
এ বারের মেলা-উদ্যোক্তা বীরভূম জেলা প্রশাসন
হবে/হবে না’র দোলাচল কাটিয়ে অবশেষে শুরু হতে চলেছে শান্তিনিকেতনের জয়প্রিয় পৌষমেলা। বিশ্বভারতীর অনুমতিক্রমে তিন বছর পরে, ২০২৩-এ শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লির মাঠে ‘বিকল্প’ পৌষমেলার আয়োজন করেছে বীরভূম জেলা প্রশাসন। মূল উদ্যোক্তা জেলা প্রশাসনের ভাবনা অনুযায়ী এ বারের মেলা হবে শিশুবান্ধব। সেইমতো মেলা প্রাঙ্গনে ১০ হাজার বর্গফুটের একটি শিশুবান্ধব কর্নারও করা হয়েছে। জেলা শিশু আধিকারিক নিরুপম সিংহ-র কথায়, শিশুবান্ধব এই কর্নারটি মেলার মধ্যে আর একটি মেলা।
মেলায় বেশ কিছু সংখ্যক শিশুশ্রমিকের দেখা মেলে, যারা পেটের দায়ে কাজ করতে বাধ্য হয়। এ বার থেকে মেলায় যাতে শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, সেদিকেই নজর দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। একজনও শিশুশ্রমিক যাতে পৌষমেলায় দেখতে না পাওয়া যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে বিশেষ ‘রেসকিউ টিম’। যে-সব স্টল শিশু শ্রমিক মুক্ত হবে, সেগুলিকে সরকারি শংসাপত্র দেওয়া হবে, তাতে সই থাকবে জেলাশাসক ও শিশু কমিশনের আধিকারিকের। শিশুবান্ধব কর্নারটিতে ছোটোদের জন্য নানারকম মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা থাকছে। সেখানে ছোটোরা খেলাধূলা করতে পারবে, বিনামূল্যে নানা ধরনের রাইড উপভোগ করতে পারবে, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা সহ নানা মজার প্রতিযোগিতা থাকছে, চলবে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জেলা প্রশাসন তরফে জানানো হয়েছে, শিশু শ্রমিক মুক্ত মেলা করার পাশাপাশি অন্যান্য অধিকার সুরক্ষিত রাখতে ঠিক কী করা উচিত, সে সম্পর্কেও সচেতনতা প্রচার চলবে মেলার পাঁচ দিন। মেলা চলবে আগামী ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
চলছে প্রস্তুতি
প্রসঙ্গত, গত তিন বছর ধরেই পৌষমেলা আয়োজনের দায়িত্ব নিতে চায়নি বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ৷ ২০২০ সাল থেকে বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে এবং জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পৌষ মেলার আয়োজন করা হয়েছিল৷ এবার সরাসরি জেলা প্রশাসনই সেই দায়িত্ব হাতে নিয়েছে৷ এই প্রসঙ্গে কিছু কথা উল্লেখ করা দরকার।
পৌষমেলার আগে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পৌষ উৎসব (মহর্ষির দীক্ষার সাম্বৎসরিক)-এর সূচনা করেছিলেন, তাঁর মতে এটি ছিল ব্রাহ্মদের মিলন মহোৎসব। ১৮৮৮ সালের ৮ মার্চ শান্তিনিকেতন আশ্রমের জন্য প্রণীত ‘ট্রাস্ট ডিড’ বা অছিপত্রে মহর্ষি শান্তিনিকেতনে একটি মেলা বসাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ট্রাস্ট্রে লেখা হয়: “ধর্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্র্যাষ্টীগণ বর্ষে বর্ষে একটি মেলা বসাইবার চেষ্টা ও উদ্যোগ করিবেন। এই