‘পথের পাঁচালি’-র দুর্গা উমা দাশগুপ্তের (সেন) জীবনাবসান

মাত্র একটি ছবিতেই অভিনয় করেছিলেন তিনি

প্রয়াত উমা দাশগুপ্ত (সেন), সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ খ্যাত অভিনেত্রী। সোমবার সকাল ৮টা নাগাদ মৃত্যু হয়েছে তাঁর। কয়েকবছর আগে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, যদিও চিকিৎসায় সাড়াও দিয়েছিলেন প্রাথমিক ভাবে। কিন্তু নতুন করে ফিরে আসে মারণরোগ। চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভর্তি করানো হয়েছিল এক বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানেই প্রয়াত হলেন উমাদেবী। মাত্র একটি ছবিতে অভিনয় করেন। তাতেই বিশ্বজোড়া খ্যাতি। ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’-তে তিনি অপুর দিদি দুর্গা চরিত্রে অভিনয় করে গোটা বিশ্বের নজর কাড়েন। এরপর তাঁকে আর পর্দায় দেখা যায়নি। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন শিক্ষক।

দুই বছর আগে (২৬ মে, ২০২২) উমা দাশগুপ্তের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ফোনে কথা বলেছিলেন বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে সুমন সাধু। সে-সময় মুক্তি পেয়েছিল অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’। পথের পাঁচালির নানা কথা ফোনে ব্যক্ত করেছিলেন বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী। সে-কথাই হুবহু রইল এই প্রতিবেদনে।

মানিকদা এবং লেখক আশিস বর্মন আমাদের বাড়িতে এসে বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন আমাকে দুর্গার চরিত্রে অভিনয়ে অনুমতি দেওয়ার জন্য। তখন বিজয়া রায় আমাদের বাড়ি আসেননি। আমার নির্বাচনের অনেক পরে আমি মানিকদার বাড়িতে যাই এবং বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা হয়। তখন আমার ১৩ বছর বয়স। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি।

১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’-তে উমাদেবী অপুর দিদি দুর্গা চরিত্রে অভিনয় করে গোটা বিশ্বের নজর কাড়েন। এরপর তাঁকে আর পর্দায় দেখা যায়নি। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন শিক্ষক।

 

পথের পাঁচালির শ্যুটিংয়ে। ছবি সৌজন্যে শ্রীময়ী সেন রাম।

সত্যজিৎ রায়ের টিম বিভিন্ন স্কুলে এক উপযুক্ত কিশোরীর খোঁজ করছিলেন দুর্গা চরিত্রের জন্য। আমি তখন ভবানীপুরের বেলতলা হাইস্কুলে পড়তাম। আমাদের সহ-প্রধান শিক্ষিকা অপর্ণা সেন আমাকে খুব ভালোবাসতেন। কারণ তখন আমি পড়াশোনার পাশাপাশি নাটক করতাম। মানিকদা এবং অপর্ণাদির পরিচিত বন্ধু-লেখক আশিস বর্মন (মৃণাল সেনের বিখ্যাত ছবি ‘আকাশ কুসুম’ তাঁরই লেখা) আমাকে স্কুলে দেখে পছন্দ করেছিলেন। মানিকদাকে নিয়ে আশিসবাবু একদিন আমাদের বাড়িতে এলেন। ভেবেছিলাম নাটকে অভিনয়ের জন্যই আমাকে পছন্দ হয়েছে, সেই মতো বাবার সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। আমার এখনও মনে আছে, একটা ফ্রকের সঙ্গে মুক্তোর মালা পরেছিলাম। মানিকদা বললেন, একি! এসব মুক্তোর মালা চলবে না। পরে বাবা যখন শুনলেন আমার নির্বাচন আসলে একটা সিনেমার জন্য, তখন ভীষণ আপত্তি জানালেন। বললেন, আমরা সাধারণ ঘরের মানুষ। আমার মেয়ে ফিল্ম করবে না। মানিকদা কিছুতেই শুনলেন না। আমাকে এতই পছন্দ হয়েছে যে, বাবাকে অনেক অনুরোধ করে রাজি করালেন। টাকা-পয়সার প্রশ্ন উঠলে বাবা বললেন, সেকি! আমার মেয়ে সিনেমা করবে আর আমি পয়সা নেব? অসম্ভব। মানিকদা সেটা শুনে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। কারণ পথের পাঁচালি তৈরির জন্য মানিকদার আর্থিক অবস্থাও সে সময় ভালো ছিল না।

এই সিনেমায় নির্বাচনের আগে আমি কখনোই মানিকদার বাড়িতে যাইনি। শুটিং চলাকালীন বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমার নির্বাচনের অনেক পরে মানিকদার বাড়িতে যাই এবং বিজয়া রায়ের সঙ্গে দেখা হয়। মনে আছে, মানিকদা ট্রামে করে ওঁর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন একবার বিজয়াদির শাড়ি পরিয়েছিলেন আমাকে। কিন্তু আমার চূড়ান্ত নির্বাচনের সঙ্গে বিজয়াদি কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না। যদিও তারপর বিজয়া রায় এবং মানিকদার মা সুপ্রভাদেবীর সঙ্গে এত ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল যে, শুটিংয়ের পর আমি মানিকদার বাড়িতে যেতাম। বিজয়া রায় রান্না করে খাওয়াতেন। এতটাই যত্ন, আদর আমি তাঁদের থেকে পেয়েছি।

_____

পথের পাঁচালিতে দুর্গা ও সর্বজয়া চরিত্র

সাহিত্য প্রিয় অনেক বাঙালির কাছেই বর্ষা মানে খানিক বিষণ্ণতা। কারণ পথের পাঁচালির দুর্গা চলে যাচ্ছে এ ধরাভূমি ত্যাগ করে৷ অপুর সেই প্রথম একা হওয়া। বিভূতিভূষণের কল্পনা অনুযায়ী সত্যজিৎ রায় কী সাবলীলভাবে এ সব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন মেজাজে। সর্বজয়ার সেই অমোঘ সংলাপ, “পাশ ফিরে শো তো দুগ্গা, বড্ড জল পড়চে”…। ‘পথের পাঁচালি’ ছবিতে বৃষ্টি যেমন খুবই ইঙ্গিতবহ। বৃষ্টিতে ভিজেই মৃত্যু হবে দুর্গার। বিভূতিভূষণের মূল উপন্যাস পড়ে আমরা যা কল্পনা করেছিলাম, সত্যজিৎ তাই-ই ফ্রেমবদ্ধ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্য কিংবা চলচ্চিত্রের আবেগ থেকে দুর্গার অল্পবয়সী মৃত্যুর জন্য হয়তো অবশ্যম্ভাবী ছিল ঝমঝমিয়ে হঠাৎ বৃষ্টি। 

অভিনেত্রী-শিক্ষিকা উমা দাশগুপ্ত (সেন)-এর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সিনেমামহল।

Developed by DXDasia