শর্বরী রায়চৌধুরী : সংগীত আর কবিতার আদলে মূর্তি গড়তেন যে ভাস্কর

২১ ফেব্রুয়ারি, তাঁর প্রয়ানদিন

“অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ
সীমা হতে চায় অসীমের মাঝে হারা” 

১৯৩৩-এ পূর্ব বাংলায় জন্ম। মা একটু একটু ছবি আঁকতেন, আলপনা -টালপনা দিতেন। কখনও মায়ের হাতে এক দলা মাটি তুলে দিয়ে বায়না জুড়তেন, ‘পাখি না বানিয়ে দিলে ঘুমাবো না।’ একবার একটা কুকুর বানিয়েছিলেন, যার কোমরাটা সোজা হয়েছিল। মা বুকের দিকটা চওড়া করে কোমরের দিকটা সরু করে দিয়েছিলেন। এভাবে ছোটোবেলাতেই মায়ের থেকে পেয়েছিলেন শিল্পের পাঠ। চিনতে শিখেছিলেন আপন শিকড়কে। ছোটোবেলা থেকে মাটি ছিল তাঁর প্রিয়বন্ধু। 

 শর্বরী রায়চৌধুরী (Sarbari Roy Chowdhury) প্রথম কলকাতায় আসেন ১৭ বছর বয়সে। খেলাধুলো করতেন না, সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন না, খালি মাটি আর মাটি। তাঁর দাদার ধারণা হয়েছিল বাড়িতে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবেন। তাই জোর করে তাঁকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কলকাতায় এসে বিদেশী শিল্পসংক্রান্ত জার্নাল ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। ধীরে ধীরে ঢুকে যান এক অন্য জগতে। পাশাপাশি লুকিয়ে লুকিয়ে মাটি নিয়ে হাতের কাজও চলতে থাকে। পরে তাঁর গুরু, ভাস্কর প্রদোষ দাশগুপ্তের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৫১ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। প্রদোষ দাশগুপ্ত ছিলেন মাস্টারমশাই। মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে যে ঘরে তিনি থাকতেন, তার পাশের ঘরে একটা বড়ো আয়না ছিল। তখন মডেল পেতেন না বলে নিজেকে নগ্ন করে আয়নায় দেখে নিজের স্কেচ করতেন। পরে সেই স্কেচ থেকে নিজের মূর্তি বানিয়েছিলেন।

তারপর ভারত সরকারের সংস্কৃতি বৃত্তি পেয়ে বরোদা এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ভাস্কর্যের কাজ শিখতে যান। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে, ইতালি সরকারের কাছ থেকে বিশেষ বৃত্তি পেয়ে ফ্লোরেন্সের ‘একাডেমিয়া ডি বেলে আর্তি’-তে (Academia di Belle Arti) ভাস্কর্য শিক্ষা নেন। সেখানে তাঁর শিল্পজীবন নতুন ডাইমেনশন পায়। বিখ্যাত সব ইউরোপীয় শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। ইতালিতে থাকাকালীন পৃথিবীর তাবড় তাবড় ভাস্করদের সঙ্গ করেন – তাঁর ভাস্কর্য শৈলীতে মিশে আছেন আলবার্তো জিয়াকোমেত্তি, হেনরি মুর এবং মারিনো মারিনি’র মতো ভাস্কর। শিল্প-জহুরিরা তা বিলক্ষণ চেনেন।

বিশ্বখ্যাত ভাস্কর মারিনো মারিনি'র সঙ্গে,১৯৬২-তে ইতালির মিলানে তাঁর স্টুডিওতে। শর্বরী রায়চৌধুরী আজীবন তাঁকে গুরু মেনেছেন