মেলাতে সকল ধর্মসম্প্রদায়ের সাধুপুরুষরা আসিয়া ধর্মবিচার ও ধর্মালাপ করিতে পারিবেন। এই মেলার উৎসবে কোনোপ্রকার পৌত্তলিক আরাধনা হইবে না ও কুৎসিত আমোদ উল্লাস হইতে পারিবে না। মদ মাংস ব্যতীত এই মেলায় সর্বপ্রকার দ্রব্যাদি খরিদ বিক্রয় করিতে পারিবে। যদি কালে এই মেলার দ্বারা কোনো রূপ আয় হয়, তবে ট্র্যাষ্টীগণ ঐ আয়ের টাকা মেলার কিংবা আশ্রমের উন্নতির জন্য ব্যয় করিবেন।”
অতএব সাম্বৎসরিকের সূচনার তিনবছর পর মহর্ষির নির্দেশ মেনে শান্তিনিকেতনে পৌষমেলার আয়োজন হয় ১৮৯৪ সালে। শুধু গত তিন বছর নয়, বিভিন্ন কারণে অতীতে পৌষমেলা বন্ধ থেকেছে। যেমন, ১৯৪৩ এবং ১৯৪৬ সালে, যথাক্রমে মন্বন্তর ও সাম্প্রদায়িক হানাহানির জন্য পৌষমেলা স্থগিত রাখা হয়েছিল। পৌষমেলা বন্ধ থাকলেও মহর্ষির দীক্ষার সাম্বৎসরিক অনুষ্ঠান কখনও বন্ধ হয়নি (তবে ২০১৪ সালে উপাচার্য ও আধিকারিকদের একাংশ ঘেরাও থাকার কারণে ছাতিমতলায় ৭ পৌষের উপাসনা-অনুষ্ঠান বিঘ্নিত হয়েছিল)। ১৮৯৪ থেকে মহর্ষির দীক্ষার সাম্বৎসরিক ও পৌষমেলা নিয়ে শান্তিনিকেতনে প্রায় অবিচ্ছেদে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে পৌষ-উৎসব। পৌষমেলাটি ছিল সাম্বৎসরিক উৎসবের আনুষঙ্গিক, কিন্তু ওতপ্রোত। উৎসবের মূল লক্ষ্য সাম্বৎসরিক উদযাপন। সাম্বৎসরিক উৎসবের আয়োজন শান্তিনিকেতনের অবশ্যকৃত্য। পৌষ উৎসবের মুখ্য প্রেরণা আত্মিক ও আধ্যাত্মিকজাতীয়, মেলাটা যেন তার লৌকিক মূর্তি। তবে, কালে-কালে জনচিত্তের প্রবল জোয়ারে পৌষমেলাই হয়ে উঠেছে মুখ্য।
বিশ্বভারতী’র আয়োজনে পৌষ উৎসবের অনুষ্ঠান সূচি
একজনও শিশুশ্রমিক যাতে পৌষমেলায় দেখতে না পাওয়া যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে বিশেষ ‘রেসকিউ টিম’। যে-সব স্টল শিশুশ্রমিক মুক্ত হবে, সেগুলিকে সরকারি শংসাপত্র দেওয়া হবে, তাতে সই থাকবে জেলাশাসক ও শিশু কমিশনের আধিকারিকের।
১৯১০ সালে পৌষ উৎসবের অন্যরকম ব্যপ্তি ঘটান রবীন্দ্রনাথ। বিশেষ ধর্মবুদ্ধি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিজের দর্শনকে আবদ্ধ রাখতে চাননি কবি। খ্রিস্টোৎসব আজও শান্তিনিকেতনে ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পালিত হয়। এই খ্রিস্টোৎসবে বৈদিকমন্ত্র আর বাইবেল একসঙ্গে পাঠ হয়, যা পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। এভাবে রবীন্দ্রযুগে মহর্ষির দীক্ষার সাম্বৎসরিক উৎসব হিসেবে শুরু হওয়া শান্তিনিকেতনের পৌষ উৎসবের সঙ্গে ক্রমে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে খ্রিস্টোৎসব। এইভাবে যেমন একদিকে উৎসবের পরিধি বেড়েছে তেমনই পৌষমেলাও বেড়েছে ভৌগলিক এবং অন্যান্য অনেক দিক থেকে। এসেছে অনেক পরিবর্তন। প্রথমদিকে একদিন-দুদিন মেলা চলতো তারপর দিনসংখ্যা বাড়তে থেকেছে ক্রমশ। ২০১৭ সালে পৌষমেলার মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ৬ দিন। ২০১৮ সালেও এই ব্যবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। মেলার