হিরণ মিত্রের একক প্রদর্শনী ‘Art in everyone’
ছবি- পীতম চট্টোপাধ্যায়
তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। অচেনা মানুষ, অন্য মুলুকে এসে মাছের বাজারের ঠিকানা জিজ্ঞেস করছি দেখে একজন খুব অবাক, একজন খুব আক্ষেপের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘এখন কি আর মাছ পাবেন দিদি?’ একজন ধরতে পারলেন। বললেন ‘ছবি দেখতে এসছেন, তাই না? ওই তো সোজা গিয়ে ডানহাতে।’
সোজা গিয়ে ডানহাতে, বড়ো রাস্তার পাশে সরু গলিতে ঢুকেই ২০০-২৫০ বছর পুরোনো কালীবাবুর মাছের বাজার। আর পাঁচটা পরিচিত মাছের বাজারের মতোই। পার্থক্য একটাই, গোটা বাজার জুড়ে ঝুলছে ১০ ফুটের মোট কুড়িটি ক্যানভাস। সাদা, কালো, লাল। কিন্তু কিছুতেই বাজার থেকে ছবিগুলোকে আলাদা করা যাচ্ছে না, যেন মিশে আছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে এক।

উপাদান নিয়ে বসে গেলেই, ছবি আঁকা হয় না। শিল্পী হিসেবে বিখ্যাত হয়ে অনেকেই সারাজীবন শুধু ‘নাম’ হয়ে থেকে যান। সই একসময় ‘অটোগ্রাফ’ হয়ে যায়, এমনকি আঁকা ছবিতেও। বিখ্যাত হবার গ্যাঁড়াকলে শিল্প অসাড় – জীবদ্দশাতেই শিল্পীর মৃত্যু হয়। বিখ্যাত হওয়ার সঙ্গে ছবি আঁকার কী সম্পর্ক? শিল্পচর্চা কী? শিল্পীর কাজ কী? শিল্প কীভাবে প্রদর্শিত করা যেতে পারে? সম্প্রতি এহেন প্রশ্নগুলোর লাগামহীন উত্তর হাওয়ার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হাওড়ার কালীবাবুর মাছের বাজারে। এটা একটা ঘটনা। দেখার মতো। সারা ভারতের ইতিহাসে এরকম কোনও ঘটনা ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩-এর আগে ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। বিদেশে হয়েছে। ‘হাওড়া জোনাকি’ নাট্য দলের উদ্যোগে, কালীবাবুর বাজার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সহায়তায় অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটিয়েছেন শিল্পী হিরণ মিত্র। তিনি এবার ৮০ ছোঁবেন। এখনও বুঝিয়ে চলেছেন বিকল্প, ব্যতিক্রমী, সচল শিল্পজীবনের মানে। গত ৩১ ডিসেম্বর ও ১ জানুয়ারি, দু’দিন ব্যাপী হিরণ মিত্রের একক ও মুক্ত চিত্রপ্রদর্শনী ‘আর্ট ইন এভরিওয়ান’ (Art in Everyone) প্রকৃত অর্থেই বোঝালো সবার মধ্যেই শিল্পের বাস।
বিখ্যাত হওয়ার সঙ্গে ছবি আঁকার কী সম্পর্ক? শিল্পচর্চা কী? শিল্পীর কাজ কী? শিল্প কীভাবে প্রদর্শিত করা যেতে পারে? সম্প্রতি এহেন প্রশ্নগুলোর লাগামহীন উত্তর হাওয়ার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিল হাওড়ার কালীবাবুর মাছের বাজারে। এটা একটা ঘটনা। দেখার মতো।
অনেকের মনে হতে পারে, ‘ছবির সম্মান গেছে’। স্বর্গীয় আবহাওয়া, ধূপধুনোর বদলে আঁশটে গন্ধ, ঘাম, নোংরা, দাঁড়িপাল্লা, বঁটি, লোয়ার-মিডল ক্লাসের মধ্যে গিয়ে, প্রদর্শনীটি না দেখে অনেকেই হয়তো নাকে রুমাল আর চোখে চশমা দিয়ে সম্ভ্রান্ত কায়দায় ফিসসিস করেছেন। শিল্পীর এসবে হেলদোল নেই। তিনি অন্য কিছু বানানোয় মন দিয়েছেন। প্রদর্শনীর পুরোটা সময় তিনি অক্লান্ত কথা বলছেন, সানন্দে ছবি এঁকেছেন। বাজারের, ক্রেতা-বিক্রেতার, বন্ধুদের, দর্শকদের। হিরণ মিত্রের ছবি-ভাবনার সমার্থক এই প্রদর্শনী। নাট্যব্যক্তিত্ব সুমন মুখোপাধ্যায় যেমন বলছিলেন, হিরণ মিত্রের পক্ষেই এই কান্ড ঘটানো সম্ভব, তাঁর ছবির ভাষাই এই পথ তৈরি করেছে।
আয়োজকদের মতে, দু'দিনে ৩০-৪০ হাজার মানুষের চোখে পড়েছে এই প্রদর্শনী। মাছ কিনতে এসে অপ্রত্যাশিত ভাবেই শিল্প ও শিল্পীর মুখোমুখি হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। শিল্পীর কথায়, “আরামদায়ক প্রদর্শনী কক্ষে এই মজা কি মিলবে? একবার এক প্রদর্শনীতে ছবি নিয়ে একজন পরিচিতের সঙ্গে আলোচনা করছি, হয়তো একটু জোরেই কথা বলছিলাম। এক ভদ্রলোক ছবি দেখতে দেখতে আমাকে ধমকে বললেন, আস্তে কথা বলুন, ছবি দেখতে অসুবিধা হচ্ছে। আমার জন্য এই মাছের বাজারই ভালো। কোনও ভান নেই, বোঝাবুঝির ঝামেলা নেই বরং বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুবিধে আছে।”

