
শিশু ও কিশোর সাহিত্যের দিকপাল এই জীবন্ত কিংবদন্তি
বুরুন অঙ্কে ১৩ পাওয়ার পর স্কুলে আর বাড়িতে বকুনি খেয়ে গোঁসাইবাগানে এসে সবে খানিকক্ষণ বসেছে। দেখা গেল, গোঁসাইবাগানের ভিতরে যে পুকুর আছে, তার জলের উপর দিয়ে হেঁটে এসে বুরুনের সামনে এসে দাঁড়ালো ডাকাত সর্দারের স্যাঙাত নিধিরাম। তারপর “লোকটা একটু হেসে লোকে যেমন টুপি খোলে, ঠিক সেভাবে নিজের মাথাটা ঘাড় থেকে তুলে এনে হাতে নিয়ে একটু ঝেড়েঝুড়ে পরিষ্কার করল চাঁদির জায়গাটা, তারপর মুণ্ডুটা আবার যথাস্থানে লাগিয়ে বলল, ‘মাথায় খুব উকুন হয়েছে কি না, তাই চুলকোচ্ছে’” (গোঁসাইবাগানের ভূত)। বোঝা যাচ্ছে লোকটা নির্ঘাত ভূত, কিন্তু তবু বুরুনের ভয় করল না। শুধু বুরুন নয়, পাঠকেরও কিন্তু মোটেই ভয় করল না। বরং উৎসাহ বাড়ল পরের ঘটনা জানার জন্য, আর বেশ মজা লাগল। এমনই তাঁর লেখার জাদু। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জীবন্ত কিংবদন্তি, শিশু ও কিশোর সাহিত্যের দিকপাল, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (Shirshendu Mukhopadhyay)।

বাংলা শিশু ও কিশোর সাহিত্য শুধু নয়, বাংলা কথাসাহিত্য-এ তাঁর জীবনবোধ ছড়িয়ে রয়েছে দূরবিন, মানবজমিন-এর মতন অসংখ্য লেখায়। কিন্তু এই প্রতিবেদনের আলোচ্য বিষয় বাংলা শিশু ও কিশোর সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ ব্যুৎপত্তির জায়গাটুকু। একটু বড়ো বয়সে তাঁর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ-এর গল্প-উপন্যাসগুলো পড়তে গেলে সেই জীবনবোধের ছোঁয়া পাওয়া যায়। বুরুনের নিধিরামকে দেখে ভয় লাগেনি, কারণ তার খুব মন খারাপ ছিল। প্রবল মন খারাপে মাঝে মাঝে ভয় কি সত্যিই ঢাকা পড়ে যায় না? তবে এমন কথা গুরুগম্ভীর ভাবে নয়, এসেছে গল্পচ্ছলে, যেন দাদু ছোটো ছোটো নাতি-নাতনিদের নানা স্বাদের গল্প বলছেন, যাঁর গল্পের স্টক অফুরান। প্রাপ্তবয়সে এসে তাঁর ছোটোদের জন্য লেখাগুলি পড়ে তাঁকে বাংলার গল্পের আসরের তারিণীখুড়ো মনে হয়, যাঁর গল্প একবার শুরু হলে ছেড়ে ওঠা যায় না কিছুতেই।
শীর্ষেন্দুর গল্প ছোটোবেলায় পড়তাম অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে, মজাদার, হঠাৎ যেন এক পরিস্থিতি থেকে অন্য পরিস্থিতির মধ্যে গিয়ে পড়া, এক গল্পের মধ্যে অনেকগুলো গল্প, কিন্তু শেষে এসে ঠিক মিলে যাবে সব। এখন সেইসব গল্প-উপন্যাস পড়লে উৎসবের মতন মনে হয়। চরিত্রের পর চরিত্র, যেন সবাই বৃহৎ এক উৎসবের অতিথি, যাঁরা একে একে বা একসঙ্গে হুড়মুড়িয়ে আসছেন, আর এখানেই থাকবেন, ফিরে যাবেন না কোনোদিন।

