সুহৃদ কুমার রায় ছিলেন ‘যুগান্তর’ দলের গোপন পত্রবাহক
সাল ১৯২৭। ধানবাদের ইন্ডিয়ান স্কুল অফ মাইন্স (Indian School Of Mines)-এর অধ্যাপক নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন এক বাঙালি ভূ-বিজ্ঞানী। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন অধ্যাপক হওয়ার পাশাপাশি বিভাগীয় প্রধানের পদেও নির্বাচিত হন তিনি। সেই প্রতিষ্ঠানে তখনও পর্যন্ত কোনো ভারতীয় অধ্যাপক পড়াতেন না, সব অধ্যাপকেরাই আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন ভারতের বাইরে থেকে। ইংরেজ আমল। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও ইংরেজদের কর্তৃত্ব বহাল। নেটিভ জাতির এক বাঙালি সে কিনা তাদের সঙ্গে একই যোগ্যতায় শিক্ষকতা করবে! কেউই তা মানতে চায়নি। আর এই ঘটনা জানাজানি হলে কলকাতার বেশ কিছু জাতীয়তাবাদী পত্র-পত্রিকায় এর তীব্র সমালোচনা হয়। টনক নড়ে ইন্ডিয়ান স্কুল অফ মাইন্সের অধ্যাপক ও কর্তৃপক্ষের। তখন তাঁরা রাজি হন ভারতীয় অধ্যাপকদের একটি ইন্টারভিউ নিয়ে নিয়োগ দিতে প্রতিষ্ঠানে। আর সেই সুযোগেই ইন্ডিয়ান স্কুল মাইন্সের প্রথম ভারতীয় অধ্যাপক হন বাঙালি ভূ-বিজ্ঞানী সুহৃদ কুমার রায় (Suhrid Kumar Roy)। ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি।
ইন্ডিয়ান স্কুল মাইন্সের প্রথম ভারতীয় অধ্যাপক হন বাঙালি ভূ-বিজ্ঞানী সুহৃদ কুমার রায়। ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি।
ভূ-বিজ্ঞানের জগতে সুহৃদ কুমার রায় স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে এক অবিস্মরণীয় নাম। ভারতের খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার এক বিশাল ব্যাপ্ত দিক উন্মুক্ত হতে পেরেছিল তাঁরই গভীর গবেষণার ফলে। বম্বের বাঁশদা রাজ্যে জলনিগম পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হিমাচল প্রদেশের মাণ্ডিতে লৌহ আকরিক ও লবণ সঞ্চয়ের গবেষণামূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবেতেই সুহৃদ কুমার রায় ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। এমনকি মাণ্ডিতে মাটির নিচে খনিজ তেলের উপস্থিতির কথাও বলেছিলেন তিনি। ঝরিয়ার কয়লাখনিতে বেলেপাথরে সঞ্চিত ভারী খনিজ পদার্থের উপর পুনরায় বিস্তৃত পরীক্ষা করেন সুহৃদ কুমার রায়। মূলত ঝরিয়া ও কোডার্মা অঞ্চলে কয়লাখনির উপর বহু গবেষণা করেছেন তিনি। তিরিশের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে তিনিই প্রথম ‘আকরিক-দূরবীক্ষণী’ বা Ore-Microscopy নামে নতুন একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৩৯ সালে লাহোরে আয়োজিত সর্বভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সভাপতি হিসেবে ভারতের খনিজ সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা এবং খনিজ সংরক্ষণের বিষয়ে যে বক্তব্য রেখেছিলেন সুহৃদ কুমার রায়, তার উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ভারতের খনিজ শিল্প সুদূরপ্রসারী অগ্রগতি পেয়েছে। ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র আধিকারিক হিসেবে উদয়পুরে দস্তা ও তামার আকরিকের ভূ-তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের জন্যেও তাঁর নাম সুবিদিত।
নদিয়ার কুড়ুলগাছিতে জন্ম হলেও কলকাতা শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনা। প্রথমে কলকাতার ভবানীপুরে লন্ডন মিশনারী সোসাইটিজ ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ভর্তি হন বঙ্গবাসী কলেজে (Bangabasi College)। সেখান থেকে আই.এস.সি পাশ করে সুহৃদ কুমার রায় ভূ-তত্তবিদ্যায় সাম্মানিক সহ ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে (Presidency College)। এখানেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে জগদীশচন্দ্র বসু (Jagadish Chandra Bose) আর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের (Prafulla Chandra Ray) সঙ্গে। তাঁদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল সুহৃদকে। কলেজে পড়াকালীন থাকতেন ঐতিহ্যবাহী হিন্দু হোস্টেলে (Hindu Hostel)। হোস্টেলের ঘরেই একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Subhas Chandra Bose)। জাতীয়তাবাদী চেতনায় সুভাষচন্দ্র তাঁকে উদ্দীপিত করে তোলেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাও ছিলেন তাঁর পরম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ারে তখন সারা দেশ ভাসছে। মেঘনাদ আর সুহৃদের মনেও স্বদেশির ছোঁয়া লেগেছিল। দেশপ্রেমের শৃঙ্খলে তাঁদের দুজনের বন্ধুত্বও সেদিন বাঁধা পড়েছিল। পরবর্তীকালে বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গেও তাঁর গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে।
দেশের ভিতরে গুপ্ত সমিতির আস্তানা তখন গড়ে উঠছে এদিক-সেদিক। ‘যুগান্তর’, ‘অনুশীলন সমিতি’ প্রভৃতি দলগুলি বাংলা জুড়ে নিজেদের শাখা বিস্তার করছে। এই পরিসরে ‘যুগান্তর’ দলের সঙ্গে পরিচয় ঘটে সুহৃদ কুমার রায়ের। বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত কিংবা উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের সঙ্গে পারস্পরিক সংযোগের মাধ্যম ছিলেন সুহৃদ নিজে। সেকালে দেশের একজন স্বনামধন্য ভূ-বিজ্ঞানী হয়েও গোপনে অতি সন্তর্পণে যুগান্তরের সদস্যদের মধ্যে পত্রবাহকের কাজ করতেন সুহৃদ কুমার রায়। শোনা যায়, রডা কোম্পানির পিস্তল লুঠের ঘটনায় তাঁকেও সন্দেহভাজনদের মধ্যে আটক করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ আর সেই সুবাদে বেশ কিছুদিন কারাবাসও করেছেন সুহৃদ কুমার রায়। ভূ-বিজ্ঞানী পরিচয়ের আড়ালে তাঁর এই বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস আজও অধরা।