বিশেষত কীভাবে মানবদেহকে বিমূর্ত করে তোলা যায়, তার শিক্ষা ও বোধ তৈরি হয়েছিল মারিনি আর মুর-এর তত্ত্বাবধানে, একথা নিজেই বলতেন। হেনরি মুর শর্বরীর কাজের প্রশংসা করেছিলেন শুধু তাই নয়, ইউকে-তে থাকাকালীন ওঁর একটা ভাস্কর্যও কিনেছিলেন। প্যারিসে জিয়াকোমিত্তি-ও শর্বরীর ভাস্কর্য সংগ্রহ করেছিলেন। 

প্রথমবার জিয়াকোমিত্তি’র স্টুডিওতে গিয়ে নিজের কাজ সম্বন্ধে মতামত জানতে চেয়েছিলেন। জিয়াকোমিত্তি’র তখন ষাট। তিনি বলেন, দ্যাখো, আমি নিজেই কনফিউজড্‌, নিজে কিছু শিখিনি। তোমাকে কী বলবো! অবশ্য পরে মতামত জানিয়েছিলেন।

মারিনিকে একবার নিজের করা একটা মেটাল সীটের মূর্তি দেখিয়েছিলেন। দেখে মারিনি বলেছিলেন, এই ফর্মটা খুব ঠান্ডা। এটা একমাত্র বরফের দেশের জন্যে মানানসই। তুমি আমার সঙ্গে একটু বেশি সময় কাটাতে পারলে ফর্ম-এর ওয়র্ম কোয়ালিটি কী করে হয়, আমি প্রাক্টিক্যাল জেমনেসট্রেশন দিয়ে বোঝাতে পারতাম। শর্বরী মাত্র দুদিন তাঁর স্টুডিওতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।  

“আজি এ নিরালা কুঞ্জে আমার অঙ্গ-মাঝে
বরণের ডালা সেজেছে আলোকমালার সাজে”

জীবনের এই পর্যায়টা বিদেশে কাটিয়ে দেশে ফিরে, পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতনে থাকতে শুরু করেন। ইতিমধ্যেই ভাস্কর হিসেবে তাঁর বিশেষ নামডাক হয়েছিল। ১৯৬৯ সালে কলাভবনে শিক্ষকতার শুরু। তখন কলাভবন-অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছেন দিনকর কৌশিক। সেই সময় কলাভবনকে নতুন ভাবে সাজিয়ে তুলছেন তিনি। গ্রাফিক বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন সোমনাথ হোর-কে, পরে সনৎ কর, চিত্রকলায় সুহাস রায়, ভাস্কর্য বিভাগে শর্বরী রায়চৌধুরীকে। শর্বরীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, রামকিঙ্কর বেইজ এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। 

খালেদ চৌধুরী ও সোমনাথ হোরের সঙ্গে

প্রথমে শিক্ষকতা করা নিয়ে আপত্তি ছিল, শর্বরী ভাবতেন তাতে ওঁর শৈল্পিক চেতনার ক্ষতি হবে। তবে অল্পদিনেই শিক্ষক হিসেবেও নজর কেড়েছিলেন। স্বতন্ত্র শৈলীর সন্ধান জারি রাখতে হবে – এই বলে ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন। কলাভবনের অনেক কিছুই তাঁর হাতে শুরু। তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রোঞ্জ ঢালাই (bronze casting)  প্রবর্তন করেন। শান্তিনিকেতনে শিল্প মেলা (যা আমরা নন্দনমেলা নামে জানি) শুরু করার তিনি অন্যতম কাণ্ডারি। প্রসঙ্গত, অনেকেই জানে নন্দলাল বসু-র নাম অনুসারে ‘নন্দনমেলা’। তা ঠিক নয়, এখানে ‘নন্দন’ হচ্ছে, ইংরেজিতে যাকে আমরা ‘aesthetics’ বলে থাকি। যদিও মেলার নামে শব্দের সাদৃশ্যে জড়িয়ে রইলেন নন্দলাল। মেলার আয়োজন হয়েছিল তাঁরই জন্মদিনের পূর্ব মুহূর্তে। 

