
একটা দেশ একটা ধর্ম দিয়ে হয় না, অনেক মানুষ সেখানে মিলেমিশে থাকেন
ছবির ফ্রেমে বসে আছেন এক প্রৌঢ়, পাশেই নাতি। দুজনের নাম, ধর্ম, বর্ণ এমনকি দেশ সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওদের পরিচয়– রোহিঙ্গা। ওরা প্রান্তিক, ব্রাত্য। উদ্বাস্তু। দুই প্রজন্ম পাশাপাশি বসে আছে। জীবনে কোনো প্রশ্ন নেই। অথবা এতই প্রশ্নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যার উত্তর দেওয়া যায় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাটি আঁকড়ে পড়ে আছেন তাঁরা। শিকড়ের সন্ধানে তেজী অশ্বারোহীর মতো ছুটছেন। কীভাবে থেমে যেতে হয়, ইতিহাসে লেখা নেই। তাঁদের থামিয়ে দেওয়া হয়? এই হার মানা- না মানার গল্প শোনালেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী মইনুল আলম এবং আসমা বীথি। রোহিঙ্গাদের কথা বলতে হাজির হয়েছেন এপার বাংলায়। কলেজস্ট্রিটের বই-চিত্রে পাঁচদিনের এই প্রদর্শনী, ‘The Influx Passage’ শিরোনামে প্রায় ৩০টি ছবিতে উঠে এসেছে সাদা-কালো জীবনযন্ত্রণার কথা। রোহিঙ্গাদের সুখ-দুঃখ প্রাণোচ্ছলতার এক কঠিন গল্প। প্রদর্শনী ঘুরে দেখলেন আমাদের প্রতিনিধি সুমন সাধু এবং তন্ময় ভট্টাচার্য। কথা বললেন শিল্পীর সঙ্গে।
• ‘রোহিঙ্গা’ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে হঠাৎ কেন এলেন এ দেশে? এর পিছনে কী স্বতন্ত্র কোনো উদ্দেশ্য ছিল?
আমি পেন্টিং-এর ছাত্র। চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটির ফাইন আর্টস বিভাগ থেকে পড়াশুনা করেছি। ছোটবেলা থেকেই আমার ফটোগ্রাফির প্রতি নেশা। এটা অবশ্য আমার বাবার থেকে পাওয়া। তো আমি যখন ছবি তোলা শুরু করি, তখন আদিবাসীদের নিয়েই কাজ করতাম। ওদের প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। কারণ ওরা অনেক বেশি ভূমিপুত্র বা মাটির মানুষ। এরপর ফিশার ফোক কমিউনিটির ছবি তুলি। তার পাশাপাশি আমাদের জনজীবনে খেটে খাওয়া মানুষের ছবি তুলি। যে-কোনো ছবিতে নেচার থাকলেও সেখানে মানুষের উপস্থিতি থাকেই আমার ছবিতে। আমি তেমন কোনো বড় ফটোগ্রাফার নই কিন্তু যে কাজগুলো করি তার মধ্যে চেষ্টা করি একটা কম্পোজিশন অফ অ্যাস্থেটিক্স যেন থাকে। যাই হোক, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করি। আমাদের চট্টগ্রাম থেকে মায়ানমারের প্রকৃতিটা দেখা যায়। আর বেশ কয়েকবছর ধরেই আমি মায়ানমারে যাতায়াত শুরু করেছি। ওখানে প্রথম প্রথম গিয়ে দেখেছি রোহিঙ্গারা কীভাবে মানসিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। যেমন ধরুন, রোহিঙ্গাদের কোনোরকম লেখাপড়া করতে দেওয়া হত না। এমনকি নিজেদের বাবা-মায়ের দেওয়া নামকে ওরা গ্রহণ করত না। ওদের আরেকটা নাম নিতে হত। প্রত্যেক রোহিঙ্গার দুটো করে নাম। আসলে বার্মিসরাও তো ওখানে ভূমিপুত্র নয়। ওরা তিব্বতের দিক থেকে আসা মানুষ। আমাদের পাহাড়ে যখন ছবি তুলি, সেখানে একটা চাকমা নামের আদিবাসী গ্রুপ আছে, ওদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি ওরাও আগে বার্মাতে ছিল। আর আরাকানিসরা আবার এর আগের। আমাদের চট্টগ্রাম শাসন করত একসময়। অনেকেই বলেন যে রোহিঙ্গারা ওখানকার লোক নয়, আমার কাছে এটা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না। আসলে একটা দেশ তো আর একটা ধর্ম দিয়ে হয় না, অনেক মানুষ সেখানে মিলেমিশে থাকেন।
• বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় এই প্রদর্শনী নিয়ে আসার আলাদা কোনো কারণ আছে?
এই যে দেবাশিসদা, বুদ্ধদা, পুলকদা এঁদের সঙ্গে যখন পরিচয় হল, তখন কলকাতার এই বই-চিত্রে একটা প্রদর্শনী চলছিল। তখন এঁরা বললেন আমার একটা প্রদর্শনী করতে চান। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজগুলো সাধারণ মানুষকে জানানো দরকার।

