মাস্টারমশাইয়ের প্রদর্শনী দেখে লিখছেন ছাত্র
১৯৯৫ সালে, তখন গণেশদার অবসর জীবন। কয়েক বছর আগে স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছেন দীর্ঘ কর্মজীবন থেকে। সরকারী চারু ও কারুকলার অধ্যাপক ছিলেন। আমারও শিক্ষক। ১৯৬৫/৬৬ সালে। দেওয়াল চিত্রের খুঁটিনাটি, শিখলাম ওনার কাছে। সে কাহিনি অন্য। ৯৫ সালে খুবই অল্প সংখ্যক মাত্র বোধহয় বারোটি বেশ বড়ো মাপের কাজ করেন। কাগজের উপর। শুকনো চকখড়ির মায়াময় ছবি। সবই প্রায় মুখচ্ছবি। শিশু ও নারীদের।
আমরা এটা জানি ১৯৫৭ সাল থেকে বেশ কিছু বছর উনি অজন্তা-গুহা স্থাপত্যে সরকারী শিল্পী ছিলেন। নকল করা, গবেষণা করা এই ছিল কাজ। এই কাজ ওনার ব্যক্তিগত প্রয়াস নিয়ে বৃহৎ একটি বই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। সরকারী ভাবে প্রকাশ পায়নি। ভারতের রাষ্ট্রপতির এটা মোড়ক উন্মোচনের কথা। কিন্তু তার আগেই আমাদের হাতে এসেছে এই বৃহৎ, অমূল্য ও অপূর্ব সংগ্রহ। এই কথা এখানে লিখলাম কারণ এই কাজ থেকে বোঝা যায়, অজন্তার অন্তর্নিহিত রস আজও উনি পান করে চলেছেন। এই মুখগুলি তার সাক্ষাৎ বহন করছে। অদ্ভুত বিচিত্র সম্মোহিত চোখ তাদের। তাকিয়ে থাকলে ঘোর লাগে। শরীরের গঠনও অদ্ভুত। পেলব। তাদের শরীরের ত্বক যেন স্পর্শ করা যায়। এমনই মনোনিবেশ। একটা ধোঁয়া ধোঁয়া, ঝাপসা রঙের প্রলেপ, সময় চিহ্ন বলা যায়। একটি কাজ আমাকে সেই অজন্তা সময়ে নিয়ে গিয়েছিল। বাঁদিকে তাকানো একটি রমনী শরীর। মাথাটা একটু নোয়ানো, খয়েরি রঙের আঁচড়, কালো সবজে পশ্চাৎপট; শ্যাওলা ধরা দেওয়ালে, রেখা সচল, একটা অলিন্দের মতো আভাষ।

এই লেখা লিখছি স্মৃতিপট থেকে। জানা ছিল না প্রতিবেদন লিখতে হবে। তবুও আমি সর্বদাই দেখতে পাচ্ছি। একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে, বহুমূল্যের, তা এখনো সংগ্রহ করা হয়নি। যেখানে এর প্রতিলিপি দুমলাটের মধ্যে রাখা। খুবই যত্ন করে একশ’টি সংগ্রহযোগ্য। আমি ওদের আগাম বরাত দিয়েছি। ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখার জন্য।
ঠোঁট, নাক মুখ, ছায়া স্পষ্ট রেখায় তারা প্রকাশিত। কোনও আড়াল নেই। আশ্চর্য, বারবার তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে মন চায়। একজন শিল্পীর গভীর থেকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি, কতদূর তা দেখতে পাওয়া যায়, তার খোঁজ মেলে।
‘গণেশদা’ এই সম্মোধন করার কারণ সেই ষাট দশক থেকে ওনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। স্নেহ পাওয়া। যাকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে যায়। এত গভীর জীবন দর্শন, ক্রিয়া কলাপ, এমন বিস্তৃতি অবাক করার মতো। সে প্রসঙ্গ থাক। এই যে প্রায় ব্যতিক্রমী বারোটি কাজ, কেন আর উনি এমন কাজ করলেন না, কিসের তাড়নায় এমন প্রয়াস, আমাকে অবাক করে। আমি চিরকাল বিমূর্ততার উৎস হিসেবে পারিপার্শ্বিক ছন্দ, মানুষজন, প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছি। বাস্তবে দেখেছি গণেশদাও তাই প্রয়োগ করেছেন। এটা আমার সমর্থন নয়। এটা আমার প্রাপ্তি। আমিও একই অভ্যাসে ব্রতী।
আগেই বলেছি সম্মোহিত চোখ, তেমনি অবয়ব। ঠোঁট, নাক মুখ, ছায়া স্পষ্ট রেখায় তারা প্রকাশিত। কোনও আড়াল নেই। আশ্চর্য, বারবার তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে মন চায়। একজন শিল্পীর গভীর থেকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি, কতদূর তা দেখতে পাওয়া যায়, তার খোঁজ মেলে।
এরা কারা, কী তাদের চাহিদা ও আবেগ, এগুলো গণেশদার নিজস্ব নির্মিত অবয়ব, এরা যেন প্রতিটিই এক একজন গণেশ হালুই, সারা জীবন যাদের উনি দেখে এসেছেন, ভালোবেসে এসেছেন এরা তারাই। অবাস্তবের বাস্তব।