কলাভবনের অনেক কিছুই তাঁর হাতে শুরু। তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রোঞ্জ ঢালাই (bronze casting) প্রবর্তন করেন। শান্তিনিকেতনে শিল্প মেলা (যা আমরা নন্দনমেলা নামে জানি) শুরু করার তিনি অন্যতম কাণ্ডারি।

১৯৬৯-এ শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করের সঙ্গে 

“আমার দোসর যে জন ওগো তারে কে জানে
একতারা তার দেয় কি সাড়া আমার গানে কে জানে”

প্রিয় ‘কিঙ্করদা’-কে কোনও স্কালপচার বা মূর্তি গড়তে দেখেননি তিনি। অল্পবিস্তর পেইন্টিং করতে দেখেছিলেন। তিনি যে সময় শান্তিনিকেতন গেছিলেন, রামকিঙ্কর কাজ করার ক্ষমতা অনেকখানি হারিয়েছেন, রিটায়ার করে গেছেন। অথচ, শর্বরী কলাভবনে যোগদান করার পর, তাঁর নতুন পরিচয় শুধুমাত্র একজন তরুণ অধ্যাপক নয়, সবার প্রত্যাশা তিনি হবেন রামকিঙ্করের উত্তরাধিকারী। কে কী ভাবছে তা নিয়ে ভাববেন রামকিঙ্কর বেইজ, শর্বরী রায়চৌধুরী! দুজনেই তো ব্যতিক্রমী ধাতু দিয়ে গড়া। একে অপরের ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। অসমবয়সী সমমনস্ক বন্ধুত্ব। রামকিঙ্করের পরিচিতি মূলত বিরাট সব অবয়বকেন্দ্রিক ভাস্কর্যের জন্য। অন্যদিকে, শর্বরীর মুন্সিয়ানা ছোটো আকারের ভাস্কর্যে–অন্তরঙ্গ সংবেদনে গড়া। দুজনেই দক্ষ প্রতিকৃতি-শিল্পী কিন্তু দুই ভিন্ন শৈলীতে। অমিলের সঙ্গে মিলও ছিল। দুজনেই নিজেদের মতো করে অস্বীকার করেছেন দৈনন্দিনতাকে। প্রাতিষ্ঠানিক ঘেরাটোপে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না দুজনেই।   

 

শান্তিনিকেতনে শর্বরী রায়চৌধুরীর বাড়িতে, তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলের সঙ্গে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

“আমার মনের মাঝে যে গান বাজে শুনতে কি পাও গো
আমার চোখের ’পরে আভাস দিয়ে যখনি যাও গো”

গান বাদ রেখে তাঁকে নিয়ে আলোচনা চলে না। ২১ ফেব্রুয়ারি, শর্বরী রায়চৌধুরীর প্রয়াণদিবসে মনে হলো তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যায়কে রবীন্দ্রগানের পংক্তির সঙ্গে জুড়তে জুড়তে যাই। ছোটোবেলা থেকেই ধ্রুপদী গানের প্রতি তাঁর অনুরাগ। একাধারে সংগীত-রসিক, সংগীত-সংগ্রাহক – সংগীতকারদের প্রকৃত বন্ধু ছিলেন। তাঁর সংগীতপ্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এখনও 'শর্বরী রায়চৌধুরী সংগীত উৎসব' হয়। বরোদাতে থাকাকালীন প্রচুর ৭৮আরএমপি-র রেকর্ডস সংগ্রহ করেছিলেন। নিজেই লিখেছেন, “বরোদার সুর-সাগরের পাড়ে একটা দোকানে রেকর্ড বিক্রি হত। জীবনে প্রথম রেকর্ড কিনি আবদুল করিমের। ঝিঞ্জিটি রাগে গেয়েছিলেন—‘পিয়া বিনা নাহি আওয়াত চইন।’ কী নম্র মধুর সারগম আর তান। প্রাণ ভরে যায়।” এভাবে গানের নেশায় পড়লেন। সেই নেশায় পুরোনো রেকর্ড কিনতে শুরু করেন বরোদার সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট থেকে। দু আনা’র রেকর্ড ডজন দরে কিনতেন। সেখানেই আবিষ্কার করেন জৌনপুরীতে গাওয়া জোহরা বাঈয়ের গান। গান যে এমন হতে পারে আর মানুষ যে এমন গাইতে পারে, সেটা অবিশ্বাসের মতো মনে হতো তাঁর। নেশায় আরও বুঁদ হয়ে গেলেন। এতটাই যে লিখেছিলেন, “আমি যদি গানের কোয়ালিটি আমার একটা কাজেও রূপ দিতে পারতাম, ধন্য মনে করতাম নিজেকে।”     