• ’৭১-এর সময় অনেক মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিল। আমাদের যশোর রোডে বা উত্তরবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাতেও অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। বা তার থেকেও যদি চব্বিশ বছর পিছিয়ে যাই, ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলা থেকে অনেক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে এসেছিল। এখান থেকে কম করে হলেও কিছু মানুষ পূর্ব-পাকিস্তানে গেছে। আপনি সেইসময় রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিজের চোখে দেখেছেন। সমসাময়িক বিশ্বে সিরিয়া বা প্যালেস্তায়িনেও প্রচুর উদ্বাস্তু আছে। সারা পৃথিবী জুড়ে যে অস্তিত্বের শিকড়ের সংকট, রোহিঙ্গা কি সেই ট্রাডিশনেরই অংশ? নাকি তাদের আলাদা কোনো সমস্যা আছে?
না আলাদা কোনো সমস্যা না। সারা পৃথিবীতে একই কথা ঘুরেফিরে উচ্চারিত হয়। যাদের পাওয়ার বা ক্ষমতা আছে তারা এই মানুষদের উপর স্টিমরোলার চালিয়েই যান। নাহলে দেখুন, আমরা ’৭১-এ যা দেখেছি, এই শতাব্দীতে তো তা আবার দেখতে চাই না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো আরও নির্মম মনে হচ্ছে।
• আপনার চোখে ’৪৭ বা ’৭১-এর সঙ্গে ২০১৭-১৮-র ফারাক আছে?
আরও বেশি খারাপ অবস্থা তৈরি হচ্ছে। এখন হাতের কাছে আমরা একসঙ্গে অনেককিছু পেয়ে গিয়েছি। টেকনোলজি কত উন্নত হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে এখন সচেতন হওয়ার চাইতেও কেমন একটা দাবিয়ে রাখা, ফায়দা তুলে নেওয়ার ব্যাপার সবসময় কাজ করছে। আবার দেখুন, একদল যখন রোহিঙ্গাদের বলছে তোমরা এখানকার লোক নও, আমেরিকাতে কিন্তু কালো মানুষদের কেউ উপেক্ষা করতে পারেনি। আপনি কতগুলো মানুষকে লেখাপড়া করতে দেবেন না, সেই আপনিই আবার তারা বড় হলে বলবেন বর্বর। আপনিই আবার বর্বরতা দেখিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিচ্ছেন ভিনদেশে। ওরা প্রচুর রেপড হয়েছে। ওদেরই কিন্তু নতুন করে সন্ধান করতে হবে। আমাদের বাংলাদেশে দশ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা আছে। আপনি অবাক হয়ে যাবেন, এদের জন্য বাংলাদেশ সরকার দশ বাই দশ ফিটের একটা ঘর তৈরি করে দিয়েছে, সেখানে ৩৩৪টি বাঁশ ধার্য করা আছে।

• কিন্তু শেখ হাসিনা বা তার সরকার তো রোহিঙ্গাদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল! সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট বলছে ওরা অন্য দেশের মানুষ, এদেশে ঠাঁই নেই। আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে কী মনে হয় এটা শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণ?
দেখুন রোহিঙ্গারা বর্বর। এমন ভাবেই তারা পরিচিত। তাই আপনি কিন্তু এদের কথা না শুনে তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষের কথাই শুনবেন। কিন্তু আমাকে বর্বর কে করেছে! আমার কথা হচ্ছে এটা। আমি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে চলেছি।

আরও পড়ুন
বঙ্গবন্ধুর যে ভাষণ ধারণ করেছিল কলকাতাও
• আপনার কথা থেকে উঠে আসছে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন কোনো সুযোগ সুবিধা পায়নি। তারা ‘বর্বর’ বা প্রান্তিক। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে কেউ কি ছিটকে বেরোয়নি বা বিখ্যাত হয়নি?
ওদের জীবন আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রতিদিন কী কঠিন পাহারায় রাখে ওদের! ক্ষমতার হাতের পুতুল তারা। এর মধ্যে থেকে সম্ভব না।

• আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার সহানুভূতিশীল না হলেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বেশ কয়েকটা জায়গায় ক্যাম্প করে তাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ভারত সরকারের বিরুদ্ধে গিয়েই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ এমন একটা সিদ্ধান্ত নিল। এ প্রসঙ্গে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই হোন বা আপনাদের মুখ্যমন্ত্রী – যিনি মানবিক, তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের পাশেই দাঁড়াবেন।
• এ সমস্যার সমাধান কোথায়?
তাদের চাপে রাখলেও সেটা নগণ্য বলে আমার মনে হয়। যদিও আমি রাজনীতি করি না। তবে এই সমস্যাটা সবারই বোঝা উচিত।
• এখানে আপনার প্রত্যেকটা ছবিই প্রায় সাদা-কালো এবং খুব স্ট্রেট ফ্রেম ব্যবহার করেছেন আপনি। এটা কি ছবিগুলোর বিশেষ কোনো দিককে ইঙ্গিত করছে?
এই ছবিগুলোর মধ্যে অ্যাস্থেটিক্সের চেয়েও আমরা চেষ্টা করেছি কষ্টটা ধরতে। যাতে খুব রিয়ালিস্টিক হয়।
• এই যে এত রোহিঙ্গারা শিকড় ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, ভবিষ্যতে কি বাংলাদেশ সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিতে রাজি হবেন?
বাংলাদেশ সরকার সবসময় চায় ওদের ভালো হোক। তা বলে যে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে – তা কিন্তু কখনও বলা হয়নি। আমাদের সরকার শুধু বলেছে, ওরা যথাযোগ্য আত্মসম্মান নিয়ে ফিরে যাক। সরকার ছাড়াও যে সমস্ত এনজিও আছে, ওরাও প্রচুর চেষ্টা করছে।

• ধরুন পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার হস্তান্তর হল, তখন এদের ভবিষ্যৎ কী হবে?
দেখুন আমি রাজনীতি করি না। এমন প্রশ্ন বরং থাক। আমরা ছবি তুলেছি মাত্র। আর ছবি তো লেখার মতোই। এটা থেকে যায়। ভারত বাংলাদেশে যেমন রোহিঙ্গা সমস্যা আছে, তেমন থাইল্যান্ডে আছে, নেপালেও আছে। সবাই মিলেমিশে যদি এদের কথা একটু ভাবেন তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে, এই আর কি।

