নন্দন মেলা নিয়ে কলম ধরলেন কলাভবনের প্রাক্তনী চৈতী নাথ
আসছে! আসছে! আসছে!
এসে গেছে! এসে গেছে! এসে গেছে!
শেষ হয়ে গেলো, কাল ভোর চারটেতে পাক্কা!
নন্দন মেলার আবহটাই আসলে এইরকম। চমকপ্রদ। জনপ্রিয়। শৈল্পিক প্রকাশের গভীর চেতনায় মোরা উচ্ছ্বলতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এর উৎসে লুকিয়ে আছে মাস্টারমশাই নন্দলাল বোসের সূক্ষ শিক্ষা-ভাবনার অনুপ্রেরণা। আজ ৩ ডিসেম্বর ২০২২, মাস্টারমশাইয়ের ১৪০তম জন্মদিন। 'এদিন আজই কোন ঘোরে গো খুলে দিলো দ্বার' গানের মধ্যে দিয়ে কলাভবনের মাস্টার মশাই এর স্টুডিও (এখন শিল্প-ইতিহাস বিভাগ) থেকে গৌর প্রাঙ্গণ ঘুরে নিকটেই, মোমবাতির আলোয় আলোকিত বৈতালিকি পৌছোয় তাঁর বাসস্থানে। মোমবাতি সজ্জিত অবহে, প্রসিদ্ধ-প্রয়াত-ছাত্রদরদি শিক্ষকের আশীর্বাদ গ্রহণ করতে, শীতের ভোর কে ভয় করে না কেউ। এক সারিতে দাঁড়িয়ে গুড়ের সন্দেশ খেতে খেতে মনে হয়, এ যেনো এক শৈল্পিক তীর্থস্থলের নৈবেদ্য।

১৯৭২ সালে কলাভবনের প্রথম বর্ষের ছাত্র বীরেন বোরা এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। তখন তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রচুর টাকার দরকার ছিল। ছাত্রছাত্রী-অধ্যাপকেরা মিলে ঠিক করলেন, ছাত্র তহবিলের জন্য একটি স্থায়ী তহবিল গড়ে তুলতে হবে। তার ঠিক পরের বছর থেকেই শুরু হল নন্দন মেলা। এই মেলা থেকে উপার্জিত অর্থ জমা পড়ে তহবিলে। এই ভাবনাটি যাঁদের মাথায় প্রথম আসে তাঁরা হলেন, প্রয়াত শিল্পী দিনকর কৌশিক এবং অজিত চক্রবর্তী।
কলাভবনের এই নন্দন মেলা বর্তমানে শিল্প ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শিল্পকর্ম বিক্রি থেকে উপার্জিত অর্থ ছাত্রছাত্রী কল্যাণ তহবিলে জমা পড়ে এবং মাস্টারমশাইকে স্মরণে রেখেই নয়, তাঁর শিল্প ভাবনার প্রধান তিনটি স্তম্ভ – প্রকৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং লোকালয়ের সমস্ত মানুষকে শিল্পের সঙ্গে একাত্ম করে শৈল্পিক নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ।
ভয়াবহ অতিমারির নিরাপত্তাহীনতায় মোড়া দুবছর পেরিয়ে ২০২২-এ আবার অনুষ্ঠিত হয়েছে নন্দন মেলা – সেই একই দিনগুলোতে, ১ এবং ২ ডিসেম্বর বিকেলবেলায়, কলাভবন চত্বরে। বার্ষিক শিল্পপ্রদর্শনী সমস্ত 'শিল্প-বিদ্যালয়েই' হয় কিন্তু নন্দনমেলা তাদের সবার ব্যতিক্রম, আপন স্বাতন্ত্র্যে সে সবার থেকে আলাদা।

