মণিকরণ ও কাসোল-র ঘুরে এসে

তীর্থ স্থান, উষ্ণপ্রস্রবণ, উত্তাল পার্বতী নদী আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

মণিকরণের কাছেই এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের নাম – কাসোল, নিরিবিলিতে পাহাড়কে উপভোগ করার নাকি আদর্শ জায়গা। মানালি যাওয়ার সুযোগ আসায় ভ্রমণসূচিতে জুড়ে দিলাম কাসোল আর মণিকরণের নাম।

দিল্লি থেকে কুলুর পথে ভুন্টার হয়ে রাস্তা গিয়েছে মণিকরণের দিকে, পাশে পাশে পার্বতী নদী, রাস্তার নামও মণিকরণ  রোড। শিখ ও হিন্দু- দুই ধর্মেরই তীর্থস্থান মণিকরণ। উষ্ণ প্রস্রবণ ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরদোয়ারা আর একাধিক মন্দির। মণিকরণ নিয়ে এক পৌরাণিক কাহিনি আছে – শিব ও পার্বতী নাকি বেড়াতে এসে উপত্যকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ  হন, ঠিক করেন কিছুদিন এখানে কাটাবেন। এই ভ্রমণকালে পার্বতীর দুলের এক বহুমূল্য মণি হারিয়ে যায়। অনেক খুঁজেও মণিটিকে পেলেন না তাঁরা। রুষ্ট শিব শুরু করেন তাণ্ডব নৃত্য। তাঁকে শান্ত করতে শেষনাগ তার ফণায় আলোড়ন তোলেন নদীর জলে, তৈরি হয় উষ্ণ প্রস্রবণ, উঠে আসে অনেক মণি, হর-পার্বতীর দুঃখ-ক্রোধ দূর হয়।

কী করে যাবেন
দিল্লি বা চণ্ডীগড় থেকে মানালির বাসে ভুন্টার নামতে হবে। এই রাস্তায় অনেক ভালো বাস আছে যা পৌঁছে দেবে ১০ ঘন্টার মধ্যে। সেখান থেকে লোকাল বাস বা শেয়ার গাড়ি বা গাড়ি ভাড়া করে যেতে হবে মণিকরণ ও কাসোল। কাসোলে হোটেল, হোমস্টে অনেক আছে, হিমাচল প্রদেশ পর্যটনের কটেজও আছে, অন-লাইন বুকিং হয়।‘পার্বতী উড কটেজ’এও থাকার ব্যবস্থা ভালোই, যোগাযোগ করতে হবে triptokasol@gmail –এই ঠিকানায়। ফোনও করা যেতে পারে ৯১-৯৮০৫২৭৫৩৪৩ অথবা ৯১-৯৮৯৯১৭১৭৮৭ নাম্বারে।

শিখ ধর্মেরও এক কাহিনী প্রচলিত আছে। গুরু নানক তাঁর এক অভুক্ত শিষ্যর খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য সব জোগাড় করেছিলেন, কিন্তু আগুন পাননি। তখন একটা পাথর তুলতেই বেড়িয়ে আসে এই উষ্ণ প্রস্রবণ।

পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য প্রস্রবণের জলের পাশে তৈরি হয়েছে স্নানাগার – সালফার মিশ্রিত জলে স্নান করছেন অনেকে। শরীরের ব্যথা ও চর্মরোগের জন্য নাকি ভালো এই জল। গুরুদোয়ারার ভিতরেও চলছে কর্মযজ্ঞ। লংগরখানায় একসাথে ৫০/৬০জন লোক বসে মধ্যাহ্নভোজন করেন। ভক্তরাই সেবা করে চলেছেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে – রাঁধছেন, পরিবেশন করছেন। আমরাও বসে পড়লাম পংক্তিভোজনে – তার স্বাদই আলাদা। গুরুদ্বারা সংলগ্ন অতিথি-নিবাসে  থাকা যায়। তবে যে কোন পুণ্যস্থানের মতই পুণ্যার্থীদের ভিড় যথেষ্ট, নিরিবিলিতে প্রকৃতির শোভা দেখার সুযোগ এখানে কম।

মণিকরণের থেকে কুলুর দিকে ৪ কিলোমিটার পিছিয়ে এলে পড়ে কাসোল। মণিকরণ দেখে ফিরে এলাম  কাসোলে।

