
হরেন দাসের উডকাট। ছবির টাইটেল- Fishing (১৯৫০)
হরেন দাস (Haren Das)-কে আমি চিনেছি ওঁর কাজ দেখে। উনিশ শতকের বাঙালি ছাপাই চিত্রকর-দের মধ্যে প্রজ্জ্বলতম নাম হরেন্দ্র নারায়ণ দাস। আজকের সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়, সে সময় সরকারি আর্ট স্কুল ছিল। ১৯৩৮ সাল নাগাদ উনি পাশ করেন। ততদিনে তিনি গ্রাফিক, কাঠখোদাই, লিথোগ্রাফ, এচিং ইত্যাদি প্রায় রপ্ত করে ফেলেছেন। তবে এর মধ্যে কাঠখোদাইয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা আসে সবচেয়ে বেশি।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, হরেনবাবু তাঁর গুরু রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর থেকে প্রাথমিক তালিম নেন। যিনি আর্ট স্কুলের ছাত্র, পরে ১৯২৯ নাগাদ শিক্ষক পদেও যোগ দেন। সে সময় মুকুল দে আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ। এই মুকুল দে-কেই ভারতীয় ‘ড্রাই পয়েন্ট’ ছাপচিত্রের জনক বলা হয়। হরেনবাবুর কাজে মুকুল দে-র প্রভাব না থাকলেও রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সরাসরি প্রভাব ছিল। ওঁর কাজ প্রত্যক্ষ করলেই তা বোঝা যাবে।
.jpg)
হরেন দাস (১৯২১-১৯৯৩)
সরকারি আর্ট কলেজে যে আজকের প্রিন্ট মেকিং বিভাগ দেখি, তা হরেনবাবুর প্রত্যক্ষ পরিশ্রমেই তৈরি হয় ১৯৫১-এর কিছু পরে। তখন তিনি শিক্ষকতা করছেন আর্ট কলেজে। আর্ট স্কুল থেকে আর্ট কলেজ হয়ে গিয়েছে ততদিনে। ওই সালে তিনি প্রভাষকও হয়েছিলেন আর্ট কলেজের।
ওঁর সমসাময়িক ছাপাইচিত্রীদের প্রায় সকলে যে ধারায় কাজ করছিলেন, হরেনবাবু তাঁর পেইন্টিং-এর ক্ষমতাকে সম্বল করে স্বাভাবিকতাবাদী বা ন্যাচারালিস্টিক ধারায় কাজ করতে লাগলেন। যা নতুনত্ব দিল মাধ্যমগত দিক থেকে। কাজেই হরেন দাসের ছবিতে একটা পেইন্টারলি কোয়ালিটি লক্ষ্য করা যায়।
হরেনবাবুর কাজে আলোর খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। সম্ভবত ডাচ শিল্পীদের আলোর ব্যবহার উনি দেখেছিলেন। যা ওঁর সমসাময়িক ছাপচিত্রীদের ছবিতে ততটা প্রাধান্য পায়নি। আর্ট কলেজের শিক্ষাই হয়তো ওঁর এতো ভালো আলোর ধারণা তৈরি করেছিল।

হরেন দাসের উডকাট
হরেন দাসের ছবি-তে (Haren Das Painting) আলোর খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে। সম্ভবত ডাচ শিল্পীদের আলোর ব্যবহার উনি দেখেছিলেন। যা ওঁর সমসাময়িক ছাপচিত্রীদের ছবিতে ততটা প্রাধান্য পায়নি। আর্ট কলেজের শিক্ষাই হয়তো ওঁর এতো ভালো আলোর ধারণা তৈরি করেছিল। কাজেই ‘আলো’ ছাড়া হরেনবাবুর ছবি বিশ্লেষণ করা যায় না।
হরেন দাস উত্তর কলকাতার সেকেলে বাঙালির রুচিটা বুঝে ফেলেছিলেন। তাই খুব শীঘ্রই বাঙালির ঘরে ঘরে ছেয়ে গেলো ওঁর প্রিন্টগুলি। বহু বাংলা ক্যালেন্ডারেও ওঁর কাজের প্রিন্ট বেরোতে লাগলো। যা সাধারণ মানুষের রোজনামচার অংশ করে দিলো হরেন দাসকে। সাধারণ কেজো মানুষের ছবি এঁকেছেন তিনি আজীবন। কাজেই খুব দুর্বধ্য ছিল না সেসব কাজ। ওঁর সমসাময়িকরা ক্রমে নিজের কাজের ধারা বদলে ফেলেছেন। কিন্তু হরেনবাবু একইরকম ফর্মে নিজের কাজের চর্চা করে গিয়েছেন। যা আমায় খুবই অবাক করে। একই বিষয়বস্তু নিয়ে, একই মাধ্যমে, একইরকম উৎসাহের সঙ্গে দীর্ঘদিন চর্চা করে যাওয়া ভীষণ কঠিন ও একঘেয়ে। সর্বকালের সব শিল্পীই তাই নিজের কাজের ধারা বদলে ফেলেছেন।