১৯৭২ সাল থেকে নন্দন মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে কলাভবন প্রাঙ্গনে; শুধুমাত্র মাস্টারমশাইকে স্মরণে রেখেই নয়, তাঁর শিল্প ভাবনার প্রধান তিনটি স্তম্ভ – প্রকৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং লোকালয়ের সমস্ত মানুষকে শিল্পের সঙ্গে একাত্ম করে শৈল্পিক নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ – স্মরণে থাকে এ সবকিছুই।
ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের যৌথ উদযাপনে গাছপালায় মোরা এই ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাস সেজে ওঠে। সে এক রোমহর্ষক পরাবাস্তবতা! শুধু প্রত্যেক বিভাগ; চিত্রশিল্প, টেক্সটাইল, গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক্স, ছাপচিত্রকলা, ভাষ্কর্য এবং শিল্প-ইতিহাস বিভাগের স্টলই নয়, নানা দেশের নানা স্বাদের হরেক গন্ধের বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবারের পসরা সাজিয়ে তোলেন ছাত্রছাত্রীরা। এইবারের আকর্ষণ বারাণসীর পান, দক্ষিণ ভারতীয় এবং রাজস্থানের সুখাদ্য, ত্রিপুরা সুন্দরী স্টলের বাঁশ পোড়া ভাতের সঙ্গে ক্ষীর এবং হরেক রকম কেক।
ছাপচিত্রকলা বিভাগের ২০২৩-এর ক্যালেন্ডার প্রত্যেক বারের মাস্ট বাই – তা বহন করে রাত জাগা উদীয়মান প্রিন্টমেকারদের অনুস্মারক – 'বছরের প্রত্যেক দিন নান্দনিক!' ভাস্কর্য এবং গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক্স এর মাটির, সেরামিক্স, কাচের এবং কাঠের মূর্তিগুলি চিরাচরিত গ্যালারি কেন্দ্রিক ট্র্যাডিশন বহন করে না – তারা লাগাম ছাড়া আবার চিন্তাশীল – একান্ত আলোচনায়, কনভারসেশন স্টার্টার্স। টেক্সটাইল স্টলের বাটিক, সেলাইশিল্প, সিল্ক স্ক্রিন প্রিন্টের হরেক পসরার পাশাপাশি, টি-শার্টের ইলাস্ট্রেটিভ ডায়ালগস সবার মন কেড়ে নিয়েছে এই বছর। পেন্টিং বা চিত্রশিল্প স্টলের সরা যেমন নান্দনিক, তেমন আকর্ষণীয় – শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীদের তৈরি প্রতিটি কাজই কালেক্টিবলস। শিল্প-ইতিহাস বিভাগের উদীয়মান শিল্প-ঐতিহাসিকরা অনেকটা অনুসন্ধানকারী শিল্পী। তাঁদের জ্ঞাপন নানা মাধ্যমে – ছোটো কথোপকথনধর্মী বই, গ্রাফিক নভেল, চটি বই, স্ল্যাপস্টিক, ম্যাগাজিন সার্চিং লাইনস, মজার সরা, বুকমার্ক এবং রাশি রাশি ইলাস্ট্রেটেড পোস্টকার্ড। এই বিভাগের অধ্যাপক-অধ্যাপিকারা মিলে তিন বছর পর প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক 'নন্দন' জার্নাল – যা শিল্পের অ্যাকাডেমিক্স জগতের এক অনবদ্য পাওনা।
এইবারের নন্দন মেলার ইন্সটলেশনগুলি শুধুমাত্র আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেলা উৎসুকদের প্রশংসা পাওয়ার জন্যেই তৈরি হয়নি – এরা অনুভুতির যোগ্য। সবকটিই দর্শকদের অংশগ্রহণ করার জন্য চূড়ান্তভাবে আহ্বান জানায়। উদাহরনস্বরূপ, খড় এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি বিশাল আকারের কিনেটিক ঘোড়া – কত শিশু এতে চেপে 'বার্ড আই' ভিউতে নন্দন মেলা দেখেছে এবং দূরের স্টলের কোনো এক মাটির পুতুলের প্রতি আকর্ষিত হয়েছে। স্থানীয় উপাদানে তৈরি এই লার্জ স্কেল স্কাল্পচারগুলি শিল্প থেকে দর্শকদের দূরত্ব ঘোচানোর মধ্যে দিয়েই মাস্টারমশাইয়েরর শিল্প ভাবনার পরিতৃপ্তি ঘটায়।

এইবার নন্দন মেলার আরও কতগুলো মজার কথা বলি। ২২টি সাইট স্পেসিফিক ভাস্কর্য, ইন্সটলেশন ছাড়াও প্রতিবারের মতো এবারও নন্দনমেলার প্রধানতম আকর্ষণ কিন্তু জগঝম্প। ৪টে থেকে ৮টার মেলায় রোজ ৪টি শো হয়েছে এইবার। টিকিটের মূল্য মাত্র ১০ টাকা। তবে, জগঝম্পের এই অসম্ভব হাস্যকর ভবনকেন্দ্রিক রিয়েলিস্ট নাটকে যাই ঘটে, তার সবটুকু ওই নাট্য-ক্যাম্পের ঘেরাটোপের মধ্যেই শুরু আর সেখানেই শেষ। ভবন-জাত মজা মশকরা ডার্ক হিউমারে মোরা 'আর্ট-ডাস্ট' কমিক ফেরি করে বেড়ানো ছাত্রছাত্রীরা কখনওই আপনাকে জানাবে না, এখানে কে বা কারা লেখা-জোখা করেছে – তাহলেই সেখানে এই মজার ইতি। তাই আর্ট-ডাস্ট-এর পাতা উল্টেপাল্টে অজানা অচেনা তথ্য দেখাই হচ্ছে সবচেয়ে মজার এবং অভিনব। এইবার আরও কিছু মজার কাণ্ড ঘটেছে – কয়েকটি স্বতন্ত্র পারফর্মেন্স। উদাহরণস্বরূপ, এক ছাত্রী তার সারা গায়ে উল্টো করে অল্পিন সেঁটে, একটি ছবির মাধ্যমে ভরা মেলায় সবাইকে আলিঙ্গনের আহ্বান জানিয়েছে। মজার দৃশ্য হলেও, এ এক চিন্তাশীল এক্সপেরিমেন্ট!
কলাভবনের এই নন্দন মেলা বর্তমানে শিল্প ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শিল্পকর্ম বিক্রি থেকে উপার্জিত অর্থ ছাত্রছাত্রী কল্যাণ তহবিলে জমা পড়ে।


চীনা বটের চাতালে বিকেল থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পটপৌরি। সার্বিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে, চদরবদর পুতুল নাচের সঙ্গতে শান্তিনিকেতনের সাঁওতাল গোষ্ঠীর নৃত্যানুষ্ঠান। তবে গেছো বেদিগুলোর আনাচেকানাচে লক্ষ্য করলে বা কালো বাড়ির উঠোনে উৎসুকেরা ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পাবেন আরও অনেক কাঠ জ্বালানো আগুন পোহানো গান-গল্পে মোড়া স্মৃতির খেউড়। ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বয়ে আসা শিল্পে-স্নেহে-যত্নে আগলে রাখা কলাভবনকে নতুনভাবে দেখার ও অতীতের স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার আনন্দযজ্ঞ, এই নন্দন মেলা।
____
ছবি – মৈত্রেয়ী মুখার্জি (কলাভবন)