
শহরে প্রদর্শিত হচ্ছে শিল্পীর সেরা চার দশকের কাজ
হুগলির বেগমপুর গ্রামের ছাপোষা পান চাষির ছেলে গোবর্ধন আশ (১৯০৭ – ১৯৯৬)। বাবা-মা, তিন ভাই তিন বোনের টানাটানির সংসার হলেও শিক্ষার প্রতি তাঁদের পরিবারের আলাদা উৎসাহ ছিল। ছোটোবেলায় এই দারিদ্রের মাঝেই তাঁর শৈল্পিক যাত্রার শুরু। স্কুলের পরীক্ষায় নাকি তাঁর উত্তরপত্রে উত্তরের বদলে প্রাকৃতিক দৃশ্য, পশুপাখি, দেবদেবী ইত্যাদির স্কেচ পাওয়া যেত। স্কুলের হেডমাস্টার অবশ্য তাঁকে খুব স্নেহ করতেন, ক্লাসের প্রমোশনও কখনও আটকাননি। কারণ, অন্য বিষয়গুলোতে ফাঁকি দিলেও বাংলা ও ইংরেজিতে খুব ভালো ছিলেন গোবর্ধন। এই হেডমাস্টারই একদিন তাঁকে বলেছিলেন, ‘ছবি আঁকায় এত ন্যাক যখন, তুমি আর্ট লাইনে চলে যাও।’
অভাবী ঘরে একথা মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারেনি ছাত্রটি। শেষমেশ পাড়ার এক বন্ধুকে সঙ্গে করে কাউকে কিছু না জানিয়ে বেনারস পলায়ন। বেশ কিছুদিন ছিলেন। পরে খোঁজ পেয়ে দুজনকেই বেগমপুর ফিরিয়ে আনা হয়। তারপর ভর্তি হন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে এবং থাকতে শুরু করেন কলকাতায়।
সেই সময় গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে ছাত্রবিক্ষোভ চলছে; শিল্পী মুকুল দে-র প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানের কারণে। মুকুল দে-র শিল্পভাবনা ছাত্রদের পছন্দ হয়নি, তারা স্ট্রাইক শুরু করে ইউরোপীয় অধ্যক্ষ বাতিলের বিরুদ্ধে। সেই স্ট্রাইকে গোবর্ধনও ছিলন। মুকুল দে তাঁর সঙ্গে অন্যান্য ছাত্রদের বৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ক্লাস করতে ভালো লাগতো না গোবর্ধনের, নিজের মতো এদিক-ওদিক বেরিয়ে পড়তেন। মুকুল দে সব লক্ষ্য করতেন। একদিন গোবর্ধনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ক্লাস করো না কেন? গোবর্ধন বলেন, ক্লাসে আমার ভালো লাগে না।
-ক্লাস না করলে শিখবে কীকরে?
-কেন, আমি তো আউটডোর স্টাডি করি।
-কই দেখি কেমন স্টাডি করেছো?
