
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজি শিক্ষার শুরু প্যারীচরণের লেখা ‘ফার্স্ট বুক’ পড়েই
জীবনস্মৃতি’র নানা বিদ্যার আয়োজন পর্বটিতে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath) লিখছেন অঘোরবাবুর কাছে প্রতি সন্ধ্যায় ইংরেজি পড়তে বসতেন তিনি। একে সন্ধ্যা, সারাদিনের ক্লান্তি সব এসে চোখে ঘর বাঁধছে তখন; তার উপর ইংরেজি শিক্ষা। সব মিলিয়ে এই সন্ধ্যাবেলার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভাল ছিল না রবীন্দ্রনাথের। সেই অঘোরবাবুর কাছেই সেজের আলোয় ইংরেজি শিক্ষার প্রথম বইটি পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ – প্যারীচরণ সরকারের ‘ফার্স্ট বুক’। পুরো নাম ‘ফার্স্ট বুক অফ রিডিং ফর নেটিভ চিলড্রেন’ (First Book of Reading for Native Children)। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Vidyasagar) তখনও বর্ণপরিচয় লেখেননি, আরও পাঁচ বছর পরে তা প্রকাশ পাবে। সেই সময়েই প্যারী সরকারের এই ইংরেজি বই উনিশ শতকের বঙ্গসন্তানদের ইংরেজি শিক্ষার প্রথম পাঠ হয়ে উঠেছিল। মিটমিটে আলোয় সন্ধাবেলায় যে ফার্স্ট বুক (First Book) পড়তে পড়তে হাই উঠত, ঘুম পেত রবীন্দ্রনাথের, সেই বই এবং বইয়ের লেখক আজও বাঙালি মনীষার ইতিহাসে স্মরণীয়।
প্রেসিডেন্সি কলেজের পাশের বিশাল লাল ইঁটের বাড়িটার নাম আজ ইডেন হিন্দু হোস্টেল হলেও, এটাই ছিল প্যারী সরকারের তৈরি সেই ভাড়া করা ছাত্রাবাস। প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। প্রথমে ইতিহাস এবং পলিটিক্যাল ইকোনমির শিক্ষক হলেও, পরে ১৮৬৭ সালে সূচিত হয় এক নজিরবিহীন ইতিহাস।
প্যারীচরণ সরকার (Paricharan Sircar)। উনিশ শতকে ইংরেজি প্রাইমার লেখার মত এক দুঃসাহসিক সুদূরপ্রসারী কাজ তিনি করে গিয়েছেন। জন্মেছিলেন কলকাতার (Kolkata) চোরবাগান অঞ্চলে, ১৮২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি। তাঁর বাবা ভৈরবচন্দ্র সরকার এবং মা দ্রবময়ী দেবী। সরকার তাঁদের পদবি হলেও, এটি আসলে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া উপাধি। তাঁদের আসল পদবি ছিল দাস। প্রথমে ঠনঠনিয়া কালীমন্দিরের উল্টোদিকে ডেভিড হেয়ারের পাঠশালায়, তারপর কলকাতায় এসে ডেভিড হেয়ারের (David Hare) পটলডাঙা ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন মেধাবী প্যারীচরণ। এখান থেকেই জুনিয়র স্কলারশিপ পেয়ে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন প্যারীচরণ। ছাত্র হিসেবে দুর্ধর্ষ মেধাবী ছিলেন তিনি। জুনিয়র স্কলারশিপ, সিনিয়র স্কলারশিপ এমনকি ডি. পি. আই-এর লাইব্রেরি পদকও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১৮৪৩ সালে বাবা এবং বড়দার পরপর মৃত্যুতে পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। সংসারের দায়িত্ব সামলাতে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে (Hooghly Branch School) দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন প্যারীচরণ। এই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক ছিলেন তাঁর বড়দা পার্বতীচরণ। শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি বাড়তে থাকে। এদিকে ব্রিটিশ সরকার সেই সময় বারাসাতে একটি নতুন স্কুল চালু করার কথা ভাবছেন। সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে এবার নিযুক্ত হলেন প্যারীচরণ সরকার। শুরু হল শিক্ষা সংস্কারের কাজ। ১৮৪৬ থেকে ১৮৫৪ সালপর্যন্ত এই স্কুলে একাধারে বিদ্যালয়ের নিজস্ব বাড়ি, ছাত্রাবাস, কৃষিবিদ্যার বিভাগ ও পাঠক্রম ইত্যাদি কাজ করে গিয়েছেন প্যারীচরণ। এরপর ডাক আসে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুলে। আজ এই স্কুলই হেয়ার স্কুল নামে পরিচিত। স্কুলের পাশেই একটি বাড়িভাড়া নিয়ে ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করলেন দরদী প্যারীচরণ। হেয়ার স্কুলের পাশের সেই ভাড়া করা বাড়ি ক্রমে ছাত্রাবাসে পরিণত হল। প্রেসিডেন্সি কলেজের (Presidency College) পাশের বিশাল লাল ইঁটের বাড়িটার নাম আজ ইডেন হিন্দু হোস্টেল (Hindu Hostel) হলেও, এটাই ছিল প্যারী সরকারের তৈরি সেই ভাড়া করা ছাত্রাবাস। প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। প্রথমে ইতিহাস এবং পলিটিক্যাল ইকোনমির শিক্ষক হলেও, পরে ১৮৬৭ সালে সূচিত হয় এক নজিরবিহীন ইতিহাস। