শিল্পীরা মানুষের ভালো-খারাপ টের পায়, মানুষরূপী জন্তুদের দেখতে পায় : সমীর আইচ

বিশিষ্ট শিল্পী সমীর আইচ-এর সাক্ষাৎকার

তিনি বরাবরই অন্য রুটে হেঁটেছেন। তাঁর ছবিতে প্রাধান্য পেয়েছে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ভালোবাসেন কবিতা, গান – যা কোনও না কোনও ভাবে ঢুকে পড়ে তাঁর ভাবনায়, চিত্রবিন্যাসে। আঁকাআঁকির পাশাপাশি নিয়মিত সংগীত চর্চা করেন। সাম্প্রতিক কাজ, কালী-ভাবনা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, লকডাউন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডা দিলেন বিশিষ্ট শিল্পী সমীর আইচ।

 

এখন কী কাজ করছেন?

সমীর আইচঃ আমি আর কী করবো…ক্যানভাসে, কাগজে প্রচুর ছবি আঁকছি। গান গাইছি।

না, আমি বলতে চাইলাম এখন কি কোনও বিশেষ কাজ করছেন? যেমন মহাভারত নিয়ে আপনার বড়ো কাজটা, সেরকম আর কি…

সমীর আইচঃ বিশেষ কাজ বলতে, একটা সিরিজ করছি এখন। আমার যেটা মনে হয়, জন্ম থেকে মৃত্যু – এই যাত্রাপথে যেকোনও মানুষই কল্পনার মধ্য দিয়ে যায়। এই কল্পনাগুলো কখনও প্রাসঙ্গিক মনে হয়, কখনও অপ্রাসঙ্গিক। আমিও সেই কল্পনার মধ্যেই থাকি। সেটা স্বপ্ন হতে পারে, আবার বাস্তবও হতে পারে। স্বপ্ন এবং বাস্তব মিশিয়েই এখনকার কাজটা করছি।

আচ্ছা। কালীপুজোর আগে আগেই চোখে পড়েছিল, ফেসবুক প্রোফাইল-এ আপনার আঁকা কালীর ছবি পোস্ট করেছিলেন।

সমীর আইচঃ হ্যাঁ। দেখ, এই যে ‘স্পিরিচুয়ালিজম’, এটাও কিন্তু একটা কল্পনা।

কালী আঁকতে গিয়ে আপনার কোনও বিশেষ অনুভূতি…

সমীর আইচঃ আমি কখনই বিশ্বাস করি না, কালী নামের কোনও দেবীর অস্তিত্ব আছে অথবা উনি সর্বত্র বিরাজমান। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের মনের মধ্যে এক ধরনের ভক্তিরস আছে অন্যান্য রিপুগুলোর মতো। সেটাই কখনও কালী, কখনও দুর্গার রূপ নেয়। সেই জায়গা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে আমার কালী। যেকোনও শিল্প সৃষ্টির মুধ্যেই অন্তর্নিহিত থাকে শিল্পীর বেড়ে ওঠা, তার লোকশিক্ষা-সংস্কৃতি। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সহ আরও যেসব দেবদেবীর যে ধরনের অবয়ব দেখে বড়ো হয়েছি, সেগুলো থেকে আমারও একটা রূপ কল্পনা তৈরি হয়ে রয়েছে। সেই রূপ কল্পনা থেকেই কখনও কখনও মনে হয়েছে যে কালীর ছবিটা আঁকি, তার মানে এই নয় যে, আমি দক্ষিণেশ্বর বা কালীঘাটে গিয়ে স্টাডি করেছি। আমি আমার মতো করে এঁকেছি এবং এইভাবেই আমি কখনও কখনও এই ধরনের ছবি এঁকে থাকি।

২০২১-এ আঁকা ‘কালী’

আপনার অনেক ছবিতেই দেখা যায়, করাল দাঁত, হিংস্র জিভ বের করা একধরনের অবয়ব, একধরনের মানুষ-জন্তু

সমীর আইচঃ সোজা কথায় বলতে গেলে, মানুষই দশাবতার। দশ রকম রূপ প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আছে। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কারো কম, কারো বেশি। একটা নিরীহ মানুষ, দেখা গেল সে কাউকে খুন করেছে। তার মধ্যে হয়তো খুনির কোনও লক্ষণই ছিল না, পরিস্থিতির চাপে পড়ে সে খুনটা করে ফেলেছে এবং তার সাজা হল। আবার কারো কারো মধ্যে খুন করার প্রবণতা এত বেশি যে, সে অকারণেও খুন করছে এবং তার সাজা হল না। আবার, এর পাশাপাশি আমরা এও দেখছি যে, যখন দুই প্রতিবেশি দেশের যুদ্ধ হয়, একজন সৈনিক অন্য পক্ষের দুহাজার জনকে মেরেছে। দেশ তাকেই বীরচক্র সম্মান দিচ্ছে। সে নাকি দারুণ মানুষ। তারও কোনও সাজা হল না। সবটাই মনস্তাত্ত্বিক। রাষ্ট্র আমাদের মগজ ধোলাই করে বোঝায় ওরা যা করছে সবটাই সমাজের ভালোর জন্য। শিল্পীরা মানুষদের ভালো-খারাপ টের পায়, মানুষরূপী জন্তুদের দেখতে পায়। তাই মানুষ আঁকতে গিয়ে আমি শুধুমাত্র কয়েকটা মুখ বা ফিগার এঁকে দিলাম এরকম নয় বিষয়টা।

