
এই অঞ্চলে এখনো ভিড় জমায় হাজারো পাখির ঝাঁক
শীত পড়তেই সুদূর কোন দেশ থেকে উড়ে উড়ে চলে আসে পরিযায়ী পাখিরা। বহু হাজার মাইল আকাশপথেও একচুল ঠিকানার ভুল হয় না তাদের। কীভাবে মনে রাখে তারা এই পথ, অভীষ্ট ঝিলটি? পক্ষীবিশারদরা হয়তো বলতে পারবেন ভালো। আমরা তো পাখি দেখেই মুগ্ধ। আর সেই মুগ্ধতায় মেতে থাকতে বারবার ছুটে বেড়াই নতুন নতুন ঠিকানার খোঁজে। অমুক ঝিলে বিগত তিন বছর ধরে অনেক পাখি আসছে, তমুক ঝিলে এবারে নতুন ঝাঁক— শুনেই দৌড় দিই। এমনিতে জলাভূমি কমছে বড়ো দ্রুত এই দেশে। দূষণ বাড়ছে। তারই পাশাপাশি বাড়ছে ক্যামেরা কাঁধে পক্ষীপ্রেমী উৎসাহীদের ভিড়। পাখিদের কাছে এই সবই বড়ো আতঙ্কের। ফলে, এতদিনের চেনা ঠেকগুলো থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে পরিযায়ী পাখিরা। ভিড় করছে অন্য কোথাও। তবে, এরই মধ্যে কয়েকটি জায়গায় আজো আসছে পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁক। তেমনই একটা জায়গা হল বশিপোতা। হুগলীর উত্তরপাড়া সংলগ্ন এই জায়গাটি দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিদের স্বর্গরাজ্য।
দেশি চাঁদিঠোঁট
নিরল পরিনা
বশিপোতায় গেলেই চোখে পড়বে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ আর কিছু জলা। যে দিকে দু চোখ যায় হেঁটে বেড়াতে পারেন। হয়তো দেখলেন আপনার সাথে লুকোচুরি খেলায় মেতেছে সাইবেরিয়া থেকে আসা শিলাফিদ্দা (siberia stone chat) বা এদেশীয় ভোমরা ছোটন (zitting cisticola) কিংবা নিরল প্রিনা (Plain Prinia)। হাঁটছেন, হঠাৎ পায়ের পাশ থেকেই উড়ে গেল ভরত পাখি (Bengal Bushlark), রং-এর ক্যামাফ্লেজের কারণে আপনি এতক্ষণ লক্ষ্যই করেননি তাকে! খানিক এগিয়ে হয়তো দেখলেন একটা ছোট্ট ঝোপের উপর মুনিয়া পাখিদের মেলা বসেছে। হরেক রং-এর, হরেক প্রজাতির মুনিয়ার মেলা বসেছে সেখানে।
নীলকণ্ঠী ফিদ্দা
বশিপোতায় সূর্যাস্ত
আরেকটু এগিয়ে বড় বড় ঘাসের মাথায় দেখা পেলেও পেতে পারেন দূর দেশ থেকে উড়ে আসা বাণ্টিকের ঝাঁকের কিংবা বাবুই-দের (Weaver)। আপনার ভাগ্য যদি সদয় হয়, তাহলে দেখা মিলবে সাইবেরীয় চুনিকণ্ঠীর (Siberian ruby throat)। তবে, তার জন্য আপনাকে ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হতে পারে কয়েক ঘণ্টা।
ভোমরা ছোটন
লাল মুনিয়া
যেদিন, প্রথমবার রুবি থ্রোটকে দেখলাম সেদিন ক্যামেরার শাটার টিপতে ভুলে গিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিলাম ছোট্টো পাখিটার মন ভোলানো সৌন্দর্য। লাল গলা ফুলিয়ে সঙ্গিনীকে ডেকেই চলেছে সে। অভিজিৎদার কনুইয়ের গুঁতোয় যখন শাটার টিপতে গেলাম তখন তিনি আবার ঝোপে লুকিয়েছেন বাসা পাহারা দিতে। এর বাড়ির কাছেই আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে নীল গলা ফিদ্দার (Blue Throat)। জলার দিকে পা বাড়ালে আপনি দেখতে পাবেন এশীয় শামুকখোল (Asian Openbill Stork), হলদে মাথা খঞ্জনা (Citrine Wagtail), মাছরাঙা (common kingfisher/white brested kingfisher) আর অদ্ভুতভাবে সারাক্ষণ উড়তে থাকা বার্ন সোয়ালোর। এভাবেই সকালে পৌঁছালে কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামবে আপনি নিজেই টের পাবেন না। তবে, অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে জল আর শুকনো খাবার। এরপর, সন্ধে নামলে গ্রামের রাস্তায় সূর্যাস্তের রঙের খেলা দেখতে দেখতে পা বাড়ান বাড়ির দিকে।