আয়তন ক্রমে এতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যে বারবার অভিযোগ উঠেছে পৌষমেলা তার আদর্শ ও চরিত্র হারিয়ে ক্রমশ ‘কর্পোরেট মেলা’ হয়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের বিপুল জনসমাগমের ফলে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে মেলায় আসে হাজার-হাজার গাড়ি। ফলে বিশ্বভারতী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত এই মেলায় কড়া নজরদারির পরও পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ওঠে। বিশ্বভারতীকে এজন্য একাধিকবার মামলা-মকদ্দমার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। নির্ধারিত তিন-চারদিনের পর আর ‘ভাঙামেলা’ থাকবে না;-এই মর্মে, আদালতের মধ্যস্ততায় স্থির হয়েছিল ২০১৭ সাল থেকে ৬ দিন পর মেলা সম্পূর্ণ উঠে যাবে। ওইসময় থেকে মেলায় আতসবাজি প্রদর্শনও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পৌষমেলা’র অনুষ্ঠান সূচি
বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, ১৮৮৮ সালের ‘ডিড’ অনুসারে মেলা পরিচালনার দায়িত্ব শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের। তবু কাগজে-কলমে অধিকারী না হলেও, ঐতিহ্যের দাবিতে বিশ্বভারতী এতকাল মেলা পরিচালনায় সর্বাঙ্গীন প্রযন্ত করে এসেছে। বিশ্বভারতীর কোষাগার থেকে মেলার আয়োজনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয় তো বটেই, এছাড়া মেলাকে কেন্দ্র করে রুজু হওয়া মামলা-মকদ্দমা এবং তার আর্থিক দায়ভার ইত্যাদি সবই বর্তাচ্ছে বিশ্বভারতীর মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে ২০১৯ থেকে আর মেলার দায়িত্ব গ্রহণ না করে শুধু পৌষ উৎসবের পার্বণগুলি সম্পন্ন করার কথা ঘোষোণা করেছিল বিশ্বভারতী। মেলা আয়োজনের দায়িত্ব নিলে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দায়বদ্ধতাও তার থাকে।
আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা ২১ – বাংলার ‘পৌষ পার্বণ’
গত তিনবছর এই দায়বদ্ধতা থেকে বিরত ছিল বিশ্বভারতী। ২০২৩-এ অনেক টালবাহানার পর অনুমতি দিলেও মেলা আয়োজনের ভার বীরভূম জেলা প্রশাসনের উপর সঁপেছে বিশ্বভারতী। অনেক ঝঞ্ঝাট সঙ্গে করেই এই ‘বিকল্প’ পৌষমেলার আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে, তাই মেলা-দর্শনার্থীদের কাছে জেলা প্রশাসন, আশ্রমিক ও বিশিষ্টদের আবেদন, ৭ থেকে ৯ পৌষ, উৎসবের দিনগুলি উদযাপন করতে গিয়ে কারোর সংকীর্ণ স্বার্থভাবনায় কলুষিত না হয় ঐতিহ্যপূর্ণ পৌষমেলা। এটা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু বিশ্বভারতীর নয়, আমাদের সবার।
তথ্যঋণঃ
শান্তিনিকেতনের পৌষ-উৎসব ও মেলা : বিবর্তনের রূপরেখা, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় (বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, বাংলাদেশ ভবনের মুখ্য সমন্বয়ক ও শান্তিনিকেতন কর্মিমণ্ডলীর সদস্য।)