সৌমিত্র চটোপাধ্যায়ের সঙ্গে তো আপনার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, শিল্পী হিসেবে তাঁকে কেমন লাগতো?

সমীর আইচঃ জীবনানন্দের ওই লাইনটা আছে না, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। বিষয়টা এরকম, ভোডাফোনের বিজ্ঞাপনের ওই ‘জুজু’গুলোর কথাই ধরা যাক, ওগুলো আমরা বলছি কমার্শিয়াল কাজ। আর একটা ছেলে বা মেয়ে আর্ট কলেজ থেকে পড়ে বা না পড়ে শুধুমাত্র ছবি বিক্রির জন্য গণেশ বা ওই ধরনের কিছু এঁকে নামি গ্যালারিতে প্রদর্শনী করছে। লোকে দেখে ‘দারুণ’ বলছে, বলছে ‘ওফ্‌… ফাইন আর্টস!’ ভোডাফোনের বিজ্ঞাপনটাই যে আসলে ফাইন আর্টস, সেটা অনেকেই বুঝতে পারেন না। সবকিছু ছাপিয়ে কাজের মধ্যে সততা, আনন্দ, স্বতঃস্ফূর্ততা না থাকলে সেটা কখনই শিল্প হয়ে ওঠে না। সৌমিত্রদা নিজের মনের আনন্দে ছবি আঁকতেন। আপস করেননি কখনও। যেকারণে আমার খুবই ভালো লাগত।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সমীর আইচ

আঁকাআঁকি নিয়ে অনেক কথা হল। এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি। আচ্ছা, গান গাওয়া ছাড়াও আপনি তো নিজে গান লেখেন, সুর দেন। ছবি না আঁকলে কি গানবাজনা নিয়েই এগোতেন?

সমীর আইচঃ শুধু গানবাজনা নয়, আমি অনেক কিছুই করেছি জীবনে। ছোটোবেলা থেকে ভালো খেলাধূলা করতাম, খুব ভালো মারপিটও করতাম। এর পাশাপাশি আমার খুব ইচ্ছে ছিল গান শিখবো। আমার আদি বাড়ি পূর্ব বাংলায়, সেখান থেকে এখানে আসা, আমার জন্ম এখানেই। কলোনিতে থাকতাম, জীবন অতটাও সহজ ছিল না। গান শেখানোর কথা মা-বাবাকে বলার কথা ভাবতেই পারতাম না। পরবর্তী সময়ে যখন আর্ট কলেজে পড়তে ঢুকলাম, রোজগার করতে শুরু করলাম, তখন গান শিখতে শুরু করি। আর এই শুরুটাও হয়েছিল অদ্ভুতভাবে। প্রথমে যার কাছে রবীন্দ্রসংগীত শিখতাম, প্রখ্যাত  রবীন্দ্রসংগীত গায়ক – আমার বন্ধু স্বপন সাহা, সেও তখন গ্রাজুয়েশন শেষ করে স্ট্রাগল করছে। একদিন তাকে প্রস্তাব দিলাম, তুমি আমাকে গান শেখাও আমি তোমাকে কমার্শিয়াল আর্ট শেখাবো। এভাবেই শুরু।

এবার বলি গান লেখা প্রসঙ্গে। আমার এই কথা শুনলে অনেকেই ক্ষেপে যেতে পারেন যে, আমরা গায়কদের শিল্পী বলি, কিন্তু একজন ‘পারফরমার’ আর ‘আর্টিস্ট’-এর মধ্যে ফারাক আছে। যাঁরা পারফরমার তাঁরা ‘পারফরমেন্স’ করেন আর একজন আর্টিস্ট ‘ক্রিয়েট’ করেন। গানের ‘মূল’ স্রষ্টা হলেন দুজন- একজন গীতকার, অন্যজন সুরকার। তারপর গায়ক পারফর্ম করে। ৪০ বছর ধরে লোকসংগীত চর্চা করি আমি, এখনও শিখছি। লোকসংগীত গাইতে গিয়ে লক্ষ্য করি, আমার নিজেরও কিছু কথা আছে, যা আমি অন্যের গানে পাচ্ছি না। অতঃপর আমি গান লিখতে শুরু করি। পুরোটাই আমার ব্যক্তিগত চর্চার জন্যে, আমার গান সকলের ভালো লাগবে এই আশায় নয়।