জয়নুল আবেদিন থেকে গোপাল ঘোষ, বাংলায় হেন শিল্পী বিরল যিনি গোবর্ধনের সান্নিধ্য পেতে এসে পড়েননি সেই মৌতাতে। গণেশ হালুই প্রমুখ সমকালীন বহু আধুনিক চিত্রশিল্পীই অগ্রজস্থানীয় এই ভাস্বর পথিকৃতের অনুপ্রেরণায় সমৃদ্ধ হয়েছেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গোবর্ধন পেশ করলেন প্রায় এক বস্তা ছবি। গোবর্ধনের কাজ মনে ধরে মুকুল দে-র। প্রসংশা করে ক্লাসে অন্যান্য ছাত্রদের ডেকে দেখান। আর্ট কলেজের বার্ষিক প্রদর্শনীতে প্রায় প্রতি বছরই গোবর্ধনের ছবি নির্বাচিত হত। একবার একটা ঘোড়ার ছবি দিয়েছিলেন প্রদর্শনীতে। একটা বুড়ো ঘোড়ার স্কেচ। সেবছর প্রদর্শনীতে এই ঘোড়া দেখে কিছুক্ষণ থমকে ছিলেন যামিনী রায়। শিল্পীকে ডেকে আলাপও করেছিলেন। অন্যান্য মাস্টার শিল্পীদের মতো গোড়া থেকেই তিনি নিজস্ব রাস্তার খোঁজ শুরু করেছিলেন, আজীবন তা জারি রেখেছিলেন।
বাঁ দিক থেকে দাঁড়িয়ে আছেন: অবনী সেন, গোবর্ধন আশ, বিমল দে, জহর সেন, অর্ধেন্দু চ্যাটার্জি, হরিধন দত্ত। বাঁ দিক থেকে বসে আছেন: এসএন দে, অতুল বোস, অমিয় বসু। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, প্রথম বার্ষিক প্রদর্শনী, ১৯৩৩
পাঁচ বছর আর্ট কলেজে পড়ার পরও নানান কারণে সার্টিফিকেট পেলেন না। এরপর আর্ট কলেজের এক বন্ধুর সঙ্গে উল্টোডাঙায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে স্টুডিয়ো করলেন। কয়েক বছরের মধ্যে অনেক ছবি তৈরি হওয়ার পর তাঁরা ঠিক করেন একটা প্রদর্শনী করবেন। সেই মতো ইন্ডিয়ান আর্ট স্কুলের তৎকালীন ডিরেক্টর অতুল বোসের কাছে সকলে আবেদন জানালে তিনি অনুমতি দেন।
পিছনে তৃতীয় সারির ডানদিক থেকে (দাঁড়ানো) দ্বিতীয় জন গোবর্ধন আশ। মাঝের সারিতে ডানদিক থেকে দ্বিতীয় জন পার্সি ব্রাউন (ব্রিটিশ শিল্পতাত্ত্বিক), তৃতীয় জন যামিনী রায়। সামনের সারিতে ডানদিক থেকে চতুর্থ জন অতুল বোস। ১৯২৯, গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট।
গোবর্ধনের খ্যাতির শুরু তিরিশের দশকে। তাঁর এক বোনের বিয়ে হয়েছিল হাওড়ার শিবপুরে। সেখানে, বোনের শ্বশুরবাড়িতে ওই সময় বাংলার দিকপাল সব শিল্পীদের আড্ডা বসতো। কখনও সারাদিন কখনও সারারাত। জয়নুল আবেদিন, গোপাল ঘোষ, রথীন মৈত্র কে না সামিল হয়েছেন! ১৯৩৬ সাল, একই বছর দুটি পুরস্কার পেয়েছিলেন। অ্যাকাদেমি অফ ফাইন আর্টস ও বোম্বে আর্ট সোসাইটির তরফে। এছাড়া পরে আরও সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর জীবনের শেষবেলায় তাঁকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র (ব্লিডিং ইন দ্য সান) বানিয়েছিলেন পরিচালক নবেন্দু চ্যাটার্জি।
পুরস্কারের ছবি