.jpg)
এচিং অন পেপার। ছবির টাইটেল- Ferry Boats (১৯৫৮)
ওয়েস্টার্ন একাডেমিক আর্ট আর ইস্টার্ন ওরিয়েন্টাল আর্ট-এর মাঝামাঝি একটা ফর্মকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। যে ফর্মকে বাস্তবধর্মীই বলা চলে। কিন্তু কখনোই ছবির ফিগারেটিভ ক্যারেক্টারগুলো খুব কেঠো বা খুব কোমল হয়ে যায়নি, বরং একটা ‘ব্যালেন্স’ সর্বদাই বজায় ছিল।
একথা সর্বত্র বলা হয় যে, হরেনবাবু নাকি সারাজীবন সুন্দরের চর্চা করে গিয়েছেন। যদিও আমার এই ‘সুন্দরের পূজা’ ভীষণ বাড়াবাড়ি লাগে। ঐ একই সময়ে দুর্ভিক্ষ হয়ে গিয়েছে বাংলায়। রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলেছে দীর্ঘদিন। সেসবের লেশমাত্র প্রতিফলন নেই হরেনবাবুর শিল্পে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া।
একজন শিল্পীকে সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন হলে চলে না। জীবন এই সবকিছু নিয়েই তো ‘সুন্দর’। আমি বিশ্বাস করি শিল্পীর প্রতিবাদও হবে তার শিল্পেই। সেই প্রতিবাদের ভাষা প্রায় ছিলই না হরেনবাবুর ছবিতে। যা দুর্ভাগ্যজনক। দু-একটা ব্যতিক্রমকে অগ্রাহ্য করছি না মোটেই। যেমন ওঁর সমসাময়িক সোমনাথ হোর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন, প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে হরেনবাবু গ্রামীণ সৌন্দর্য নিয়ে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছেন। হতে পারে এটা ওঁর সচেতন সিদ্ধান্ত। এই সমাজ বিমুখতার মধ্যে সত্যকে অস্বীকার করাও কি লুকিয়ে নেই? আমার জানা নেই।
.jpg)
হরেন দাসের লিনো। ছবির টাইটেল- Water Lily (১৯৯০)
শিল্পের বিষয় চয়ন সম্পর্কে সমালোচনা থাকলেও, হরেন দাস ছাপাই চিত্রের জগতে স্থায়ীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তৈলচিত্রের বাজারে অন্য মাধ্যমকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ কাজ না। ওঁর কাজের প্রতি দৃঢ় আনুগত্যই এই সাফল্যের বীজমন্ত্র।
হরেন দাসের পেইন্টিং-এ বিষয়ভিত্তিক নতুনত্ব না থাকলেও, এক চেনা সুরের আনন্দ আছে। যা রোজকার অস্থির কলকাতার মধ্যেও ভীষণ শান্ত, স্থির। কোনো নাগরিক কোলাহল নেই সেখানে। নাকি নিভৃতে আছেই!
হরেন দাসের ছবিতে বিষয়ভিত্তিক নতুনত্ব না থাকলেও, এক চেনা সুরের আনন্দ আছে। যা রোজকার অস্থির কলকাতার মধ্যেও ভীষণ শান্ত, স্থির।
.jpg)
ড্রাই পয়েন্ট অন পেপার। ছবির টাইটেল- Mother and Child (১৯৪৫)
১৯৫৫-৬০ পর্যন্ত ভারত তথা বাংলায় কোনো দীর্ঘস্থায়ী, কার্যকরী ছাপচিত্রের বাজার ছিল না। বলা যায় একচেটিয়াভাবে দেশে-বিদেশে প্রদর্শনী করে হরেনবাবুই একটা পাকাপাকি বাজার তৈরি করে ফেলেন। যা যথেষ্ট সাহসের চিহ্ন রাখে।
একথা স্বীকার করতেই হয়, হরেনবাবু ছাপচিত্র মাধ্যমকে এমনভাবে আত্মস্থ করে ফেলেছিলেন যে, হরেন দাস ও ছাপাইচিত্রকে আলাদা করে দেখা যায় না। প্রযুক্তিগত দিক থেকে প্রিন্টগুলো ছিল উন্নত। ছবিগুলো দেখলে সবসময়ই কোনো মেঠো সুরের গান বা কবিতার কথা মনে হয়। আরও পরিষ্কার করে বললে, ওঁর ছবিতে সারিন্দার সুর বা কবির কাব্যগুণ ছিল। তাই শিল্পী হরেন দাসের ছবি শুধু রেখা-রঙের বিন্যাস নয়, যে শুধু দেখলেই শেষ হয়ে যায়। চাইলে শোনাও যায়। অবশ্য সে সুর শোনার জন্য সংবেদনী মন প্রয়োজন।

