
এই প্রথম এত বড়ো পরিসরে শিল্পীর প্রদর্শনী হলো শহরে
‘শতবর্ষের আলোয়’ – আলোই বটে। সেঅর্থে হয়তো এভাবে আগে কখনও আলোয় আসেনি শিল্পী হরেন দাসের কাজ। কলকাতায় এর আগে হরেন দাসের ছবি দেখানো হয়েছে, দর্শক-শিল্পপ্রেমীরা উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, মানে, বাছাই পাঁচটা ছবি, পাঁচটাই দুর্ধর্ষ। এভাবে ১১৫টা ছবি নিয়ে আগে খুব বেশি প্রদর্শনী হয়নি। শুধু আলো নয়, ছায়াও তাঁর কাজের প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে। সেই কথাতেই ঢুকছি…
অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুরে জন্ম শিল্পী হরেন্দ্রনারায়ণ দাসের। কাঠখোদাইয়ে বিশেষ পারদর্শী হলেও এনগ্রেভিং, মেজোটিন্ট, লিনোকাট, এচিং বা ড্রাই-পয়েন্ট এও যে তাঁর দক্ষতা ছিল, তা এই প্রদর্শনী-চিত্রগুলো দেখলেই বোঝা যায়। বাংলার ছাপাই শিল্পের দুই কিংবদন্তী মুকুল দে এবং রমেন চক্রবর্তীর সুযোগ্য উত্তরসূরি এই শিল্পী প্রতিটি কাজেই নিজস্ব মাত্রা যোগ করেছেন। প্রতিটি ছবিতেই দক্ষ হাতে খোদাই করেছেন জাতশিল্পীর স্বাক্ষর।

হরেন দাস রিয়েলিস্টিক আর্টিস্ট। তাঁর ছবি সকলেই বুঝতে পারবেন হয়তো, কিন্তু কারিগরি দক্ষতার ক্ষেত্র উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর ছবি কীভাবে যে সহজিয়া জীবনের আলেখ্য, শ্যামল-শান্তির মায়া হয়ে ওঠে, তা অনেকেই ধরতে পারবেন না। আর এখানেই তিনি হয়ে ওঠেন কিংবদন্তী। তাঁর ছবি সাধারণ দর্শক ও সমকালীন শিল্পীদের নতুন করে জাগিয়ে তোলে, নিয়ে যায় মূলে। নিয়ে যায় বরফের তীক্ষ্ণ রেখা ফুটে ওঠা বাদামী চাদরে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘায়, বাঁচার তাগিদে মনোরঞ্জন করা প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার সুরের ভিতর, সাদা-কালো-আলোর ‘বাস্তবধর্মী’ ম্যাজিক্যাল পৃথিবীতে।

ষাটের দশকের শুরুতে, আর্ট কলেজে হরেনবাবুকে শিল্পী হিরণ মিত্র মাস্টারমশাই হিসেবে পেয়েছিলেন। হরেনবাবুর বেহালার বাড়িতে একসময় ভাড়াও থেকেছেন। হিরণ মিত্র বলছিলেন, “দ্বিতীয় বর্ষে আমাদের উডকাট, লিনোকাট শেখানো হতো, তারপর গ্রাফিক্স-এর কাজ শুরু হয়েছিল, মূলত মাস্টারমশাইয়ের কাছে শিখতাম রিভার্স করা। মানে, কালোর উপরে সাদা দিয়ে কাজ করা। যেখানে আলোটা পড়ছে সেই জায়গাটা সাদা হয়ে যাচ্ছে, সেইটা দিয়েই আদলটাকে বোঝানো। কাঠের দাম বেশি, খরচ কম হতো বলে লিনোই করতাম বেশি। একই কারণে ছাত্রজীবনে এচিং করা হয়ে ওঠেনি। পরে করেছি। মাস্টারমশাইয়ের কাছে আমরা মূলত এটা শিখি যে, কীভাবে কম রেখায়, লিনো বা উডকাটে আলো-ছায়া খেলা করবে। অন্যভাবেও কাজকর্ম হয়েছে। সম্পূর্ণ আলো-ছায়ার বাইরে গিয়েও কাজ হয়েছে। চিত্তপ্রসাদ বা সোমনাথ হোর যেভাবে করেছেন। সেগুলো রেখা প্রধান কাজ। মাস্টারমশাই খুব রিয়েলিস্টিক/বাস্তবধর্মী কাজ করতেন। আলোর রেখা দিয়ে শরীরের আদলকে বোঝানো, যেন মনে হচ্ছে পিছন দিক থেকে একটা আলো এসে পড়ছে, সীমানারেখাগুলোকে বোঝানো, সেটাই ছিল হরেনবাবুর দক্ষতা।”


ধন্যবাদ দেবভাষা। তাঁদের উদ্যোগেই হরেন দাসের মতো শিল্পীরা আলোয় এসে দাঁড়ান। প্রদর্শনীর আহ্বায়ক সৌরভ দে এবং দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়কে অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা এমন একটি কাজের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। সৌরভবাবু বলছিলেন, “শতবর্ষে শ্রদ্ধা জানিয়ে হরেন দাসকে নিয়ে আমরা প্রদর্শনী করবো, এই ভাবনা নিয়েই আমরা ওনার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওনার পরিবারের তরফে এই সবকিছু পাওয়ার পর জেনেছি, পরিবার ব্যতিরেকে এই প্রথম এভাবে প্রদর্শনী হচ্ছে। ফলে এটা একটু অন্যরকম তো বটেই।”
শহরের স্পটলাইটে হরেন দাস এসে দাঁড়িয়েছেন কয়েক দিনের জন্য। ২০ নভেম্বর অবধি এই প্রদর্শনীটি চলবে। অতএব, গড়িয়াহাটের ফার্ন রোডের দিকে গেলে একবার তাঁকে স্বচক্ষে দেখে আসতেই পারেন।
ছবি সৌজন্যেঃ দেবভাষা