নদী, পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা কাসোল। পর্যটকদের কাছে যে বেশ প্রিয় তার প্রমাণ পেলাম হোটেল আর হোম-স্টের সংখ্যা দেখে। বিদেশি পর্যটকই বেশি। কাফে এবং রেঁস্তোরাও আছে অনেক যেখানে পাওয়া যায় ইওরোপীয়, বিশেষত ইসরায়েলি খাবার। এমনকি কোথাও কোথাও দোকানের সাইনবোর্ড লেখা আছে হিব্রুতে। আমাদের থাকার ব্যবস্থা কাসোল শহর পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, খুঁজে পেতে একটু বেগ পেতে হল। রাস্তায় কোথাও তার কোনও বোর্ড নেই। হোটেলের ছেলে সাদ্দাম হোসেনকে(বাড়ি মালদা) একটু উষ্মা প্রকাশ করতেই গর্বিত স্বরে সে জানাল-‘আমরা এরকমই, আমাদের খুঁজে নিতে হয়’। তা ঠিক, এতো প্রায় স্বর্গ -সহজে পাওয়া যাবে কি করে? চারপাশে সবুজ বন, দূরে বরফ-মোড়া পাহাড়ের চূড়া, নদীর গর্জন আর পাখির ডাক – তার মাঝে এক ছোট কাঠের বাংলো, নিপুণভাবে সাজানো। বাংলোর বারান্দায় বসেই সময় কেটে যায়।

হোটেল থেকে প্রায় ১০০ মিটার গেলে পার্বতী নদী – কী তার রূপ, কী তার গর্জন। নদীর পাশ দিয়ে পায়ে পায়ে হেঁটে কাঠের সেতু। সেতু পেরোতেই গ্রাম। দূরে দূরে বাড়ি, জনসংখ্যা খুবই কম। অনেক বাড়িতেই আছে হোম-স্টের ব্যবস্থা, সবগুলোই বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। জিজ্ঞাসা করলাম, নদী পেরিয়ে  গাড়ি তো আসতে পারবে না, জানা গেল, খবর পেলে ওরা মালপত্র নিয়ে আসে। বিদেশি পর্যটকদের, প্রধানত, আকর্ষণ rafting আর  ট্রাউট মাছ শিকার। তবে আরেকটা আকর্ষণও আছে শুনলাম – এখানে যত্রতত্র গজিয়ে আছে হাসিসের গাছ – নেশার টানেও আসেন নাকি অনেকে। হোটেলের কাছে গাড়ির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল বোর্ড – কানোয়ার অভয়ারণ্য, বিবরণ আছে এখানের পশু-পাখির। অনুমতি ছাড়া আর গাইড ছাড়া যাওয়া বারণ। উঁকিঝুঁকি মারলাম বটে, কিন্তু নিয়ম ভাঙ্গার সাহস পেলাম না।

কাসোল থেকে আশপাশের আরও জায়গা ঘুরে নেওয়া যায়, ট্রেকিং-এরও রাস্তা আছে অনেক। কাসোল থেকে মণিকরণ হয়ে গাড়ি যায় বারসোনি(মণিকরণ থেকে দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার)। বারসোনি থেকে ট্রেক করে যাওয়া যায় ক্ষীরগঙ্গা। ১১ কিলোমিটার চড়াই পেরিয়ে বরফের পাহাড় ঘেরা সবুজ উপত্যকা, এখানেও আছে উষ্ণ প্রস্রবণ। হোম-স্টের ব্যবস্থাও আছে, এলে আর ফিরতে মন চায় না। এই পথেই বারাসোনি থেকে তিন কিলোমিটার পেরিয়ে যাওয়া যায় কালগোতে, সেও কম সুন্দর নয়।

আর যাওয়া যায় মালানা। কাসোল থেকে জারি গ্রামের দূরত্ব৮ কিলোমিটার। সেখান থেকে মালানার দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। গাড়ি যায় মালানা নালা অবধি, শেষ ৪ কিলোমিটার হাঁটতে হবে।রহস্যে মোড়া এই গ্রাম। এখানকার লোকেরা নিজেদের মনে করে খাঁটি আর্য, আলেকজান্ডারের বংশধর।বাইরের লোকেরা এদের কাছে অস্পৃশ্য। গ্রামে ঢোকার মুখে লেখা আছে নানা নির্দেশ- ছোঁয়া যাবেনা এখানের কোন লোককে।গ্রামের মধ্যে আছে  জগদম্বার মন্দির, তার দেয়াল স্পর্শ করলে দিতে হবে জরিমানা। আশেপাশের সব গ্রামই সুন্দর – পুলগা, গ্রাহান। তবে এ সব জায়গাতেই যেতে হয় পায়ে হেঁটে। পায়ে হাঁটার সাধ বা সাধ্য যদি না থাকে তবেও ক্ষতি নেই, পার্বতী নদীর ধারে পাথরে হেলান দিয়ে বা পাইনের বনে অলস পায়ে হেঁটে দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় কয়েকটা দিন।

কিন্তু মন খারাপ হয়ে গেল, যখন শুনলাম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আয়োজন চলেছে এখানে। আর বড় জোর এক বছর – বেঁধে ফেলা হবে নদীকে। পার্বতী উড কটেজের মালিক প্রশ্ন করলেন – কতটুকুই বা বিদ্যুৎ হবে এই প্রকল্প থেকে, কিন্তু নদীটা মরে যাবে। নদী না থাকলে আমরাও কি থাকব? প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি।

Developed by DXDasia