গণেশদার খ্যাতি বিমূর্ত শিল্পী হিসেবে। সেই ভাবেই প্রতিভাত হয়। যদিও উনি নিজেকে নিসর্গ শিল্পী বলতে বেশি পছন্দ ভালোবাসেন। এটা একটু বিতর্কিত। যেভাবে উড়ন্ত পাখি। সমস্ত ভূপৃষ্ঠকে একটা গালিচার মতো দেখে। ধান ক্ষেত, নদী নালা স্থাপত্য, গাছপালা তারই ছায়া আছে সব চিত্রপটে। পটটি নানা ভাগে বিভাজিত। গানিতিক ও জ্যামিতিক চিহ্নের মতো নানা সংকেত তাতে। ওনার নিজস্ব সইটিও তেমনি। গানিতিক চিহ্নের মতো। এই প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে এই প্রসঙ্গ এলো এই জন্য যে, কেন্দ্রের আছে সমাজ। আছে প্রাণ ও নরনারী, শিশু। উনি দীর্ঘকাল প্রাচীন পুরাণ, তার সমাজ, জাতক কাহিনি এর মধ্যে বসবাস করেছেন যৌবনে। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে এই কাজে হাত দিলেন। তাও খুবই স্বল্প সংখ্যক। একটা বিদ্যুৎ ঝলকের মতো তারা এলো ও চলে গেলো। সম্মোহিত করে গেল। এটা একটা আবিষ্কারও বটে। আমরা তার সাক্ষী রইলাম।

যে ধুসর, মেটে খয়েরি, হলুদ, মাটি রঙা, কালোও বাতিদানের শিস ওটা কালো। মাটি লাল, শ্যাওলা সবুজ, এমন রঙই দেখেছিলেন অজন্তায়। এই রঙের পরও ওনাকে সারাদিন রাত ঘিরে থাকতো। সেই ছায়া বাকি জীবনে রয়ে গেল, সমস্ত কাজেই। বেনারস, শান্তিনিকেতন, তালসারি সমস্ত কাজেই তারা বর্তমান।
উনি বাস্তবকে অনুসরণ করতে ভালোবাসেন না। বাস্তবকে নিজের বাস্তব বানিয়ে তুলতে ভালোবাসেন।
তারই প্রতিফলন এই বহু সংখ্যক কাজ। যে দৃশ্যের ছায়া, এই কাজগুলো ঘিরে রেখেছে তা বিস্ময়কর, সচরাচর ওনার কাজে তার ছায়া পড়তে আমরা দেখি না। নিসর্গ চিত্র রচনায়, বাস্তব সম্মত কাজে, জল রঙে, রেখা চিত্রে আমরা অনেক নমুনা দেখেছি, কিন্তু এই কাজগুলির বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ন ভিন্ন, যা জীবনে একবারই আসে, এবং ফিরে যায়। কেন আর আঁকলেন না। তাও রহস্য।
খুবই উপভোগ্য এই প্রদর্শনী, দেবভাষাকে ধন্যবাদ এমন একটি মনোগ্রাহী প্রদর্শনী উপহার দেওয়ার জন্য। এই প্রদর্শনী চলাকালীন ওনার বেনারস স্কেচ খাতার মোড়ক উন্মোচন হয়, একটি মনোগ্রাহী আলোচনাও আমরা শুনতে পাই, আমার সঙ্গে তার মধ্যে ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনাও ঘটে। সংলাপ বলা যায়, গুরু শিষ্যের সংলাপ।
গুরু-শিষ্য, গণেশ হালুই ও হিরণ মিত্র
______________________________________________
স্বনামধন্য শিল্পী গণেশ হালুই তাঁর জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন ঘাটশিলার সুবর্ণরেখার এপার ওপারের অন্তহীন আদিবাসীদের জীবনপ্রবাহে আর অজন্তার কাছে লেনাপুরে বাস করা মানুষের নিরীহপনা প্রত্যক্ষ করে। ১৯৯৫-এ আঁকা কিছু মুখাবয়বের মধ্যে তিনি তুলে ধরেন সেই দেখা। এতদিন অপ্রদর্শিত অবস্থায় থাকা সেই ছবিগুলি নিয়েই দেবভাষা বই ও শিল্পের আবাস-এর ‘এক্সক্লুসিভ’ প্রদর্শনী ‘প্রেজেন্স অ্যান্ড অ্যাবসেন্স’ (Presence & Absence)। প্রকাশিত হয়েছে এই ছবিগুলি নিয়ে শিল্পীর স্বাক্ষর-সহ সীমিত সংস্করণের এক ব্যতিক্রমী প্রকাশনা, সেই সঙ্গে শিল্পীর ১৯৯৬ সালের বারাণসী স্কেচখাতার ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণও। একমাসব্যাপী এই প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ৪ জুন, চলবে ৪ জুলাই অবধি, রবিবার বাদে। ঠিকানা- ৭০/২ সেলিমপুর রোড।