তাঁর গল্প, উপন্যাস থেকে বহু বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে। তাঁর লেখনী ও বিষয় বর্ণনাও তো ছবির সিনের মতনই বিশদ- “ফটোটা একটা ছেলের। তার বয়স হবে আট নয় বা দশ। একটা বাংলো-বাড়ির সামনের বারান্দার সামনের সিঁড়িতে বসে আছে। সামনের বাগান থেকে বারান্দায় উঠতে মোট তিন ধাপ সিঁড়ি। ঠিক মাঝের ধাপে ছেলেটা বসে আছে, নীচের সিঁড়িতে পা, ওপরের সিঁড়িতে কনুই রেখে সে একটু পিছনে হেলে বসে আছে। তার পায়ে বুটজুতো আর মোজা, সাদা হাফপ্যান্ট, গায়ে ফুলহাতা সোয়েটার, আর সোয়েটারের গলার কাছে সাদা শার্টের কলার বেরিয়ে আছে” (মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি)। কিন্তু ছেলেটা কে? বোধহয় আমরা সবাই। যারা ছোটোবেলার দিকে একবার ফিরে তাকায়, দিনের শেষে ক্লান্ত হলে। ছেলেটা বোধহয় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, যাঁর কৈশোর থামে না।
তাঁর গল্পে ভালো, খারাপ, দুঃখ, খুশি, বড়োলোক, গরিব সবাই আছে, অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা আছে, কিন্তু সবটুকুই যেন ভীষণ চেনা, নিজের পাড়ার মতো। লেখার মধ্যে অবশ্যম্ভাবী মিশে আছে কৌতুক। শঙ্কাহরণ নদীর ধারে বসে ভুট্টা খেতে খেতে বিপদভঞ্জনকে নিজের স্কুলের গল্প শোনাচ্ছে, “আমি তো থ্রি টপকে প্রায় ফোরে উঠে গিয়েছিলুম আরকি। শ্যামাপদস্যার কাছে ডেকে আদর করে বললেন, ‘সবাই ফোরে উঠে গেলে থ্রি যে একেবারে ফাঁকা হয়ে যাবে বাপ।” বিপদভঞ্জনও নিজের মতামত জানায়, “লেখাপড়া হলো ভারি জিনিস। মাথায় সেঁদোলে মাথাটার বড্ড ওজন বেড়ে যায় (অঘোরগঞ্জের ঘোরালো ব্যাপার)।” ঝরঝরে কথ্য ভাষায় লেখা নিখাদ মজা। ছোটোবেলার ফূর্তি বড়োবেলায় এসে ফিরে তাকালে বদলে যায় নির্ভেজাল আনন্দ আর নস্টালজিয়াতে। গল্পের এই অংশ পড়লে মনে পড়ে যায় নিজেদের স্কুলবেলার কথা।

তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের নামগুলিও অদ্ভুত। এদিকে নাম বিপদভঞ্জন আর শঙ্কাহরণ, এদিকে নিজেরাই ক্লাস টু-থ্রিতে ফেল মেরে বসে আছে। ছোটোখাটো যে ব্যবসা করত, তাতেও মন্দা। এমন উদাহরণ অজস্র। শীর্ষেন্দুর বর্ণনাতেও অজস্র মজা আর অদ্ভুতুড়ে ঘটনা যেন নিজের বা পাশের বাড়ির দৈনন্দিন ঘটনার মতো আড়মোড়া ভেঙে দাঁড়িয়ে থাকে, বেমানান লাগে না কিছুতেই- “জমির দলিলটা বের করবেন বলে দুপুরবেলা মন্টুরামবাবু তাঁর দোতলার শোওয়ার ঘরের মস্ত কাঠের আলমারিটা খুলতেই ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে একটা লোক বেরিয়ে এলো। মন্টুরামবাবু তো হাঁ। এর আগে কখনও তিনি আলমারি থেকে মানুষ বেরোতে দেখেননি। বছর খানেক আগে একবার একটা ইঁদুর বেরিয়েছিল বটে! আর আর এক-আধবার আরশোলা। কিন্তু মানুষ কখনও নয় (মদন তপাদারের বাক্স)।” পাঠক যতিচিহ্নের ব্যবহার লক্ষ্য করুন। আলমারি থেকে ইঁদুর বেরোনোতে বিস্ময়বোধক চিহ্ন, কিন্তু মানুষ বেরোনোতে নয়। যাইহোক, পাঠকের হাঁ বোজবার আগেই মন্টুরামবাবু