চিত্রকলার বিভিন্ন পর্যায়ে গোবর্ধন আত্ম-প্রতিকৃতির মধ্যে দিয়ে নিজের শৈল্পিক মনন ও শিল্পীসত্ত্বার বিবর্তন এবং চিত্রকার্যের ক্রমবিন্যাসকে ব্যক্ত করেছেন। ক্রস্ হ্যাচিংয়ের মত নানা কায়দায় নিজের নিপুণতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ১৯৫০ সালে ক্যালকাটা গ্রুপ ও প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপের যৌথ প্রর্দশনীতে প্রকাশ পায় নবচেতনে কল্পিত (আভঁ-গার্দ) ‘অবতার সিরিজ’, যা তৎকালীন শিল্পী মহলে সাড়া ফেলে দেয়। গুয়াসা, তেল রং, জল রং – চিত্রকলায় অভূতপূর্ব পরীক্ষা-নিরিক্ষণের অনুঘটন ও নিগূঢ় পর্যালোচনার নেপথ্যে গোবর্ধনের এই অনমনীয় সৃষ্টি।‘চিলড্রেন সিরিজে’ দেখা যায় শিল্পীর ব্যাতিক্রমী প্রতিকৃতি শৈলী। পোর্ট্রেটৈ শৈশবের বিচিত্র আবেগ পূর্ণতা পেয়েছে সাবলীল ও অব্যয় চিত্রায়নে।

শিবপুরে গোবর্ধন আশের স্টুডিও হয়ে উঠেছিল শিল্পচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। জয়নুল আবেদিন থেকে গোপাল ঘোষ, বাংলায় হেন শিল্পী বিরল যিনি গোবর্ধনের সান্নিধ্য পেতে এসে পড়েননি সেই মৌতাতে। গণেশ হালুই প্রমুখ সমকালীন বহু আধুনিক চিত্রশিল্পীই অগ্রজস্থানীয় এই ভাস্বর পথিকৃতের অনুপ্রেরণায় সমৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর ব্যপ্তি ও পরিসর অমলিন তাঁদের স্মৃতিতে। গোবর্ধন আশের চিত্রকলার নির্যাসে বার বার ভেসে উঠেছে স্বাধীনচেতা মনোভাব, দৃঢ়তা ও সৃজনশীলতা। শিল্পের ইতিহাসে গোবর্ধন আশের ভূমিকা প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আজীবন শিল্পের ভিতর নিজস্বতার সন্ধান জারি রেখেছিলেন। ভারতীয় চিত্রকলাকে সমৃদ্ধ করে, বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েও আজীবন মাটিকে কাছছাড়া করেননি কখনও।

বাংলায় আধুনিক চিত্রশিল্পে গোবর্ধন আশের অসামান্য অবদানের উপর আলোকপাত করা ও যথার্থ মর্যাদা জ্ঞাপনের লক্ষ্যে কলকাতার KCC (কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি)-তে গোবর্ধন আশ স্মারক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ‘স্মরণে গোবর্ধন আশ’ — শিল্পীর সেরা চার দশকের (১৯২৯ – ১৯৬৯) ফসল নানা-রত্নখচিত বিশেষ এই সংকলন PRINSEPS-এর পক্ষ থেকে একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। PRINSEPS একটি শিল্প বিষয়ক গবেষণায় প্রনোদিত নিলাম সংস্থা, অভিলেখাগার ও লাইব্রেরি। শতাধিক আলেখ্যের মধ্য দিয়ে গোবর্ধনের সুবিশাল ও বৈচিত্র্যময় পরিধির একটি মানচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এই সংস্থা। স্কেচ, পোর্ট্রেট, আত্ম-প্রতিকৃতি তো বটেই, থাকছে গ্রাম বাংলার বিবিধ দৃশ্যপটের ছবি, ল্যান্ডস্কেপ, ‘৪০-এর দশকের অসামান্য ‘অবতার সিরিজ’, প্যাস্টেলে আঁকা জীবন্ত আউটডোর স্কেচ, এবং এক দশকব্যাপী সাধনার ফল ‘চিলড্রেন সিরিজ’। উল্লেখ্য, এই প্রর্দশনী মূলত শিক্ষামূলক ও শিল্প বিষয়ে। প্রর্দশনীতে ছবি বিক্রি করা হবে না। প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ২৯ মার্চ চলবে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত। প্রবেশ অবাধ।
_______________
তথ্যসূত্র:
Interview with the family of Gobardhan Ash. We discuss his art and the first NFT auction in India (Prinseps)
gajahgallery.com
wiki/Gobardhan_Ash
DAG
কৃতজ্ঞতা:
Prinseps’s media : Shilpi Jaiswal Sen