বাজারের প্রবেশপথে অন্যান্যদের সঙ্গে শিল্পী
বাজারের এক মাছ ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করলাম, কেমন লাগছে এসব? লজ্জা পেয়ে বললেন, “এসব কী আর আমরা বুঝবো? উনি শিল্পী মানুষ, সারাদিন ধরে আমাদের সঙ্গে থাকছেন। এরকম তো আগে কখনও দেখিনি।” ছবিগুলো দেখে কী মনে হচ্ছে? “কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু ওই ছবিটায় (একটা ছবি দেখিয়ে) যেরকম লাল রঙের ছিটে, মাছ কাটলে ওরকমই ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়।”

আমরা সকলেই কি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি? এটা কি স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের পরিপন্থী? সেকারণে হিরণ মিত্র ‘ঘ্যানঘ্যান’ করেন প্রতিষ্ঠানের ভাষার বিরুদ্ধে, সোচ্চার হন ক্ষমতার ভাষার বিরুদ্ধে। সিংহাসন চ্যুত হওয়ার ভয় নেই তাঁর। তাঁর ছবি সবসময়ই মাঠে-ঘাটে ঘুরেছে, অবাধে খোলা আকাশের নীচে প্রদর্শিত হয়েছে। মাছের বাজারে যদিও এই প্রথম। হাঁটার অসুবিধা স্বত্বেও তিনি হেঁটে চলেছেন, ৭৯-তে পৌঁছেও তাঁর নিরীক্ষা থামে না। তিনি কার্ত্তিকের জ্যোৎস্নায় জীবনানন্দের ঘোড়াদের ঘাস খেতে দেখেছেন, বিদেশের বনপথে ছবি ঘাড়ে নিয়ে হেঁটেছেন, প্রথাগত শিল্পশিক্ষা ত্যাগ করে কয়েক দশক ধরে নিজস্ব বানানোয় মজে আছেন। হিরণ মিত্র মানুষের শিল্পী, সমসাময়িক শিল্পী, সবসময়ের শিল্পী। ক্ষুধার্ত শিল্পী। তাঁকে ‘দাবায়ে রাখা’ যায় না। ছবি আঁকা তাঁর কাছে বিলাসিতা, শৌখিনতা বা বিখ্যাত হওয়ার কৌশল নয়। এটা একটা অনুশীলন, যা তিনি সবসময় চালিয়ে যাচ্ছেন। এটা ঠিক ‘রিভল্যুশন’ নয়, চিরন্তণ বিদ্রোহ। তিনি সবসময় চাইছেন একটা কাণ্ড ঘটাতে, জীবন্ত থাকতে। তাই অনিশ্চিত, আকস্মিক পরিস্থিতে নিজেকে ঠেলে দিতে ভয় পান না। বাংলা শিল্পীমহলে একটি স্পর্ধার নাম হিরণ মিত্র।
‘আর্ট ইন এভরিওয়ান’ শীর্ষক প্রদর্শনী কোনও শিল্প-মাফিয়া আয়োজিত লেনদেনের ফাঁপা ইভেন্ট নয়। বাজারে আয়োজিত হয়েও এই প্রদর্শনী বাজারি নয়। এই প্রদর্শনী আগামীকে ভরসা দেবে। এক কথায়, ফাটিয়ে দিয়েছেন হিরণ মিত্র। ক্ষতিকর, গতিহীন রক্ষণশীলতা ফেটে পড়েছে।