আপনার বাড়িতে আপনার করা অমর পালের একটা স্কেচ রয়েছে, আপনি তো একসময় তাঁর ছাত্রও ছিলেন।

সমীর আইচঃ হ্যাঁ। লোকসংগীত আমায় খুব টানতো। গ্রাম খুব ভালোবাসি আমি। তো সেইসময় আমি প্রয়াত লোকসংগীত সম্রাট দীনেন চৌধুরীর কাছে যাই। দীনেনদার কাছে শিখতে শুরু করলাম। তবে, একজনের গান আমায় বিশেষভাবে আকর্ষণ করতো; তাঁর গানে আমি সত্যিকারের মাটির গন্ধ পেতাম। তিনি অমর পাল। আমি তাঁর কাছেও যাই। লোকসংগীত শিখি। যতদিন বেঁচে ছিলেন আমি তাঁর কাছে বারবার ছুটে গিয়েছি। ওঁর স্কেচটা যখন করেছিলাম খুব আগ্রহের সঙ্গে সিটিং দিয়েছিলেন।আপনার ছবির সঙ্গে গান, কবিতার কীরকম সম্বন্ধ?

সমীর আইচঃ আমার কবিতাপ্রীতি শুরু হয়েছিল স্কুল জীবনে। আমি নাকতলা স্কুলে পড়তাম। সেখানে আমাদের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন কবি কেদার ভাদুড়ি। খুব অল্প বয়স থেকেই আমি, আরও কয়েকজন বন্ধু কেদারকদার বাড়িতে যেতাম। কবিতার আসর বসতো। রাতের পর রাত সেইসব আড্ডায় কেটেছে। এখন আর সেসব নেই। যাই হোক, এই কবিতা আর গান আমার শিরায় শিরায় ঢুকে আছে এবং আমায় অনেক সাহায্য করেছে এগুলো। কবিতা, গান আমার ছবির ভিতর ঢুকে পড়ে। কবিতা আর গানে যে ছন্দ আছে, সেই ছন্দগুলো আমার ছবির লাইনে ঢুকতে শুরু করে, সেটা শুধু আমিই বুঝতে পারি। আর খুব গভীরভাবে যদি কেউ দেখে, সে বুঝবে যে এই ছবিটা আঁকতে গেলে ভেতরে ওই ছন্দটা না থাকলে কখনই সম্ভব নয়।

একজন শিল্পীর কাছে অবসর সময়ের মূল্য অনেক, লকডাউনে কীভাবে সময় কাটিয়েছিলেন?

সমীর আইচঃ আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, যেকোনও সৃষ্টির মূলেই রয়েছে ‘ক্রাইসিস’। যেমন ৭০-এর দশকে সারা পৃথিবী জুড়ে প্রচুর গায়ক, শিল্পী, কবি উঠে এসেছিল। একটা ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু লকডাউনে সারা পৃথিবীর জন্য আমার দুঃখ হয়েছে, তবে স্বার্থপরের মতো বলছি, ব্যক্তিগতভাবে আমার একটা লাভ হয়েছে লকডাউনে। গত দুবছর আমি যত ছবি এঁকেছি, সেটা হয়তো গত আট বছরেও আঁকতে পারিনি। সারা বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে-উদ্বোধনে আমাকে যেতে হয়, এদিক ওদিক ছোটাছুটি লেগেই থাকে। লকডাউনে সেসব ছিল না। এছাড়া আমার মনে হয়েছিল, বেঁচে যাই অথবা মরে যাই, এটা একটা সুযোগ। এরকম পৃথিবী আমি আগে দেখিনি, সম্পূর্ণ নতুন একটা অভিজ্ঞতা। তাই এই সময়ের কিছু দলিল তৈরি করে যাওয়া দরকার বলে মনে হয়। প্রচুর কাজ করেছি এই সময়। প্রদর্শনীও হয়েছে। আমার বিশ্বাস, করোনা পরবর্তী সময়ে এই প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরাও ভালো কাজ করবে।

লকডাউনে করা একটি কাজ

এতদিনের কর্মজীবনে আপনার নিজের শ্রেষ্ঠ কাজ কোনটা বলে মনে হয়?

সমীর আইচঃ কোনওটাই না। শ্রেষ্ঠ কাজ আবার হয় নাকি! শ্রেষ্ঠ কাজ বাছা মানে সারাক্ষণ সিংহাসন পাহারা দিয়ে বসে থাকা। আর্টিস্টদের যাত্রাপথটা অন্যরকম। আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বলি, ধরা যাক আমরা রাজস্থান যাবো বলে ট্রেনে উঠলাম, চলে গেলাম সিকিম। ছবি এমন একটা জিনিস যেটা ট্র্যাক বদল করে দেয়। এখানে সাফল্য বলে কিছু নেই, কারণ You can not identify your success.  

Developed by DXDasia