আর লোকটার কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। সেই কথায় বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা আছে বটে, কিন্তু তা যেন দুই অচেনা মানুষের হঠাৎ আলাপের থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। মন্টুরামবাবুর জিজ্ঞাসাও বিস্ময়বোধক হয়েও খানিকটা লোকটার জবাবের দ্বারা গাইডেড। বলা যায়, তাঁর বিস্ময়ের কেন্দ্রিকতার বদল ঘটছে। আলাপ জমছে। কারণ, এক-দু কথার পর লোকটা যখন বলছে, “শেষে কি ব্রহ্মহত্যার পাপে পড়বেন?” তখন মন্টুরামবাবুও বিস্ময়ের মূল জায়গা থেকে সরে এসে জিজ্ঞেস করছেন, “ব্রহ্মহত্যা! তুমি কি ব্রাহ্মণ?” বোঝা যাচ্ছে, প্রশ্নোত্তরের একটা লজিক্যাল প্রোগ্রেশন চলছে, যারা একের সঙ্গে অন্যে সুতোয় বাঁধা। এভাবেই খুব সহজে পাঠককে এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনায় নিয়ে ফেলেন শীর্ষেন্দু। এই যৌক্তিক মন আর কল্পনাশক্তির মিশেলে লিখে ফেলেন ‘পাতালঘর’, বাংলা কল্পবিজ্ঞানের গল্পের ইতিহাসে যে গল্পের জুড়ি মেলা ভার।

পাঠক হিসাবে তাঁর এই উপন্যাসগুলিতে খুঁজে পাওয়া যায় এক বিস্তৃত শান্তি। যা বজায় থাকে সারা লেখা জুড়ে। পাওয়া যায় পুরোনো গাঁ-মফস্সলের গায়ের গন্ধ, বিশ্বায়ন যাকে কাবু করে ফেলতে পারেনি। তাঁর চরিত্রগুলি বড়ো চেনা, যেন পাশের বাড়ি থেকে উঠে আসা। ভালো-খারাপের যে দ্বন্দ্ব আলগোছে ছড়িয়ে থাকে সারা লেখা জুড়ে, উপন্যাসের শেষে তা-ই যেন নিয়ে যায় এক বৃহত্তর ভালোর দিকে, যেখানে কাহিনির খারাপ চরিত্রগুলোও আত্মোপলব্ধি করে, আর জীবনের ছোটো ছোটো জিনিসে শান্তি খুঁজে পায়। এ যেন মানুষ হওয়ার শিক্ষা পাওয়া, গল্পচ্ছলেই। তাঁর লেখা বহতা স্বচ্ছ্ব নদীর মতন, যার তীরে বসে থাকা যায় অনাদিকাল। আশৈশব গন্ধমাখা গল্পগুলোর মধ্যে ধরা থাকে ফেলে আসা ছোটোবেলা। থাকে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের একান্নবর্তী যাপন। যে যাপন অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার মধ্যে দিয়েও অটুট থাকে। অধুনা বিশ্বায়নের যুগে যখন শিশুরা দরকারের চেয়ে হয়তো খানিক তাড়াতাড়িই বড়ো হয়ে উঠছে, আর তাদের মধ্যে দীর্ঘ ছায়া ফেলছে একা থাকার অভ্যাস, তখন তাদের ছোটোবেলা ধরে রাখার আর একসঙ্গে চলার শিক্ষা পাওয়ার উপযুক্ত অস্ত্র হতে পারে এই কাহিনিগুলি। বাংলা ভাষার সহজ সৌন্দর্যের দ্যোতক এই কাহিনিগুলি রূপকথাময় হয়েও একেবারেই ঘরোয়া, যে রূপকথা ঘটে যায় বাড়ির দাওয়ায়, উঠোনে, প্রতিদিন।
বেশ কয়েক বছর আগে তাঁকে দেখেছিলাম, কলকাতার রাস্তায় এক আইসক্রিমের দোকানের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, মুখে মৃদু হাসি। ঠিক যেন একজন শিশু। এই শৈশব তাঁর মনন আর কলমকে যেন না ছাড়ে কখনও।