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি হয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন প্যারীচরণ সরকার। ইংরেজি পড়াতে গিয়ে তাঁর প্রায়ই মনে হত, বাঙালিরা যে ইংরেজি শিখবে, তার জন্য উপযুক্ত প্রাইমার কোথায়? ইংরেজি বর্ণমালা, শব্দ গঠন, বাক্য গঠন, ব্যাকরণের হাজারো নিয়ম কীভাবে শিখবে তারা? প্রয়োজনই আবিষ্কারের জননী। ফলে প্যারীচরণ নিজেই লেগে পড়লেন ইংরেজি প্রাইমার রচনার কাজে। এই তাগিদ থেকেই হয়তো একসময় অখ্যাত বামুন গুরুদাস ভট্টাচার্য শুরু করেছিলেন বাংলা ভাষার এক বৃহদাকার অভিধান রচনার কাজ। ১৮৫০ সালে প্রকাশ পেল প্যারীচরণের লেখা প্রথম ইংরেজি প্রাইমার ‘ফার্স্ট বুক অফ রিডিং ফর নেটিভ চিলড্রেন’।
তারপর একে একে প্রকাশ পেল সেকেন্ড বুক, থার্ড বুক, ফোর্থ বুক এবং সবশেষে সিক্সথ বুক অফ রিডিং। ততদিনে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে কলকাতায়। বঙ্গসন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল যথাযথ পাঠ্যপুস্তকের। এই সোসাইটি থেকেই বাংলা ভাষায় বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজ শুরু হয়ে গেল। ইংরেজি ভাষাশিক্ষার জন্য পাঠ্যপুস্তক লেখার ভার পড়েছিল প্যারীচরণের উপর। আর সেই তাগিদ থেকেই তিনি লিখে ফেলেন এই ছয় খন্ডের ফার্স্ট বুক অফ রিডিং। তখনও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ (Barnaparicaya) প্রকাশিত হয়নি। এর পাঁচ বছর আগেই ইংরেজি ভাষার প্রাইমার লিখে চমকে দিয়েছিলেন প্যারীচরণ সরকার। সমাজ সংস্কার, কাতারে কাতারে স্কুল তৈরি করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ কর্জ হয়েছিল বিদ্যাসাগরের দানবীর প্যারীচরণ সেই ধার মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন নিজের সাধ্যমত, আবার ধার মেটানো নিয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দ্বন্দ্বও বেধেছিল উভয়ের।
শুধু প্রাইমার লেখাই নয়, বাংলার বুকে আমূল শিক্ষা সংস্কারের জন্য ১৮৪৭ সালে ভারতে প্রথম অন্তঃপুরবাসিনী বালিকাদের জন্য স্কুল তৈরি করেন প্যারীচরণ সরকার। ১৮৬৮ সালে এসে নিজের মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন ‘চোরবাগান বালিকা বিদ্যালয়’। বিবাহিত মহিলারাও এখানে পড়াশোনা করতে পারতেন। এই স্কুল থেকে বঙ্গমহিলা নামে একটি মহিলাদের পত্রিকাও প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন প্যারীচরণ সরকার, সঙ্গী ছিলেন ভাইপো ডা. ভুবনমোহন সরকার। স্কুল করার জন্য, নারীশিক্ষার বিস্তারের প্রয়াসের জন্য ডাকাত দিয়ে খুন হওয়ার হুমকিও হজম করতে হয়েছে তাঁকে, হতে হয়েছে একঘরে। তবু দমে যাননি প্যারীচরণ, এত বিপুল কর্মশক্তি ছিল তাঁর। দান-ধ্যানের উদারতার দিক থেকেও তাঁর মাহাত্ম্য কিছু কম ছিল না। বিদ্যাসাগরের যে দানবীর হিসেবে পরিচিতি এখনও রয়েছে বাঙালির মনে, প্যারীচরণও সেই দৌড়ে পিছিয়ে ছিলেন না। শোনা যায় ১৮৬৬ সাল নাগাদ বাংলা আর ওড়িশায় প্রবল দুর্ভিক্ষ লাগলে নিজের বাড়ির উল্টোদিকেই তিনি গড়ে তোলেন ‘চোরবাগান অন্নছত্র’ যেখানে সেই সময় রোজই প্রায় আটশো-নয়শো লোক খাবার খেত।
এহেন বহুমুখী মনীষার দীপ্তিমান প্যারীচরণ বাঙালির স্মৃতিতে কেবলই ফার্স্ট বুকের প্রণেতা হয়েই থেকে গেলেন, এ বড়ই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। উনিশ শতকের বাংলায় সমাজসংস্কারই হোক, বা শিক্ষাসংস্কার – বাঙালির বিদ্যাসাগরকে নিয়ে যত মাতামাতি, সেই তুলনায় প্রতিভাধর প্যারীচরণ আলোকবৃত্তের বাইরেই থেকে গেছেন চিরদিন।
তথ্যসূত্র
১) সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, ' সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ', সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০
২) pyari-charan-sircar-wrote-first-english-book-of-reading-for-native-indian-children, getbengal.com