বড়ে গুলাম আলি খান থেকে শুরু করে আলি আকবর খাঁ, হীরাবাই বরদেকর,জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার কেশরবাই কেরকার -সারাজীবন ধরে অসংখ্য গুণী সংগীতশিল্পীর ভাস্কর্য গড়েছিলেন। এ ছিল তাঁর প্রাণের আরাম।  

আলি আকবর খাঁ-র ভাস্কর্য গড়ছেন নিমগ্ন চিত্তে 

আশির দশকে উস্তাদ আমজাদ আলি খান শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তখনই শর্বরীর কাছে অনুরোধ করেছিলেন, গোয়ালিয়র প্যালেসে রাখার জন্য তাঁর বাবা, মায়েস্ত্রো হাফিজ আলি খানের একটি ভাস্কর্য বানিয়ে দেওয়ার জন্য। এই প্রস্তাবে যার পর নাই খুশি হয়েছিলেন শর্বরী। অল্প বয়সে খুব হাফিজ আলি খুব শুনতেন কিনা! কলকাতায় যতবারই হাফিজ সাব কনসার্ট করতেন, ছুটে যেতেন। সেই অনুরাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ব্রোঞ্চের মূর্তিটিতে।

শর্বরী রায়চৌধুরীর স্টুডিও-তে আমজাদ আলি খান 

শর্বরী বলতেন, “আমি বিশ্বাস করি যে প্রতিটি শিল্পীর অনুপ্রেরণার উত্স হল আদিরস। হতে পারে সেই কারণেই আ্মার বেশিরভাগ কাজ  মানবদেহের সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে গড়া। কাজের সময় আমি সেই ফর্মগুলো খুঁজি, যা শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর-তাল-ছন্দের ধারক। আমি আমার ভাস্কর্যের মাধ্যমে দৃশ্যগত সংগীত তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছি।”  

পরতেন উজ্জ্বল রঙের বিচিত্র নকশাযুক্ত কুর্তা, প্রায়ই দাড়ি সাজিয়ে তুলতেন কোনও একটা ফুল দিয়ে, কখনও রিকশাওয়ালাকে আসনে বসিয়ে নিজেই রিকশা চালিয়ে পৌঁছে যেতেন গন্তব্যে। কবিতার মতো জীবন কাটাতেন। একজন ‘ভদ্র’ শিল্পীর পক্ষে এইধরনের জীবনযাপন অন্য মানুষের কাছে পরিচিত নয়; সেই দিক থেকে শর্বরী রায়চৌধুরী ছিলেন রীতিবহির্ভূতদের দলে। তাঁর মধ্যে ছিল অপ্রত্যক্ষ ও আরও গভীর এক প্রথাবিরুদ্ধতা।      

_____________
ব্যাবহৃত পংক্তি – রবীন্দ্রসংগীত

তথ্য ও ছবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার : 
Sarbari Roy Chowdhury Foundation
কলাভবনের ‘নন্দন মেলা’ কিন্তু নন্দলাল বসুর নাম অনুসারে নয় – সুশোভন অধিকারী (robbar.in)

প্রতিক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত শর্বরী রায়চৌধুরীর লেখা ‘আমি ও আমার সময়’

Developed by DXDasia