শ্যামসুন্দর মুনিয়া
সাইবেরীয় চুনীকণ্ঠী
এখানে জড়ো হওয়া পাখিদের এক এক প্রজাতির বাস এক এক অঞ্চলে। তাদের ডাক, তাদের ওড়া, খাবার সংগ্রহ নানা জনের নানা রকম। মন ভরে উপোভোগ করেছি সেই সব দৃশ্য। লক্ষ করার চেষ্টা করেছি—‘কোন কোন পাখি নাচে? নাচগুলো কেমন? কোনটা কেমন করে ওড়ে? কোনটা ধীরস্থির আর কোনটা চঞ্চল? কীভাবে খাবার খায় তারা? লাফিয়ে লাফিয়ে চলে নাকি দৌড়োয় নাকি গুটিগুটি চলে? কোনটা গম্ভীর আর কোনটা উড়নচণ্ডী? কোনটার বাচ্চা মাকে বেশি জ্বালায় আর কোন মা পাখিটাই বা বকাবকি করে বেশি? কোনটা কোথা থেকে কেন এসেছে? কবে ফিরবে তারা…” কিছুজনকে চিনতে পেরেছি, আবার চিনতে পারিনি অনেককেই। কেউ কাছে এসে চারপাশে চরকি কেটে গেছে, কেউ বা দূর থেকেই ফুড়ুৎ… তাদের কিছুজনকে ক্যামেরায় তুলে রাখার চেষ্টা করেছি, অনেকই পারিনি। যদিও তাতে কোন আফশোস নেই। বরং, সাইবেরিয়ান রুবি থ্রোটের ছবি তুলে ফেলার পর বাড়ি এসে ভেবেছি– যদি না তুলতাম ছবিটা তাহলে ওকে আবার দেখার জন্য এক বছরের অপেক্ষার অনুভূতি ঠিক কেমন হত। আসলে আমাদের আধুনিক টেকনোলজির জীবনে অপেক্ষা শব্দটা হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে শাটার স্পিড, আইএসও, ফটোশপ ইত্যাদি শব্দগুলো…
সাইবেরীয় শিলাফিদ্দা
তবে যেটা বলার, এখানকার ঘাসজমি দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে। তার জন্য বেশ খানিকটা দায়ী আমরা। কারণ, আমরা ছবি তোলার নেশায় চাষীদের ঘাম-রক্ত দিয়ে তৈরি করা ফসল মাড়িয়ে যাচ্ছি পায়ে। ফলত, তাঁরা রেগে গিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছেন চাষজমির কাছাকাছি ঘাসজমি আর ঘরছাড়া হচ্ছে পাখিরা। যদি আমরা সচেতন না হই তাহলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে পাখিদের এই চারণভূমি।
হলদে মাথা খঞ্জনা
তবে, এই কথাগুলো মাথায় রেখেই একবার আসতে পারেন পাখিদের এই আশ্চর্য দুনিয়ায়। আপনার এক প্রেমিকার নাম যদি হয় পাখি, যদি শহুরে ব্যস্ততা থেকে একদিন হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে, তবে একদিনের জন্য আপনার ঠিকানা হতেই পারে বশিপোতা।
কীভাবে যাবেন:
হাওড়া থেকে ট্রেনে উত্তরপাড়া স্টেশন। ৩নং প্ল্যাটফর্মের পিছনের দিকে অটোস্ট্যান্ড। অটোয় রঘুনাথপুর বাজার। বাজার থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে মিনিট ১০-১৫ হাঁটলেই বশিপোতা।
কখন যাবেন:
বর্ষা আর শীত। শীতকালে পরিযায়ীদের দেখা মিলবে।
সাবধান:
গোটা অঞ্চলটিতেই প্রচুর বিষধর সাপের বসবাস প্রকৃতির নিয়মেই। সাপের গায়ে পা না পড়লে সাপ আপনাকে কখনোই কামড়াবে না। ঘাসজমিতে হাঁটার সময়ে সাবধানে থাকবেন।
