলেও অজিতের চরিত্রে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ঋত্বিক চক্রবর্তী নয়, এবার অজিতের চরিত্রে দেখা যাবে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এছাড়াও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন অর্জুন চক্রবর্তী এবং অঞ্জন দত্ত। ১৯৬৭ সালে ব্যোমকেশ সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’। ২০১০ সালে ‘আদিম রিপু’ অবলম্বনে অঞ্জন দত্তের হাত ধরে আবির চট্টোপাধ্যায়কে দেখা যায় ব্যোমকেশ চরিত্রে। প্রথম ছবিতেই দর্শক তাঁকে পছন্দ করেন। তাই প্রতিবছর দুর্গাপুজোয় একটা করে ব্যোমকেশ না থাকলে কি হয়!
অতএব সুধী দর্শক, আপনি ঠিক করে নিন পুজোর দিনগুলোয় কোনদিন কোন সিনেমা দেখবেন। অবশ্যই হলে গিয়ে লাইন দিয়ে টিকিট কেটে বাংলা সিনেমা দেখুন। পুজোয় অন্যান্য কাজের মতোই বাংলা সিনেমার বন্ধু হয়ে যান।
